ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ, সৌদি আরবে হুথিদের ক্রমবর্ধমান আক্রমণ এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিকল্প উৎসগুলোর ওপর জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। জ্বালানি তেলের আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন উৎস থেকে এলএনজি কেনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধের অভিঘাতে সাত মাসে জ্বালানি ও সার আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে বাড়তি অর্থায়ন ও সহায়তাও চেয়েছে সরকার। একই সঙ্গে যুদ্ধজনিত আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলায় ক্ষতিপূরণের দাবি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রকল্পে দ্রুত অর্থছাড়ের তৎপরতা চলছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন করে ৯ কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদনের সুপারিশ করেছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে এক বছর সময়ের জন্য ট্রাফিগুরা পিটিই লিমিটেডের কাছ থেকে এসব কার্গো কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত কমিটির ৪৯তম সভায় এ সুপারিশ করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ব্যবস্থায় এই এলএনজি কেনা হবে। প্রস্তাবিত মূল্য নির্ধারণের সূত্র জেকেএম সূচক থেকে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) ০.১০ ডলার কম। দুপক্ষের সম্মতিতে কার্গোর সংখ্যা কমবেশি করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
বিপিসির তথ্যানুযায়ী, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির টেন্ডার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। কাজেই এ সময়ের মধ্যে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট তৈরির আশঙ্কা খুব একটা নেই। তবে আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে। স্বল্প মেয়াদে জ্বালানি তেলের সরবরাহে যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সেটিই এখন বিপিসির প্রধান লক্ষ্য বলে জানায় সংস্থাটি। পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে তারা। খতিয়ে দেখা হচ্ছে নরওয়ে, নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, আলজেরিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির সম্ভাবনাও।
৩১০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন
যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর জোর দিতে গিয়ে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির অর্থায়নেরও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য ৩১০ কোটি ডলারের ঋণসুবিধা অনুমোদন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নন-কনসেশনাল ঋণসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি। এর মধ্যে জেদ্দাভিত্তিক আন্তর্জাতিক ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি) নিজস্ব তহবিল থেকে ৬০ কোটি ডলার দেবে। বাকি ২৫০ কোটি ডলার আসবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহ-অর্থায়নে। এর মধ্যে বিপিসি জ্বালানি তেল আমদানিতে ২৫০ কোটি ডলার এবং পেট্রোবাংলা এলএনজি আমদানিতে ৬০ কোটি ডলার ব্যবহার করবে। গত ৭ অক্টোবর এ অনুমোদন দেওয়া হয়।
ক্ষতিপূরণ দাবি
বিশ্লেষণে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অভিঘাতে জ্বালানি ও সার আমদানিতে সাত মাসে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪.১২ বিলিয়ন ডলার। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চলমান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় গতকাল এই বিপুল আর্থিক চাপ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর সহযোগিতা ও বাড়তি অর্থায়ন চায় বাংলাদেশ। যারা এই যুদ্ধের জন্য দায়ী নন, অথচ ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা ক্ষতিপূরণ দাবি করেন দায়ী দেশগুলোর কাছে। এ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এই যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষতিপূরণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ওই সেশনে অংশগ্রহণ করে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানি ও সার আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। বাংলাদেশের আলোচনায় মূলত বাড়তি অর্থায়ন, জ্বালানি খাতের চাপ মোকাবিলা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশকে এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে দুর্বলতা ও আর্থিক খাতের সংকট সামলাতে হচ্ছে। এর মধ্যে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি ডলারের জোগান নিশ্চিত করা এবং বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা আরো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
তারা বলেন, যুদ্ধের সিদ্ধান্তে সরাসরি অংশ না নিলেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বড় আর্থিক ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে। তাই বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, অনুদান ও জরুরি সহায়তা জরুরি। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য শুধু জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধির সংকট নয়। এটি বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, সরকারি বাজেট, কৃষি উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বব্যাংকের আশ্বাস
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা জানিয়েছেন, জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে ৩০ থেকে ৪০টি দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য জরুরি সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রাথমিকভাবে ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি সংকটকালীন তহবিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে এই সহায়তা ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ আছে। এছাড়া চলমান ও অনুমোদিত প্রকল্পের অর্থ পুনর্বিন্যাস করেও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে নিয়মিত সহায়তার বাইরে আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি আইএমএফের সঙ্গে নতুন তিন বছর মেয়াদি ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা চলছে। এসব অর্থায়ন যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে নির্ধারিত নয়, বরং অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা ও পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ।
দ্রুত বিনিয়োগের আহ্বান
এদিকে চায়না এক্সিম ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ওয়াং চুনইংয়ের সঙ্গে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণ, স্মার্ট গ্রিড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নির্মাণ এবং ডিপিডিসির নেটওয়ার্ক উন্নয়নে দ্রুত অর্থায়নের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
স্থিতিশীল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহকে দেশের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির ভিত্তি উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৬-এর আওতায় বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের কথা। বিশেষ করে জাতীয় গ্রিডের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে স্মার্ট গ্রিড নির্মাণ, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরবর্তী পর্যায়ের সম্প্রসারণ এবং ডিপিডিসির সঞ্চালন লাইন শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি।
দ্বিপক্ষীয় এ বৈঠকে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প, পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ প্রকল্প (জিটুজি) এবং ডিপিডিসি এলাকায় বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে। এছাড়া ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে চায়না এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয় বৈঠকে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

