প্যাথলজিক্যাল টেস্টের ফি নির্ধারণে নৈরাজ্য, পকেট ফাঁকা হচ্ছে রোগীর

প্যাথলজিক্যাল টেস্টের ফি নির্ধারণে নৈরাজ্য, পকেট ফাঁকা হচ্ছে রোগীর

রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে একের পর এক পরীক্ষা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা। একই পরীক্ষার জন্য একেক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হচ্ছে একেকরকম ফি। কোনো কোনো পরীক্ষার ফিতে প্রতিষ্ঠানভেদে পার্থক্য কয়েকগুণ পর্যন্ত। অথচ পরীক্ষার মান, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্টের ব্যয় বিবেচনায় নিয়েও ফি নির্ধারণে নেই অভিন্ন সরকারি নীতিমালা।

মূলত নানা ধরনের পরীক্ষার নামে রোগীদের পকেট কাটার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। শুধু অতিরিক্ত ফি নয়, পরীক্ষার মান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টদের একাংশ বলছেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও পরিচালন ব্যয়ের কারণে ফিতে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত তদারকি ও কার্যকর নীতিমালার অভাবেই স্বাস্থ্য পরীক্ষার এ খাতে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ একাডেমি অব প্যাথলজিস্টের দাবি, রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য রোগীরা কত টাকা দেবেন—সে বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একক ফি নির্ধারণ করা সমীচীন নয়। তবে সাধারণ রোগীদের অভিযোগ, সরকারের যথাযথ তদারকির অভাবে সেক্টরটি লাগামহীনভাবে চলছে।

রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে বের হওয়ার সময় মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আলতাফ হোসেন (৪৮) বলেন, বর্তমানে একান্ত প্রয়োজন না হলে মানুষ চিকিৎসকের কাছে যেতে চায় না। কারণ, চিকিৎসকের দেওয়া প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার তালিকা অনেকের কাছেই আতঙ্কের নাম।

তার অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে রোগীর ইতিহাস বিস্তারিতভাবে না শুনেই প্রথম সাক্ষাতে এক গাদা পরীক্ষা দেওয়া হয়। ফলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থের ব্যবস্থা করতে হয়, যা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় বোঝা। পরীক্ষার খরচের ভয়ে অনেকে চিকিৎসা এড়িয়ে ফার্মেসি থেকে নিজের মতো ওষুধ কিনে খেতে বাধ্য হন বলেও দাবি করেন তিনি।

রাজধানীর বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কর্মরত কয়েকজন অভিজ্ঞ বায়োকেমিস্ট ও টেকনিশিয়ান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কিছু পরীক্ষার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত রি-এজেন্টসহ সরাসরি পরীক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যয়ের তুলনায় রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া ফি অনেক বেশি।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কিডনির কার্যকারিতা যাচাইয়ের জনপ্রিয় পরীক্ষা সিরাম ক্রিয়েটিনিনের রি-এজেন্টসহ মোট ব্যয় ১২ থেকে ১৭ টাকা। অথচ বিভিন্ন হাসপাতালে এ পরীক্ষার জন্য রোগীদের দিতে হয় ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা।

লিভার কোষের ক্ষতি বা প্রদাহ কিংবা হেপাটাইটিস শনাক্তে ব্যবহৃত এসজিপিটি পরীক্ষার ব্যয় ১৫ থেকে ২০ টাকা বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অথচ পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এ পরীক্ষার ফি ৫০০ টাকা, পদ্মা ডায়াগনস্টিকে ৪০০ টাকা। বিপরীতে সরকারি মুগদা হাসপাতালে একই পরীক্ষার ফি ৭০ টাকা।

তাদের দাবি, রক্তে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের এইচবিএসএজি পরীক্ষার ব্যয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। অথচ বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এ পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয় ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা। পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ফি ১৫০০ টাকা।

রক্তে বা প্রস্রাবে অ্যালবুমিন প্রোটিনের মাত্রা, লিভার ও কিডনির স্বাস্থ্য মূল্যায়ন এবং শরীরের পুষ্টি ও তরল ভারসাম্য যাচাই করতে ডাক্তাররা এসএলবিউমিন টেস্টটি করতে বলেন। রি-এজেন্টসহ এ টেস্টে সর্বসাকুল্যে খরচ পড়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা। কিন্তু সারা দেশের সব হাসপাতালে এ টেস্টে ফি নেওয়া হয় ৪০০ টাকা হতে ৬০০ টাকা।

ভিটামিন ডি পরীক্ষার ক্ষেত্রে ব্যয় ২২০ থেকে ৬৫০ টাকা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অথচ পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এ পরীক্ষার ফি ৪,০০০ টাকা এবং ইবনে সিনায় ২,২৫০ টাকা। বহুল প্রচলিত আরেকটি টেস্ট ইউরিক অ্যাসিড পরীক্ষায় ২০ থেকে ৩০ টাকা খরচ হলেও বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয় ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকা। এভাবে প্রতিটি ল্যাব টেস্টের ক্ষেত্রেই চলছে নজিরবিহীন নৈরাজ্য। ২০ থেকে ৪০ গুণ পর্যন্ত বেশি নেওয়া হয় বলে অভিযোগ সাধারণ রোগীদের।

ফি নির্ধারণে মালিক পক্ষের যুক্তি

বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক, ল্যাবএইড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ এম শামীম আমার দেশকে বলেন, বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী ভিন্ন দামের যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করে। এর সঙ্গে ভবন, অবস্থান, জনবল ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত করে মুনাফাসহ পরীক্ষার ফি নির্ধারণ করা হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানভেদে ফিতে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক।

তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর মান ও সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার ন্যাশনাল অ্যাক্রিডিটেশন বোর্ড ফর হসপিটালস অ্যান্ড হেলথ কেয়ারের মতো একটি কাঠামোর আওতায় হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর শ্রেণিবিন্যাস করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

ডা. শামীম জানান, ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার বাংলাদেশের প্রথম ল্যাবরেটরি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ অব আমেরিকান প্যাথলজিস্টসের (সিএপি) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ল্যাবএইড ক্যানসার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার জেসিআই অ্যাক্রিডিটেশন এবং ল্যাবএইড স্পেশালাইজড ও কার্ডিয়াক হাসপাতাল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার দাবি, এসব স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি অন্যান্য দেশের তুলনায় কম ফিতে পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে।

বাংলাদেশ একাডেমি অব প্যাথলজিস্টের আহ্বায়ক ও রাজধানীর একটি হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শাহাবুদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার ফিতে পার্থক্য থাকবেই। সরকারি হাসপাতাল জনবল, অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা পায়। বিপরীতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়। তবে পরীক্ষার ফি কীভাবে আরো সহনীয় করা যায়, তা নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের কাজ করা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের মধ্যে এ খাত নিয়ে নেতিবাচক ধারণা দূর করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

কমিশনবাণিজ্য ও নিয়ন্ত্রণহীনতার অভিযোগ

তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে ভিন্নমত তুলে ধরে বলেন, রোগ নির্ণয়কারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চিকিৎসক ও দালালদের কমিশনভিত্তিক চুক্তি রয়েছে। উচ্চ মুনাফার উদ্দেশ্যে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাতে সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

তার মতে, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের বিধিমালার ঘাটতি এবং বিদ্যমান আইনের সময়োপযোগী সংস্কার না হওয়া এ সমস্যার অন্যতম কারণ। নিয়ন্ত্রণহীন ও নিম্নমানের বেসরকারি চিকিৎসাসেবার কারণে মানুষ আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির মুখে পড়ছে।

এ বিষয়ে রাজধানীর জাপান বাংলাদেশ হাসপাতালের সাবেক এক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, টেস্ট ফি নির্ধারণে যন্ত্রপাতি, রি-এজেন্টসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করতে হয়। তার মতে, বিশ্বব্যাপী সরকারি পর্যায়ে পরীক্ষার ফি নির্ধারণের প্রচলন নেই।

অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. দবির উদ্দিন আহমেদ আমার দেশকে বলেন, এ খাতের প্রধান সমস্যা পর্যাপ্ত তদারকির অভাব। বিপুল জনসংখ্যার দেশে কোন হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার কী ধরনের যন্ত্রে পরীক্ষা করছে, কীভাবে করছে এবং কত ফি নিচ্ছে—তা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এতে খাতটিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ অবস্থায় সামর্থ্যবানদের একটি অংশ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর ভোগান্তি পোহাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের ব্যয় কমাতে পরীক্ষার ফি সহনীয় করা এবং মান নিশ্চিত করার জন্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের পরামর্শ দেন তিনি।

নীতিমালার সুপারিশ চেয়েছে মন্ত্রণালয়

সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. নূরুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় তার দপ্তরে। তিনি জানান, প্যাথলজিক্যাল টেস্টগুলোর মাত্রাতিরিক্ত ফি এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি আমরা অবগত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে অধিদপ্তরের কাছে সুপারিশ চেয়েছে।

তিনি জানান, এ বিষয়ে শিগগির বিভিন্ন উপকমিটি ও বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে পৃথক বৈঠক এবং সবার মতামতের ভিত্তিতে একটি সুষম নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে। তার আশা, প্রস্তাবিত নীতিমালা সাধারণ রোগী ও হাসপাতাল মালিক—উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন