পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা

Md. Belal Hossain
বেলাল হোসেন

পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বা নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার মাধ্যমে সরকার নতুন পে স্কেল কার্যকরের নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এটি স্বস্তি ও আশার সঞ্চার করলেও বাস্তবায়ন পদ্ধতি, কার্যকারিতা, প্রকৃত বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ এবং ভাতা কাঠামো নিয়ে এখনো রয়ে গেছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ কৌশল এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যেমন প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি রয়েছে উৎকণ্ঠাও।

বিজ্ঞাপন

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের রূপরেখা নির্ধারণে সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে পুনর্গঠিত সচিব কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশনের প্রস্তাব, সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

তবে বৈঠক শেষে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি, বরং আগামী ২৪ জুন আরেকটি বৈঠক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন পে স্কেল দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য একাধিক বৈঠক হতে পারে। এ অবস্থায় সরকারি চাকরিজীবীদের প্রধান কয়েকটি প্রশ্ন হচ্ছে—বেতন বাড়বে ঠিকই, কিন্তু কতটা বাড়বে, কখন হাতে আসবে এবং কী পদ্ধতিতে বাস্তবায়িত হবে? এ নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।

বাড়তি টাকা মিলতে পারে অক্টোবরে

সরকারি সূত্র অনুযায়ী, নতুন পে স্কেল ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে। তবে বাস্তবে চাকরিজীবীদের বর্ধিত বেতন হাতে পেতে সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে—এমনটাই জানা গেছে।

কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আগে প্রজ্ঞাপন জারি, বিধিমালা সংশোধন, সফটওয়্যার হালনাগাদ, হিসাব পদ্ধতির পরিবর্তন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন করতে সময় প্রয়োজন। ফলে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের বকেয়া বেতন একত্রে অক্টোবর মাসে ব্যাংক হিসাবে জমা হতে পারে। এতে অনেক চাকরিজীবী সাময়িকভাবে হতাশ হলেও অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কার্যকর হওয়ার তারিখ এবং অর্থ পাওয়ার তারিখ এক বিষয় নয়। প্রশাসনিক বাস্তবতায় কিছুটা সময় লাগা স্বাভাবিক।

ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন

সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে নতুন পে স্কেল একধাপে বাস্তবায়ন হবে, নাকি ধাপে ধাপে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি একবারে বাস্তবায়নের পরিবর্তে কয়েক ধাপে কার্যকর করার চিন্তাভাবনা রয়েছে।

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম বছরে নতুন নির্ধারিত বেসিক বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর হতে পারে। দ্বিতীয় বছরে বাকি ৫০ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা ও সুবিধা পুরোপুরি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। যদিও সরকারিভাবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি, তবুও এ সম্ভাবনা চাকরিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

কর্মচারী সংগঠনগুলোর দাবি, দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা ব্যয় ও নিত্যপণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। ফলে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে প্রকৃত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। তারা বলছেন, বেতন বাড়ার আগেই বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে গেলে আংশিক বাস্তবায়ন সাধারণ কর্মচারীদের জন্য কার্যত কোনো উপকার বয়ে আনবে না।

বাতিল হচ্ছে বিশেষ সুবিধা

নতুন পে স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বর্তমানে চালু থাকা ‘বিশেষ সুবিধা’ বা ইনসেনটিভ বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা। বর্তমানে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা মূল বেতনের ১৫ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তারা ১০ শতাংশ হারে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন। এটি মূলত মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলার জন্য দেওয়া হয়েছিল। নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে এ সুবিধা আলাদা খাত হিসেবে থাকবে না, বরং তা মূল বেতনের সঙ্গে সমন্বয় হবে। এ কারণে কাগজ-কলমে বেতন বৃদ্ধি যতটা দেখাবে, বাস্তবে হাতে পাওয়া অতিরিক্ত অর্থ তার চেয়ে কিছুটা কম হতে পারে।

প্রকৃত বেতন বৃদ্ধির হিসাব কী বলছে

বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, অনেক গ্রেডেই মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু বিশেষ সুবিধা সমন্বয় করার পর প্রকৃত বেতন বৃদ্ধির হার নিয়ে নতুন হিসাব সামনে এসেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের হিসাবে—

  • ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের কার্যকর বেতন বৃদ্ধি হতে পারে প্রায় ৩৫ শতাংশ।
  • ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের কার্যকর বৃদ্ধি হতে পারে প্রায় ৪০ শতাংশ।
  • অর্থাৎ ঘোষিত বেতন বৃদ্ধির হার এবং বাস্তবে প্রাপ্ত সুবিধার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য থাকবে।
  • তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, এ পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। কারণ মূল বেতন বাড়লে পেনশন, গ্র্যাচুইটি, ভবিষ্যৎ তহবিল এবং অবসরকালীন অন্যান্য সুবিধার পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে।

নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা কী পাচ্ছেন

জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জন্য কিছু বিশেষ সুবিধার সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশন বৈশাখী ভাতা বর্তমান ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে যাতায়াত ভাতা ১০ম গ্রেড পর্যন্ত সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাড়িভাড়ার ক্ষেত্রেও নতুন চিন্তাভাবনা রয়েছে। কমিশনের মতে, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি বাড়িভাড়া সুবিধা দেওয়া উচিত, যাতে নিম্ন আয়ের চাকরিজীবীরা কিছুটা স্বস্তি পান। তবে এসব সুপারিশের কতটুকু সরকার গ্রহণ করবে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।

বাজেটে বড় বরাদ্দ

নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সরকার বাজেটে উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দ রেখেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটি যোগ করলে এ ব্যয় দাঁড়াচ্ছে এক লাখ ২৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায়। জনপ্রশাসন খাতে মোট বরাদ্দ বাড়িয়ে এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, এ বাড়তি বরাদ্দের বড় অংশ থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে এবং সেখান থেকে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে ব্যয় হতে পারে।

বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন বলেন, দীর্ঘ ১১ বছর বেতন বাড়ানো হয়নি। আমরা আগামী ১ জুলাই থেকে জাতীয় বেতন স্কেল শতভাগ বাস্তবায়ন চাই। সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল এবার যেন পুনর্বহাল করা হয়, সে আশা প্রকাশ করেন সরকারের এ কর্মচারী নেতা। তিনি বলেন, আমরা অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য সময় চেয়েছি। নিজাম উদ্দিন আরো বলেন, জাতীয় বেতন স্কেল কীভাবে বাস্তবায়ন হবে এখনো আমাদের অজানা।

সাবেক সচিব ও সুশাসনের কর্মী আবদুল আউয়াল মজুমদার আমার দেশকে বলেন, দীর্ঘ ১১ বছর সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়েনি। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, তাদের বেতন বৃদ্ধি করা উচিত। সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে সাবেক এ সচিব বলেন, কর্মচারীদের যেমন বেতন বাড়ানো দরকার, আবার সরকারের সক্ষমতা বিষয়েও ভাবা দরকার। এখন যদি ৫০ শতাংশ বাস্তবায়ন করে, বাকিটা (৫০ শতাংশ) পরে করবে, এটা মেনে নেওয়া উচিত বলে মনে করেন সরকারের এ সাবেক কর্মকর্তা। তিনি আরো বলেন, বেতন বৃদ্ধি বাজেটের ওপর তেমন একটা প্রভাব ফেলবে না।

এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি আমার দেশকে বলেন, আমরা নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে কাজ করছি। আগামী ১ জুলাই থেকে ৫০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা সঠিক বলা যাচ্ছে না, যে আমরা প্রথম অর্থবছরে কত শতাংশ দিতে পারব। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, জুলাই থেকে কার্যকর করা হবে, তবে এর টাকা হয়তো দু-তিন মাস পর পাওয়া যাবে। কিন্তু এর কার্যকরকরণ জুলাই থেকে ধরা হবে। আগামী ২৪ জুন বেতন কমিটির বৈঠকের কথা জানান তিনি।

এদিকে অনেকেই মনে করছেন, নতুন পে স্কেল কার্যকর হবে—এ বিষয়ে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেলেও এর বাস্তব রূপ এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে নবম পে স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে যেমন আশাবাদ রয়েছে, তেমনি রয়েছে সংশয়ও। আগামী ২৪ জুনের সচিব কমিটির বৈঠক এবং পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে দেশের প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের এ প্রত্যাশা কতটা বাস্তব রূপ পাবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তবায়নের কৌশল, আর্থিক সক্ষমতা এবং মূল্যস্ফীতির বাস্তবতা বিবেচনায় সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন