আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

রাজনীতির নতুন কৌশলে অস্তিত্ব সংকটে ছোট দল

মাহমুদুল হাসান আশিক

রাজনীতির নতুন কৌশলে অস্তিত্ব সংকটে ছোট দল

দ্রুত বদলে যাচ্ছে দেশের রাজনীতির কৌশল ও সমীকরণ। সংসদে যেতে উদ্‌গ্রীব ছোট ছোট রাজনৈতিক দলের নেতারা। এজন্য বড় দলগুলোর ওপর ভর করে নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে চান তারা। তবে এবার এতে বাদ সেধেছে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)। বিধান অনুযায়ী এবার জোটের প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ রদ করা হয়েছে। তাই বড় দলের প্রতীক ব্যবহার করে নির্বাচনে জেতার সুযোগ হচ্ছে না। এ কারণে ছোট দলগুলোর অনেকে নিজ দল থেকে বড় দলে যোগ দিয়ে মনোনয়ন নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে কোনো কোনো দল বিলুপ্তও ঘোষণা করা হচ্ছে। কোন্দলে বিভক্তি দেখা দিয়েছে কিছু দলে। এসব কারণে ক্রমেই অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে ছোট রাজনৈতিক দলগুলো।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, রাজনীতিবিদরা দেশের মানুষের অধিকারের জন্য রাজনীতি না করে ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করায় এ ধরনের সংকটে পড়তে হচ্ছে। এজন্য দলছুটদের ক্ষমতার লোভকে দায়ী করছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংসদে যাওয়ার সমীকরণ মেলাতে রাজনৈতিক দলের নেতারা আগে জনপ্রিয় প্রতীক ব্যবহার করতেন। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আরপিও সংশোধনের ফলে এ সুযোগ না থাকায় তারা নিজ দল বিলুপ্ত করে অন্য দলে যোগ দিচ্ছেন। এটিকে নির্বাচনি কৌশল বলেছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর।

এ কৌশল গ্রহণ করে নিজ দল ছেড়ে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক নেতা যোগ দিয়েছেন বিএনপিতে। আন্দোলনের শরিকদের জন্য এখন পর্যন্ত ১৫টি আসন নিশ্চিত করেছে দলটি। এর মধ্যে নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদ ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ছাড়া অন্য শরিক দলের নেতারা ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন।

বিএনপির শরিক দলগুলোর মধ্যে কয়েকটি দলের প্রধান নেতা ইতোমধ্যে নিজ দল বিলুপ্ত করে নেতাকর্মীদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। আবার কোনো দলের প্রধান দল বিলুপ্ত না করলেও বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। যুগপৎ আন্দোলনের শরিক বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (বিএলডিপি) চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন।

আরেক শরিক বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা তার দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর ও নিকলী) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে তাকে। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজও বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি ঢাকা-১৩ (মোহাম্মদপুর, আদাবর) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে লড়বেন। তবে তিনি তার দল বিলুপ্ত ঘোষণা করেননি।

এছাড়া জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ও এনপিপি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদও একই কৌশল গ্রহণ করেছেন। নড়াইল-২ (নড়াইল সদরের একাংশ ও লোহাগড়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি। ফরহাদ গণমাধ্যমকে জানান, তার দল অনিবন্ধিত হওয়ায় দল বিলুপ্তির কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি ধানের শীষ প্রতীকেই নির্বাচন করবেন।

এর মধ্যে দল বিলুপ্ত করার পর দলের প্রধানের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেন বিএলডিপির বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। সংবাদ সম্মেলনে দল বিলুপ্ত করাকে বেআইনি দাবি করেন তারা।

এছাড়া নিজের দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন আরো কয়েকজন। তাদের মধ্যে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ দল থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেন। তার দল এলডিপি জামায়াত নেতৃত্বাধীন দশদলীয় আসন সমঝোতার জোটে অংশগ্রহণের আলোচনা চলমান থাকা অবস্থায় তিনি পদত্যাগ করেন। পরে বিএনপি তাকে কুমিল্লা-৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।

অন্যদিকে নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানও দল থেকে পদত্যাগ করে ইতোমধ্যে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তাকে ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। দলছুট নেতাদের মধ্যে তিনি ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনায় পড়েছেন।

রাশেদ খানের পদত্যাগ ও বিএনপিতে যোগ দেওয়াকে কৌশল হিসেবে দেখছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। এক অডিও বার্তায় নুর বলেছেন, বর্তমান আরপিওর বিধান অনুযায়ী জোট করলেও ভোট করতে হবে নিজস্ব প্রতীকে। স্বাভাবিকভাবেই সব এলাকায় হয়তো সব মার্কা নিয়ে সবাই জয়লাভ করতে পারবেন না। এ কারণে আমাদের যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের অনেকেই নির্বাচনে জেতার কৌশল হিসেবে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ নিয়ে ধানের শীষে নির্বাচন করছেন।

তিনি আরো বলেন, যেহেতু আমরা একসঙ্গে সরকারও করব। আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী গত দেড় বছরে আমরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একই অবস্থানে থেকে কাজ করেছি। সেক্ষেত্রে আমরা আমাদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানকে নির্বাচনে জয়লাভের কৌশলের অংশ হিসেবে দল থেকে ধানের শীষে নির্বাচন করার অনুমতি দিয়েছি। সে গণঅধিকার পরিষদের পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপির সদস্যপদ নিয়ে নির্বাচন করবে।

এদিকে, যুগপৎ আন্দোলনে থাকা শরিকদের আসন ছেড়ে দেওয়ার কারণে বিএনপির তৃণমূলেও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। এজন্য দলটির হাইপ্রোফাইল নেতাদের দলের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে অনেককে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপি থেকে শরিকদের আসন ছেড়ে দেওয়ার পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত হন জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা।

বহিষ্কৃতদের মধ্যে আরো আছেন—জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, মোহাম্মদ শাহ আলম, হাসান মামুন, আব্দুল খালেক, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের মহাসচিব তরুণ দে, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব, সিলেট জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশিদ (চাকসু মামুন) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ।

সমালোচিত দলছুটদের মধ্যে আরেকজন মেজর (অব.) মনজুর কাদের। তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্য হন। এবার তিনি এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন।

এদিকে, এনসিপিতেও এক ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াতসহ দশদলীয় আসন সমঝোতার জোটের সঙ্গে এনসিপি নির্বাচনি সমঝোতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দলটিতে বিভেদ দেখা দেয়। এ সমঝোতা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ সদস্য। পাল্টা জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে নাহিদকে চিঠি দেন দলটির ১৭০ জন কেন্দ্রীয় নেতা।

এর পরই এনসিপি থেকে পদত্যাগ শুরু হয়। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাজনূভা জাবীন, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা, জারার স্বামী যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ ও যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফ সোহেলসহ বেশ কয়েকজন পদত্যাগ করেন ।

এছাড়া দলত্যাগ না করলেও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিনসহ আরো কয়েকজন। এর মধ্যে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে নির্বাচন করার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জারা। যদিও তার মনোনয়ন বৈধতা পায়নি। তবে তিনি এর বিরুদ্ধে আপিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ গত মাসে সমাবেশে ক্ষমতার লোভে অন্ধ না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এ সময় আরপিও সংশোধনের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেহেতু আরপিও সংশোধনের পর অন্য দলের মার্কায় নির্বাচন করা যাবে না, তাই তারা নিজ দল বিলীন করে অন্য দলে যোগ দেওয়ার জন্য রেডি হয়ে আছেন। এগুলো দিয়ে জাতীয় ঐক্য হয় না। এসব জাতীয় ঐক্য ‘মেকি’।

বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করা বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এ বিষয়ে আমার দেশকে বলেন, আমি মনে করি নিজ দল বিলুপ্ত করে বা ছেড়ে অন্য দলে যাওয়াটা কোনোভাবেই ভালো কাজ হতে পারে না। এতে রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি মানুষের বিশ্বাস নষ্ট হয়, যাতে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি জনগণের আস্থা হারিয়ে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।

বিএনপির অপর এক শরিক দলের নেতা নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না আমার দেশকে বলেন, আরপিও সংশোধন হওয়ায় সমগ্র রাজনীতিতে একটি বড়োসড়ো নাড়াচাড়া হয়েছে। তবে ক্ষমতার জন্য নিজ দল ছেড়ে যাওয়াটা ও নিজ আদর্শ-নীতিকে বিলীন করে দিয়ে অন্য দলে যাওয়াটাকে এখন না হলেও ১৫-২০ বছর পর ইতিহাসবিদরা বলবেন, বাংলাদেশে নীতি-নৈতিকতা ভেসে গেছে। আর এসব কর্মকাণ্ড শেখ হাসিনার আমল থেকে শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, দেশের মানুষ তারুণ্যের ওপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখলেও তারাও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পারেনি; বরং আস্থা হারিয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের কিছু সংকটে থাকতে হলেও আমি আশাবাদী, রাজনীতির এ নেতিবাচকতা কাটিয়ে শিগগির ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসবে।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আবদুল লতিফ মাসুম আমার দেশকে বলেন, নিজ দল ছেড়ে অন্য দলে চলে যাওয়ার ঘটনাগুলোকে আমি বলব তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব। এতে বোঝা যায় তারা দলের প্রতি ও আদর্শের প্রতি অনুগত নয়। বরং ক্ষমতার মোহে জনতার রাজনীতি না করে ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করে।

তিনি বলেন, জনতার জন্য রাজনীতি হলো বছরের পর বছর জনগণের কাছে যাবে। জনগণের অধিকারের জন্য লড়াই করবে। এর পর জনগণ যখন তাদের গ্রহণ করবে, তখন তাদের সংসদে পাঠাবে।

ড. আবদুল লতিফ রাশেদ খান, ববি হাজ্জাজসহ দলছুট নেতাদের কথা উল্লেখ করে একে অনৈতিক বিসর্জন বলে আখ্যা দেন। নিজ দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দেওয়ার বিষয়টি তাদের ক্ষমতার লোভের বহিঃপ্রকাশ। এ অনৈতিক চর্চার কারণে ছোট দলগুলো রাজনৈতিক সংকটে পড়ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন