জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী গত দেড় বছরে চট্টগ্রামে বিজিএমইএ’র তালিকাভুক্ত ১৯টি তৈরি পোশাকশিল্পসহ মোট ১৮৬ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১১১টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে মালিক পক্ষ। বাকি ৭৬টি বন্ধ রয়েছে অস্থায়ীভাবে। অর্থনৈতিক মন্দা আর অর্ডার কমে যাওয়ার কারণে এসব গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেছে বলে প্রচার চালাচ্ছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। কিন্তু আমার দেশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন তথ্য। বন্ধ হয়ে যাওয়া ১৮৬টি পোশাক কারখানার মধ্যে বড় গার্মেন্টসের সংখ্যা ১৯টি। এর সবই তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সদস্য। বাকিগুলো ছোট আকারের কারখানা, যেগুলো বড় কারখানাগুলোর সাবকন্ট্রাক্টে কাজ করত।
বন্ধ হয়ে যাওয়া ১৯টি তৈরি পোশাক কারখানার মধ্যে আটটির মালিক ছিলেন পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা ও দলটির লুটেরা ব্যবসায়ীরা। জুলাই বিপ্লবের পর মালিকপক্ষ পালিয়ে যাওয়ায় কর্মকর্তা কর্মচারীরা আর কোম্পানির হাল ধরে রাখতে পারেননি। বাকি ৯টি কারখানা বন্ধ হয়েছে ব্যাংকিং জটিলতায়। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর সঙ্গে একক লেনদেন থাকায় আর্থিক সংকটে পড়ে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন কারখানাগুলোর মালিকপক্ষ। অথচ এই বিষয়টিকে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা বলে প্রচার করা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আরো বেশকিছু বড় কারখানা সরাসরি বায়ার ডিল করতে পারছে না। তারাও এখন সাবকন্ট্রাক্টের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে। এমন কারখানার সংখ্যাও ২০টির কম নয়। বড় কারখানা যেগুলো আগে সরাসরি বায়ারের কাজ করত সেগুলো এখন সাবকন্ট্রাক্টে চলে আসায় ছোট আকারের প্রতিষ্ঠানগুলো অর্ডার সংকটে ভুগছে। ফলে বড় সংখ্যায় কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
শিল্প পুলিশের তথ্য বলছে, চালু থাকা গার্মেন্টসগুলোর মধ্যে নতুন করে আরো ৫৫টি গার্মেন্টস ঝুঁকিতে রয়েছে। এই গার্মেন্টসগুলো ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দিতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
বিজিএমইএ’র হিসাবে চট্টগ্রামে গত দেড় বছরে বড় আকারের (সরাসরি বায়ার ডিলিং) গার্মেন্টস বন্ধ হয়েছে ৩০টি। এর মধ্যে ১৯টি গার্মেন্টস বিজিএমইএ’র সদস্য। এগুলো হলো- আরকেএম অ্যাপারেলস লিমিটেড, আল-আমিন গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, ফিগো ফ্যাশন লিমিটেড, ওয়েল ফ্যাশন লিমিটেড ইউনিট-২, ওয়েল ড্রেস লিমিটেড, ওয়েল ফ্যাশন লিমিটেড, ওয়েল মার্ট লিমিটেড, ওয়েল ডিজাইনার্স লিমিটেড, প্রগ্রেসিভ অ্যাপারেলস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, পার্টি গার্মেন্টস লিমিটেড, আকশা ফ্যাশন লিমিটেড, জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেড, এমএন কিটওয়ার লিমিটেড, তাহেরসন ফ্যাশন লিমিটেড, এমএনসি অ্যাপারেলস, টয় উডস বিডি, আরেফিন টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, শামীম ফ্যাশন লিমিটেড, আরো জিনস প্রাইভেট লিমিটেড। বন্ধ কারখানাগুলোর একটি বন্ধ হয়েছে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ পতনের পরপরই, আর বাকিগুলো বন্ধ হয়েছে ২০২৫ সালে। এসব কারখানায় কর্মরত সাত হাজার ৭২৭ জন কর্মকর্তা কর্মচারী এখন বেকার।
এর মধ্যে ওয়েল গ্রুপের কারখানার সংখ্যা রয়েছে ছয়টি। প্রতিষ্ঠানটির মালিক চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সিডিএ-এর সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুচ ছালাম। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধক্ষ্য পদেও ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপিও হন তিনি। ছালামের ভাই যুবলীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামই কারখানাগুলো পরিচালনা করতেন। জুলাই বিপ্লবের পর আব্দুচ ছালামের সঙ্গে পালিয়ে যান নজরুলও। এর ক’দিন পর ওয়েল গ্রুপের একটি গার্মেন্টস থেকে পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন কেএনএফ-এর বিপুল পরিমাণ ইউনিফর্ম উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই ঘটনার পর থেকে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর নজরদারি বাড়ে ওয়েল গ্রুপের কারখানাগুলোর ওপর। এরপর থেকে মালিকপক্ষ একে একে বন্ধ করে দেয় ছয়টি গার্মেন্টস।
এমএনসি অ্যাপারেলস লিমিটেড ও টয় উডস বিডির মালিক নজরুল ইসলাম। আওয়ামীপন্থি লুটেরা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হোতা তিনি। এছাড়া এমএন কিটওয়ার লিমিটেডের মালিক মাইনুদ্দিন আহমেদ মিন্টু। সরাসরি আওয়ামী লীগের কোন পদ পদবিতে না থাকলেও আওয়ামীপন্থি ব্যবসায়ী হিসেবে নির্বাচন করতে একাধিকবার মনোনয়ন চেয়েছেন চট্টগ্রামের একাধিক আসন থেকে। জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগের পতনের পর তিনি ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন।
বিজিএমইএ সূত্র জানায়, গার্মেন্টস ব্যবসা মূলত আওয়ামী লীগ নেতাদের কালো টাকা সাদা করার উৎস। জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিবাদী শক্তির পতনের পর তাদের সেই উৎসে ভাটা পড়ে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। এছাড়া বাকি ১১টি কারখানা আর্থিক জটিলতায় পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে। সবকটি প্রতিষ্ঠান একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর সঙ্গে একক লেনদেন করত। প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় করাতে না পেরে কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন তারা।
বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি রকিবুল আলম চৌধুরী জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কনীতিতে ইতিবাচক সমাধান করায় অন্তত ২০ শতাংশ অর্ডার বেড়েছে তৈরি পোশাক শিল্পে। কিন্তু নানান সংকটের কারণে সেই সুফল আমরা পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারিনি। এর অন্যতম কারণ ছিল পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদে অকার্যকর থাকা। অনেক ছোটখাটো শিল্প প্রতিষ্ঠানই এসব ব্যাংকের একক গ্রাহক ছিলেন। তাদের সমস্ত লেনদেন মর্টগেজ- সবই যে কোনো একটি ব্যাকের কাছে দায়বদ্ধ ছিল। ব্যাংকগুলো অকার্যকর হওয়ায় তারা আর ব্যবসা চালাতে পারেননি।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি বারবার আবেদন জানিয়েও কোনো সুফল মেলেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের বায়াররাও অন্য গন্তব্য খুঁজে নিয়েছে। যার অধিকাংশই প্রতিযোগী দেশগুলোর উদ্যোক্তারা লুফে নিয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের জাতীয় অর্থনীতি। এছাড়া আওয়ামী সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা গা-ঢাকা দিয়েছে। তাদের অবর্তমানে কর্মচারী দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব হয়নি। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আরএমজি সেক্টরে।
শিল্প পুলিশ চট্টগ্রাম অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, গত দেড় বছরে ছোট-বড় মিলে ১৮৬টি কারখানা বন্ধের তথ্য রয়েছে তাদের কাছে। এর মধ্যে ১১১টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে মালিক পক্ষ। তবে বন্ধ কারখানার বড় একটি অংশই সাবকন্ট্রাক্টে কাজ করা প্রতিষ্ঠান। এর বাইরে বড় আকারের বেশ কিছু কারখানা সংকটে রয়েছে। ব্যাংকিং জটিলতায় অনেকেই আর্থিক লেনদেন করতে পারছেন না। শ্রমিকদের বেতন ভাতা চালু রাখার স্বার্থে তারা এখন অন্য প্রতিষ্ঠানের সাবকন্ট্রাক্ট করছে। বড় আকারের গার্মেন্টসগুলো সাব কন্ট্রাক্টে কাজ শুরু করায় ছোট আকারের প্রতিষ্ঠানগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
শিল্প পুলিশের হিসাবে বন্ধ কারখানাগুলোতে কাজ করা ২৭ হাজার ৭৬৬ জন শ্রমিক কর্মচারী কাজ হারিয়েছে। কিন্তু আশার কথা হলো বন্ধ কারখানার প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক কর্মচারী নতুন করে কাজ পেয়েছেন। এতেই বোঝা যায় কারখানা বন্ধ হলেও কাজের চাপ কমেনি। যে প্রতিষ্ঠানগুলো আগে পাঁচ থেকে ছয়শ শ্রমিক দিয়ে অপারেশন চালাত, এখন সেখানে কাজ করছে সাতশ থেকে সাড়ে সাতশ শ্রমিক- কর্মচারী।
তিনি আরো জানান, ঈদের আগে নতুন করে আরো ৫৫টি কারখানা ঝুঁকিতে রয়েছে। এ কারখানাগুলোকে কম ঝুঁকিপূর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও অধিক ঝুঁকিপূর্ণÑ এই তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করার কাজ চলছে। ১৫ রমজানের মধ্যে যেসব কারখানা ঈদের আগে বেতন বোনাস পরিশোধ করতে পারবে না তার একটা তালিকা সরকারের কাছে দেওয়া হবে। পাশাপাশি কম ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে সরকারের কোনো নীতি সহায়তা প্রয়োজন হবে কি না সেই সুপারিশও থাকবে। যাতে করে ঈদের আগে শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে সুনির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনা নেওয়া যায় সে বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিজিএমইএ’র পরিচালক এমডিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী জানান, অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক সংকট নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে অনেকটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগেছে। আর এই কারণে ব্যাংকিং জটিলতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে চট্টগ্রাম থেকে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিযুক্ত হওয়ায় আশার আলো হিসেবে দেখছেন এই ব্যবসায়ী নেতা।
তিনি জানান, একীভূত হওয়া ব্যাংগুলোর লেনদেন পুরোদমে সচল করে দেওয়ার পাশাপাশি সরকারের কিছু ব্যবসাবান্ধব নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। আর এটা হলেই দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প।
চট্টগ্রামে বিজিএমইএ’র আওতাভুক্ত ২৬০টি, বিকেএমইএ’র ৮০, বিটিএমইএ’র ২৪ এবং বেপজার ২২৫টি কারখানায় চার লাখ ৩৩ হাজার ৪২২ জন শ্রমিক রয়েছে। সংগঠনগুলোর বাইরে আরো দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছে অর্ধলক্ষাধিক শ্রমিক-কর্মচারী।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

