দিয়াবাড়ি পশুর হাটে অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজি

মাহমুদুল হাসান আশিক

দিয়াবাড়ি পশুর হাটে অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজি

রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ি কোরবানির পশুর হাটে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খামারি ও ব্যাপারীরা অভিনব সব চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন। ব্যাপারীদের পছন্দমতো জায়গা থেকে শুরু করে গরুপ্রতি চাঁদা তোলা হয়েছে।

ইজারাদারের অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিকূল আবহাওয়ায় কাদা থেকে বাঁচতে খামারিদের চড়া দামে বালু কিনতেও বাধ্য করা হয়েছে। এছাড়া হাট থেকে ক্রেতাদের গন্তব্যে পশু পৌঁছে দেওয়ার জন্য থাকা প্রতিটি ট্রাক ও পিকআপ থেকেও চাঁদা নেওয়া হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অব্যবস্থাপনা ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

বালু বিক্রি করা শাওন ও ট্রাকের স্টিকার দিয়ে চাঁদা নেওয়া উত্তরা পশ্চিম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব হানিফ দাবি করেন, ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এসএফ করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী ও ঢাকা

মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শেখ ফরিদ হোসেনের কাছ থেকে তিনি টেন্ডার নিয়েছেন। তবে ইজারাদার ফরিদের দাবি, তিনি হাসিল ওঠানো ব্যতীত কোনো অংশ বা কোনো কিছুই টেন্ডার দেননি। এসব দাবি যারা করছেন, তিনি তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘আমার এই হাটই একমাত্র হাট, যেখানে কোনো চাঁদাবাজি হয়নি।’

সরেজমিনে জানা যায়, প্রথমে হাটে নেমেই চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন খামারি ও ব্যাপারীরা। তাদের দাবি, পছন্দমতো জায়গায় গরু রাখতে তাদের টাকা গুনতে হয়েছে। যাকে তারা ‘চাঁদা’ বলে দাবি করছেন। কুষ্টিয়ার নাসির উদ্দীনের দাবি, তাকে শুধু পাঁচটি গরু রাখার একটু জায়গার জন্য এক হাজার টাকা দিতে হয়েছে। একই অভিযোগ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক ফার্ম পরিচালকও ।

গভীর রাতে মাইকিং করে চাঁদাবাজি

রাজধানীর সবচেয়ে বড় কোরবানির পশুর অস্থায়ী এই হাটে মঙ্গলবার গভীর রাতে মাইকিং করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। হঠাৎ মাইকিং করে জানানো হয়, হাটে থাকা প্রতিটি গরুর জন্য এক হাজার টাকা করে দিতে হবে। বিষয়টি আমার দেশকে নিশ্চিত করেন পশু চিকিৎসক আজিজুল হক, কুষ্টিয়ার মাসুদ রানা ও চুয়াডাঙ্গার হাবিবসহ কয়েকজন ব্যাপারী।

খামারি ও ব্যাপারীরা বলছেন, হাটে দুই থেকে আড়াই লাখ গরু এসেছে। সে হিসাবে এই চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় ২০-২৫ কোটি টাকা। ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এসএফ করপোরেশনের ভলান্টিয়াররা কখনো একে ‘শেড খরচ’, আবার কখনো ‘বকশিশ’ দাবি করে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করেছেন টাকা দিতে।

পাবনার পশু চিকিৎসক আজিজুল হক জানান, হাটে পানি নিষ্কাশনের অব্যবস্থাপনা, কাদাপানি আর টয়লেট সংকটসহ নানা অব্যবস্থাপনার কারণে এমনিতেই পশুর দাম কম ছিল, যার ফলে তার ১৩টি গরুতে প্রায় পৌনে দুই লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এর ওপর রাসেল, তুষার ও মনসুরসহ বেশ কজন এসে তার কাছে টাকা দাবি করেন। লোকসানের কথা শুনিয়ে তাদের হাতে-পায়ে ধরেও চাঁদা থেকে রেহাই পাননি তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আজিজুল বলেন, এখনো যদি এ ধরনের চাঁদাবাজির মধ্যে পড়তে হয়, তাহলে আমরা মুক্তি পাব কবে?

কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ১০টি গরু নিয়ে আসা মাসুদ রানা বলেন, সেদিন রাত ১২টার দিকে হঠাৎ মাইকিং করে বলা হলো, ‘ব্যাপারীরা, আপনারা গরুপ্রতি এক হাজার করে বকশিশ দেবেন। এটা চাঁদা নয়, বকশিশ। বিক্রি হলে দেবেন, না হলে দেওয়ার দরকার নেই। এরপর সকালে এসে একজন আমার কাছে জানতে চান কটি গরু বিক্রি হয়েছে। সে পরিমাণে টাকা দিতে বাধ্য করা হয়।’

চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জ থেকে ২০টি গরু নিয়ে এসেছিলেন মো. হাবিব। তিনি বলেন, আমি চারটি গরু বিক্রি করেছি। চার গরুতে লোকসান হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। ঋণ করে গরু হাটে নিয়ে এসেছিলাম। কাদাপানি তো আছেই। এরপর আবার চাঁদাবাজি। এসব আমাদের ওপর জুলুম।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এসএফ করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী ও ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শেখ ফরিদ হোসেনকে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। পরে হাটের এক নম্বর স্টলে তিনি আছেন জানতে পেরে সেখানে গিয়ে দেখা যায় তার উপস্থিতিতেই এক ব্যাপারীর সঙ্গে চাঁদার টাকা নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা হচ্ছে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক ভলান্টিয়ারের। পরে ওই ব্যাপারী চাঁদা দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও তাকে তা দিতে বাধ্য করা হয়। এ সময় গরু বিক্রেতাকে ধমক ও অশ্রাব্য ভাষায় গালি দেন গলায় ইজারা প্রতিষ্ঠানের কার্ড ঝোলানো উমর ফারুক।

চড়া দামে পিকআপের স্টিকার বিক্রি

কোরবানির পশু ক্রেতাদের বাসায় পৌঁছে দিতে যেসব পিকআপ ও ট্রাক ছিল, সেগুলোর প্রতিটি থেকে সর্বনিম্ন পাঁচ এবং সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়েছে। ভাড়ার অপেক্ষায় থাকা চালক ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কখনো হাটের ভেতরের সড়ক ডিভাইডারের ওপর বসে, আবার কখনো এক নম্বর হাসিল ঘরের কাপড়ের প্যান্ডেলের আড়ালে বসে চাঁদা নিয়ে স্টিকার দেওয়া হচ্ছে। এ সময় ছদ্মবেশে ইকবাল হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ট্রাকের স্টিকার ১০ হাজার টাকা।

পিকআপ চালক জাহাঙ্গীর বলেন, আমি পাঁচ হাজার টাকায় স্টিকার নিয়েছি। পরে স্টিকার বিতরণকারী ইকবাল হোসেনের সঙ্গে পরিচয় দিয়ে কথা বললে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত খুব একটা রেজিস্ট্রেশন হয়নি। মাত্রই শুরু হলো।

পরিবহনের নেতৃত্বে থাকা উত্তরা পশ্চিম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব মো. হানিফ আমার দেশকে জানান, তিনি হাটের পরিবহন সেক্টরটি ইজারাদারের কাছ থেকে টেন্ডারে পেয়েছেন। বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি আর কোনো কথা বলতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে পরিবহন থেকে চাঁদা নেওয়ার বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেন।

এ সময় ৯৮ নম্বর স্টিকার সংবলিত পিকআপ চালক বলেন, পাঁচ হাজার টাকা করে নিয়েছে একটি স্টিকারের জন্য। স্টিকার ছাড়া ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। আগে কখনো এ রকম চাঁদাবাজির মুখোমুখি হইনি।

বালু কিনতে বাধ্য করা

বৃষ্টির কারণে হাটের নিচু জমি এবং গরুর মলমূত্রে মাটি কাদায় একাকার হয়ে গিয়েছিল। কাদাপানির ওপর বসতে না পেরে গরু দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট পাচ্ছে এবং অসুস্থ হয়ে পড়া থেকে বাঁচাতে খামারিরা নিজ উদ্যোগে বালু কিনে ভরাট করেছেন। সিরাজগঞ্জের আব্দুল হালিম জানান, তিনি তার ১১টি গরুর জন্য পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে দুই ট্রাক বালু কিনেছিলেন। একই কথা জানান কুষ্টিয়ার নাসির উদ্দীন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জাহাঙ্গীর খান।

সরেজমিনে এক নম্বর হাসিল ঘরে গিয়ে দেখা যায়, ঘরটির প্রতিটি খুঁটিতে একটি করে ‘এখানে বালি পাওয়া যায়’ লেখা কার্ড ঝোলানো রয়েছে। সঙ্গে জুড়ে দেওয়া আছে ফোন নম্বরও। ওই নম্বরে যোগাযোগ করে জানা যায়, বালুর দায়িত্বে ছিলেন শাওন। তিনি বলেন, আমি ইজারাদারের কাছ থেকে টেন্ডারে নিয়েছি। কত টাকায় টেন্ডারে নিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইজারাদার বললেই কথা বলব। এছাড়া কারো সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলব না। আপনি সাংবাদিক, আপনাকে কেন এসব নিয়ে বলব?

হাটে চাঁদাবাজি হয়নি : ইজারাদার

দিয়াবাড়ি হাটে কোনো চাঁদাবাজি হয়নি বলে দাবি করেছেন ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এসএফ করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী শেখ ফরিদ হোসেন। তিনি বলেন, আমার ইজারা হাটের বাইরে কোনো কিছু আমি টেন্ডার দিইনি। যদি কেউ এ ধরনের কথা বলে থাকে, তাহলে তাকে আইনের আওতায় নেওয়ার জন্য আমি ব্যবস্থা নেব। বালি বা পিকআপের কোনো টেন্ডারও দিইনি। যদি কেউ এসবের কোনো প্রমাণ দিতে পারে, তাহলে দেশের গণতান্ত্রিক ধারায় যে বিচার আছে, তা আমি মাথা পেতে নেব।

তিনি আরো বলেন, চাঁদাবাজির কিছু কমপ্লেইন আমার কাছে এসেছে, আসার পর আমি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছি। আমার এই হাটই একমাত্র হাট, যে হাটে কোনো চাঁদাবাজি হয়নি। অনেকে অনেক কথা বললেও আমি এ ব্যাপারে খুবই স্ট্রিক্ট ছিলাম। যে কেউ কোনো সমস্যা নিয়ে আমার কাছে এলেই সমাধান পেয়েছে।

মাইকিং করে চাঁদাবাজির বিষয়ে বলেন, এর জন্য আমি মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি। হাটের ইজারাদার যেহেতু আমি, এর ভালোমন্দ আমার ওপরই বর্তায়। এজন্য আমি আমার মতো করে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

হাসিল ঘরে বসে তার উপস্থিতিতেই গাড়ির স্টিকার বিক্রির বিষয়ে তিনি বলেন, হাট নিয়ে আমি ব্যস্ততার মধ্যে ছিলাম। অনেক ভুলত্রুটি থাকতে পারে। এসবের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেব।

বর্জ্যের দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ পথচারীরা

পবিত্র ঈদুল আজহার তিনদিন পেরিয়ে গেলেও হাটের বর্জ্য অপসারণ করা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী ঈদের পরদিন থেকেই দ্রুততম সময়ে বর্জ্য অপসারণের কথা থাকলেও রাজধানীর অস্থায়ী পশুর হাটগুলোর চিত্র ভিন্ন। সরেজমিনে হাটের বর্জ্য ও অবকাঠামো অপসারণে ধীরগতির চিত্র দেখা গেছে। খড়, গো-খাদ্য আর পশুর মলমূত্রের দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন পথচারীরা।

দিয়াবাড়ী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, উত্তরা উত্তর মেট্রো স্টেশন থেকে উত্তরা দক্ষিণ স্টেশন পর্যন্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পরিষ্কার করেছেন। তবে এ সড়ক ব্যতীত উত্তরা দিয়াবাড়ী হাট ও আশপাশের সড়কগুলো পশুর মূত্র, বিষ্ঠা, গো-খাদ্য এবং বিভিন্ন আবর্জনায় একাকার হয়ে আছে। নাকে হাত না দিয়ে সেখান দিয়ে চলাচল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ এলাকার নিয়মিত পথচারী উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা তমাল ফরায়েজি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঈদের পর তিনদিন পার হয়ে গেল; কিন্তু এখনো এ রাস্তা দিয়ে হাঁটা যায় না। খড় আর গোবরের গন্ধে মনে হচ্ছে এখনো হাট চলছে।

ডিএনসিসির আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান আমার দেশকে জানান, সড়ক পরিষ্কারের কাজ ভোর ৬টা থেকেই শুরু হয় । তবে হাটের মূল অংশ পরিষ্কারে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে হাটের অবকাঠামো বা প্যান্ডেলের বাঁশ-খুঁটি। তিনি বলেন, হাটের ইজারাদার প্রতিষ্ঠান তাদের বাঁশ, খুঁটি ও অন্যান্য জিনিস সরিয়ে না নিলে ভেতরের অংশ পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। সাধারণত এগুলো সরাতে তাদের তিন থেকে চারদিন সময় দিতে হয়। এরপরই আমরা সম্পূর্ণ হাট পরিষ্কার করব।

হাটের বাঁশ তোলার দায়িত্বে থাকা শ্রমিকরা জানিয়েছেন, প্যান্ডেলের কয়েক হাজার বাঁশ খুলতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে।

জীবাণুনাশক ছিটানোর দাবি

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু প্রধান সড়ক পরিষ্কার করাই যথেষ্ট নয়, হাটের ভেতরের ময়লা দ্রুত অপসারণ করে জীবাণুনাশক ছিটিয়ে জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে হবে। তুরাগে বসবাসকারী আশফাক শুভ্র বলেন, যদি জীবাণুনাশক ছিটানো না হয়, তাহলে বৃষ্টির পানিতে এই বর্জ্য মিশে রোগবালাই ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। একইসঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থায়ও সমস্যা তৈরি করবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন