জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

রেডিওথেরাপির জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয় দেড় বছর

রেডিওথেরাপির জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয় দেড় বছর
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। ফাইল ছবি

শরীরে ক্যানসারের নির্মম থাবা। কিছুক্ষণ পরপরই কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে, তীব্র ব্যথায় হাসপাতালের বারান্দায় ছটফট করছেন টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার আলেয়া বেগম। কেমোথেরাপি শেষ হয়েছে, এখন প্রয়োজন জরুরি রেডিওথেরাপি। কিন্তু জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে প্রেসক্রিপশন জমা দেওয়ার পর তাকে রেডিওথেরাপির জন্য সময় দেওয়া হয়েছে ২০২৭ সালের মার্চ মাসে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আলেয়া বেগমের প্রশ্ন, প্রায় এক বছর পর চিকিৎসা হলে ততদিন কি আমি বাঁচব?

একই চিত্র কুমিল্লার মকবুল খানের। রেডিওথেরাপির জন্য তিনি সিরিয়াল পেয়েছেন আগামী বছরের জানুয়ারিতে। ক্ষোভ প্রকাশ করে আমার দেশকে তিনি বলেন, চিকিৎসা করতে গিয়ে পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। বাইরে থেরাপি করাতে লাখ লাখ টাকা লাগে। এত টাকা কোথায় পাব?

বিজ্ঞাপন

আলেয়া বা মকবুল নন, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা হাজারো রোগীর বাস্তবতা এখন প্রায় একই। সরকারি এই হাসপাতালে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকায় একটি রেডিওথেরাপি কোর্স সম্পন্ন করা গেলেও বেসরকারি হাসপাতালে একই চিকিৎসায় খরচ হয় প্রায় দুই লাখ টাকা। অথচ একটি মাত্র মেশিন দিয়ে থেরাপি দেওয়া হয়। কিন্তু রোগীর চাপ থাকে প্রতিদিন কয়েকশ। মাসের পর মাস ঘুরেও থেরাপির জন্য সিরিয়াল পান না রোগীরা। তাদের এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেকের রোগ জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে, কেউ কেউ প্রাণও হারাচ্ছেন।

অর্ধেকের বেশি যন্ত্র অচল

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে প্রায় ৫০টির বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাচ্ছে। এর মধ্যে ক্যানসার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পরীক্ষা সিটি স্ক্যান, এমআরআই ও মেমোগ্রাফিসহ (স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং) পরীক্ষা-নিরীক্ষার অর্ধেকের বেশি যন্ত্রপাতি নষ্ট এবং দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচলাবস্থায় পড়ে রয়েছে। অনেক সময় গ্লাভস, ক্যানোলা, স্যালাইন সেটের মতো মৌলিক চিকিৎসাসামগ্রীরও সংকট দেখা দেয়। অপারেশন থিয়েটারেও রয়েছে অ্যানেস্থেশিয়া মেশিনের ঘাটতি।

ফলে রোগীদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ব্যয়বহুল পরীক্ষা করাতে হচ্ছে, যা অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে বহন করা কঠিন। ধারণক্ষমতার তিন থেকে পাঁচগুণ রোগীর চাপ, জনবল সংকট, যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা এবং দালালচক্রের সক্রিয়তায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

রেডিওথেরাপির সংকট চরমে

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মোট আটটি রেডিওথেরাপি মেশিনের মধ্যে চারটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল এবং দুটি মেরামতের অযোগ্য হয়ে বাজেয়াপ্ত হয়েছে। বর্তমানে মাত্র দুটি মেশিনে চিকিৎসা চলছে, যার একটি প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে। দৈনিক সর্বোচ্চ ৭৫টি থেরাপি দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও রোগীর চাপের কারণে ৯০ থেকে ১২০টি পর্যন্ত থেরাপি দিতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে স্থাপিত ছয়টি মেশিনের কার্যক্ষমতা ছিল ১০ বছর। ২০১৭ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেগুলো পর্যায়ক্রমে অচল হয়ে যায়। পরে দুটি নতুন মেশিন এলেও দেশের বিপুলসংখ্যক রোগীর তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল।রেডিওথেরাপি বিভাগের টেকনিশিয়ানরা জানান, বর্তমানে ব্যবহৃত মেশিনগুলো বহু পুরোনো। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় প্রায়ই যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়। কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে সেবা চালু রাখা হচ্ছে।

বন্ধ গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা

হাসপাতালে ২০০৫ ও ২০০৬ সালে সিটি স্ক্যান ও এমআরআই মেশিন চালু করা হয় । এরপর কিছুদিন পর এমআরআই মেশিনটা অকেজো হয়ে যায়, যা আর চালু করা হয়নি। সিটি স্ক্যান মেশিনটিও প্রায়ই বিকল।

এমআরআই মেশিন কবে থেকে বন্ধ এমন প্রশ্নের জবাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মচারী আমার দেশকে বলেন, আমি এখানে ১০ বছর ধরে চাকরি করছি। তার আগেই থেকে মেশিন নষ্ট রয়েছে। তবে সিটি স্ক্যান মেশিনটা মাঝে মাঝে চলে আবার কিছুদিন পর নষ্ট হয়ে যায়।

ওষুধ ও রিএজেন্টের সংকটে কয়েক মাস ধরে রক্তের নমুনা পরীক্ষা এএফপি, হেপাটাইটিস সি ভাইরাস পরীক্ষা, ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের টেস্ট, স্তন ক্যানসারের টেস্ট, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার টেস্ট, কোলনসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের পর্যবেক্ষণের সি-ই-এ টেস্ট, থাইরয়েড গ্রন্থি নির্ণয়ের পরীক্ষা এফটি ফোর, হেপাটাইটিস বি ভাইরাস সংক্রমণ শনাক্তে এইচ-বি-এস-এ-জি টেস্ট, প্রোস্টেট ক্যানসারে পিএসএ টেস্ট, থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য নির্ণয়ের টিএসএইচ টেস্ট এবং গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করতে এবং কিছু টিউমার বা ক্যানসার শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণে সিরাম এইচসিজি টেস্টসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু টেস্ট বন্ধ রয়েছে।

এছাড়া আর্টারিয়াল ব্লাড গ্যাস অ্যানালাইজার, এফেরেসিস মেশিন, ব্রঙ্কোস্কোপ, ইকো টেস্টসহ বিভিন্ন সেবা নিয়মিত চালু রাখা যাচ্ছে না। কোথাও যন্ত্র নেই, কোথাও যন্ত্র থাকলেও প্রয়োজনীয় কিটের অভাবে সেবা বন্ধ। এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম সেবা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অন্যদিকে, ল্যাবে রক্ত পরীক্ষাসহ কিছু পরীক্ষা করার যন্ত্রপাতি থাকলেও টেকনিশিয়ান নেই।

হাসপাতালের এক টেকনোলজিস্ট আমার দেশকে বলেন, কোথাও এক্স-রে যন্ত্র নেই, আবার কোথাও থাকলেও তা নষ্ট। আবার জনবল ও রিএজেন্ট (ওষুধ) না থাকায় অনেক টেস্ট বন্ধ রয়েছে।

দুর্ভোগই যেন রোগীদের নিয়তি

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গত শনিবার ভোরে হাসপাতালের ‘ডি’ ব্লকের গেটের সামনে বৃষ্টির মধ্যে মাদুর পেতে গায়ে পাতলা কম্বল বা চাদর জড়িয়ে বেশকিছু মানুষ জবুথবু হয়ে শুয়ে আছেন। অন্তত ৩০টি বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষগুলোর অর্ধেকই ভুগছেন প্রাণঘাতী ক্যানসারে । অনেকেই কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি কিংবা ফলোআপের জন্য দিনের পর দিন হাসপাতালে অবস্থান করছেন। সারা দিন এদিক-ওদিক থাকলেও রাতে এখানে বিছানা পাতেন। শয্যার তীব্র সংকটে ভর্তি হওয়া রোগীদেরও অনেককে হাসপাতালের মেঝে, বারান্দা, এমনকি সিঁড়ির নিচে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।

হাসপাতালের নিচতলায় প্রতিদিন শত শত রোগী দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। কিন্তু দুপুরের পর অনেক সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকে চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে যান। গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বন্ধ থাকায় বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রোগীদের দুর্ভোগ আরো বাড়ছে। এছাড়া রোগীদের ব্যবহৃত টয়লেটসহ বিভিন্ন জায়গায় নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় দেখা গেছে।

রোগীদের অভিযোগ, রেডিওথেরাপিসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং কেমোথেরাপির সিরিয়াল পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। এই সুযোগে দালালচক্র দ্রুত চিকিৎসার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, থেরাপির সিরিয়াল দ্রুত পেতেও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়।

শয্যা সংকট

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন প্রায় ২০০ রোগী ভর্তি হওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও খালি হয় মাত্র ছয় থেকে সাতটি শয্যা। ফলে অধিকাংশ গুরুতর রোগীকেই ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান না। আবার বহির্বিভাগে প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা ও জনবল সংকটে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

জামালপুরের পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত কৃষক আব্দুর রশীদ আমার দেশকে বলেন, চিকিৎসা করতে গিয়ে জমি-গরু সব বিক্রি করেছি। অর্থের অভাবে নির্ধারিত দিনে থেরাপি নিতে পারেননি। একটা কেমোর জন্য পাঁচ দিন ভর্তি থাকতে হয়। ১৫ দিন আগে থেরাপি নেওয়ার তারিখ ছিল। খরচ জোগাতে না পেরে আসতে পারিনি। এখন সমিতি থেকে কিস্তি তুলে এসেছি।

ক্যানসার রোগী মাহমুদা আক্তার বলেন, একটি থেরাপি নিতেই প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। চিকিৎসা করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। ৩৩৩ টাকা দিলে পেয়িং বেড মেলে কিন্তু সে টাকাও এখন নেই। আমি এখন খুব অসহায়।

চিকিৎসকরা জানান, প্রতিটি ক্যানসার রোগীকে গড়ে ১০ থেকে ১৫টি কেমোথেরাপি দিতে হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, শুধু তিনটি ইউনিটেই প্রায় পাঁচ হাজার রোগী অপেক্ষমাণ। দুটি মেশিন দিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০টি করে সেশন পরিচালনা করা যায়, যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। নতুন কয়েকটি মেশিন যুক্ত হলেও হয়তো চাপ কিছুটা কমবে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ আমার দেশকে বলেন, আমাদের সক্ষমতার তুলনায় রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেশি। ফলে দীর্ঘ সিরিয়াল তৈরি হচ্ছে। সিটি স্ক্যানের একটি মেশিন কোনোমতে চলছে, এমআরআই নেই। রেডিওথেরাপির অধিকাংশ মেশিনের মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন দুটি মেশিন এলেও এর সেটআপ অত্যন্ত জটিল হওয়ায় এখনো স্থাপন করা যায়নি।

তিনি আরো জানান, রোগীদের ভোগান্তি কমাতে রেডিওথেরাপি বিভাগে তিন শিফটে সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যন্ত্রপাতি ও জনবল সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন