পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নতুন মামলা হচ্ছে। এ মামলায় আসামি করা হবে তার সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া ছোট বোন শেখ রেহানাকেও। এতে তাদের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন না করে দেশত্যাগের অভিযোগ আনা হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত ২০১৩ সালের অভিবাসী আইনে মামলা দায়েরের সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে। ইতোমধ্যে শেখ হাসিনার পলায়নকালীন ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম শেষ হয়েছে। এ মামলায় ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে পালাতে সহায়তাকারীদেরও যুক্ত করা হতে পারে। সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র আমার দেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বেলা ৩টা ৯ মিনিটে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশ ছাড়ার জন্য ঢাকার বীরউত্তম একে খন্দকার বিমানঘাঁটি (তৎকালীন বঙ্গবন্ধু বিমানঘাঁটি) থেকে বিমানে ওঠেন। বিমানে ওঠার সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ও শেখ রেহানার সঙ্গে ব্রিটিশ পাসপোর্ট থাকলেও তারা ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন না করেই অবৈধভাবে দেশত্যাগ করেন বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার প্রচলিত আইন অমান্যের বিষয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, শুধু বিমানবন্দর বা অনুমোদিত চেকপোস্ট দিয়ে ইমিগ্রেশন কার্যক্রম শেষ করেই বিদেশে যাওয়া যায়। ইমিগ্রেশন কার্যক্রম ও নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোনো স্থান দিয়ে দেশত্যাগ করলে বিধান অনুযায়ী সেটা অবৈধ ও বেআইনি বলে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালত সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও অনধিক পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে।
অবশ্য জুলাই গণহত্যায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে প্রমাণিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এছাড়া দুর্নীতির মামলায় আদালত শেখ হাসিনা ও শেখ
রেহানাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে। বর্তমানে উভয়েই দণ্ডিত পলাতক আসামি। শেখ হাসিনা পালিয়ে গিয়ে ভারতের আশ্রয়ে থাকলেও রেহানার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই তদন্তকারী দলের কাছে। তবে জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের নাগরিক শেখ রেহানা বর্তমানে লন্ডনে বসবাস করছেন। মাঝে মধ্যে তিনি ভারতে যাওয়া-আসা করেন।
নিজের সিদ্ধান্তেই বোনকে নিয়ে পালান হাসিনা
বাইরে বিভিন্ন আলোচনা থাকলেও ভারতে পলায়নের সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনা নিজেই নেন বলে অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর দেড়টার দিকে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা গণভবনের (বর্তমানে জুলাই জাদুঘর) লেক রোডের গেট দিয়ে সড়কপথে গাড়িতে করে পুরাতন বাণিজ্যমেলার মাঠে আসেন। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে কুর্মিটোলায় বঙ্গবন্ধু বিমানঘাঁটিতে আসেন। লাগেজপত্র নিয়ে তিনি বাংলাদেশ এয়ার ফোর্সের লকহিড সি-১৩০জে হারকিউলিস বিমানে (যার কল সাইন এজেএএক্স১৪৩১) চড়ে বসেন। পুরো প্রক্রিয়াটিই শেখ হাসিনার ইচ্ছা অনুযায়ী হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। দেশ ছেড়ে তিনি ভারতে আশ্রয়ের জন্য যাবেনÑএমন সিদ্ধান্তের কথা তিনি গণভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও জানান। শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা অনুযায়ীই তাকে ভারতে নেওয়ার বিষয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পলায়নের জন্য গণভবন থেকে বের হওয়ার পর তিনি দেড় ঘণ্টার বেশি সময় পেলেও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করেননি। এটি ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলেও জানান তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গণভবন থেকে ভারতের হিন্দন বিমানবন্দর পর্যন্ত শেখ হাসিনার সঙ্গে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এ মামলায় সাক্ষী হচ্ছেনÑএমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন তদন্তদলের এক সদস্য।
শেখ হাসিনার পলায়নের বিষয়ে তদন্তদল দুটি অডিও ক্লিপও আলামত হিসেবে নিয়েছে। একটি ৫ আগস্ট পলায়নের উদ্দেশে গণভবন থেকে বের হওয়ার পরপরই। শেখ রেহানাকে ওই সময় সালমান এফ রহমানকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা একটি নিরাপদ জায়গায় যাচ্ছি। আপনি এক সেকেন্ডও দেরি না করে বেরিয়ে যান।’ রেহানার ওই কথার প্রতিউত্তরে সালমান জানতে চেয়ে বলেন, ‘আচ্ছা, তোমরা অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছ? আপাও (শেখ হাসিনা) তোমার সঙ্গে গেছে?’ জবাবে রেহানা বলেন, ‘জি ভাই। আপনিও ইমিডিয়েটলি বের হয়ে যান। এখানে থাকা একদম সেফ না। এক মিনিটও দেরি কইরেন না।’ শেখ রেহানা ও পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের দুই মিনিট ৯ সেকেন্ডের ওই কথোপকথনের অডিওর ফরেনসিক সম্পন্ন করেছে তদন্ত সংস্থাটি। ফরেনসিক প্রতিবেদনে তারা এটির সত্যতার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে দেশে থাকতে পারবেন না বলে নিজের আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের কাছে। পলায়নের আগের দিন ৪ আগস্ট তার সঙ্গে টেলি কথোপকথনে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, ‘তারা (আন্দোলনকারীরা) কারফিউ-টারফিউ কিছু মানছে না। আমি ঠিক করেছিলাম আজই রাষ্ট্রপতির কাছে যাব। সবকিছু লিখে ঠিক করে রেখেছি। এভাবে ক্ষমতায় থাকা আর সম্ভব না।’ শেখ হাসিনার ওই কথার জবাবে হাছান মাহমুদ বলেন, ‘ইমার্জেন্সি জারি করে দেখেন না।’ জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন আর ইমার্জেন্সিতেও কাজ হবে না। তুমি আবার এটি বাইরে বলতে যেও না। এ দেশে আর থাকা সম্ভব না। এ দেশে আর না।’ শেখ হাসিনা ও হাছান মাহমুদের ওই কথপোকথনের ফরেনসিকও সম্পন্ন করেছে তদন্তদল। একটি প্রতিবেদনে অডিও ক্লিপটি হাসিনা ও হাছান মাহমুদের বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ভারতেরও দায় দেখছেন বিশেষজ্ঞরা
শেখ হাসিনা ও রেহানা ইমিগ্রেশন প্রসেস ছাড়াই বাংলাদেশের সীমান্ত পার হয়ে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। এতে তিনি দুদেশের আইন ভঙ্গ করেছেন বলে জানান ইমিগ্রেশন আইনজীবীরা।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আমার দেশকে বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ভোটাধিকার হরণের পাশাপাশি শেখ হাসিনা একজন গণহত্যাকারী। এটি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জুলাই আন্দোলনে দেশে টিকতে না পেরে শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি প্রচলিত আইন অনুযায়ী ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করেননি বলেই জানতে পেরেছি। এটি আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। আইনানুযায়ী তার বিরুদ্ধে সরকারের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সালেহ উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, জুলাই বিপ্লবের মুখে পড়ে শেখ হাসিনা জনরোষ থেকে বাঁচতে ইমিগ্রেশন কার্যক্রম ছাড়াই ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। ছোট বোন রেহানাকেও একইভাবে সঙ্গে করে নিয়ে যান। তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনের মামলা হবে।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আইনের পাশাপাশি ভারতের ইমিগ্রেশন আইনও ভঙ্গ করেছেন। বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কোনোভাবেই ভারত শেখ হাসিনাকে গ্রহণ করতে পারে না। তাকে আশ্রয় দিতে হলে আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী রিফিউজি হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। ভারত তাকে কোন স্ট্যাটাসে গ্রহণ করেছে, সেটা তারাই বলতে পারবে। যদিও দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র জয়স্ওয়াল সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা ভারতে আইনগত প্রসেসের মধ্যে রয়েছেন। তিনি (হাসিনা) নিজের ইচ্ছায় ভারত ত্যাগ করতে পারবেন না।’
পালিয়ে যাওয়ার পরপরই শেখ হাসিনা ও রেহানার বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত প্রচলিত আইনে মামলা হওয়া জরুরি ছিল বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের অপর আইনজীবী জয়নাল আবেদীন মেজবাহ। আমার দেশকে তিনি বলেন, অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষে দেরিতে হলেও সরকার এখন মামলার উদ্যোগ নিয়েছে, এটি আশার কথা।
শেখ হাসিনার অপরাধের বর্ণনা দিয়ে অ্যাডভোকেট মেজবাহ বলেন, শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের ঘটনা বিশ্বের গণমাধ্যমগুলো গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার ও প্রকাশ করেছে। তার গণহত্যার বর্ণনাও জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে বিস্তারিত এসেছে। এমন একজন গণহত্যাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধী জনরোষ থেকে বাঁচতে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। নিজে পালানোর আগে আত্মীয়স্বজনদের নিরাপদে দেশ থেকে বের করে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, তার দলের ও আত্মীয়দের মধ্যে আরো যারা ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন না করে বিদেশে পালিয়ে গেছেন, তাদের বিষয়ে তদন্ত ও অনুসন্ধান করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
হাসিনার পলায়ন ও পদত্যাগের ঘোষণা
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে শেখ হাসিনা দেশ থেকে পলায়নের পর ওইদিন বিকালেই দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তব্য দেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। এতে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। এখন একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে আমরা আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করব।
ওইদিন রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ‘আপনারা জানেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং আমি তা গ্রহণ করেছি।’
পরদিন ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করার কথা জানানো হয়। এতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সর্বসম্মত মতামতও নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। দুদিন পর ৮ আগস্ট শপথ নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার।
সেনাপ্রধানের মুখ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের ঘোষণা প্রচারের আগেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার পলায়নের সংবাদ প্রকাশ হয়।
শেখ হাসিনা পালানোর এক মাস পর জানা যায়, অবস্থান ও যাত্রাপথ গোপন রাখার স্বার্থে তাকে বহনকারী ফ্লাইট এজেএক্স১৪৩১ উড়োজাহাজের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা হয়েছিল। শেখ হাসিনাকে বহনকারী উড়োজাহাজটি প্রথমে কলকাতার দিকে যায়। কারণ এটি দ্রুত বাংলাদেশের আকাশসীমা ছাড়তে চেয়েছিল। ঢাকা-দিল্লির যে আকাশপথ রয়েছে, সেটি দিয়ে গেলে উড়োজাহাজটিকে রাজশাহীর ওপর দিয়ে যেতে হতো। এতে বাংলাদেশের আকাশসীমায় উড়োজাহাজটিকে আরো কয়েক মিনিট থাকতে হতো।
ভারত সীমান্তে পৌঁছানোর পর সেটি দিল্লি থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে গাজিয়াবাদের হিন্দন বিমানঘাঁটির দিকে যায়। ভারতীয় গণমাধ্যমের মতে, উড়োজাহাজটি ঢাকার সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। এরপর হাসিনাকে উত্তর প্রদেশের নয়ডায় একটি নিরাপদ বাড়িতে নেওয়া হয়।
হাসিনাকে নামিয়ে দেওয়ার পর বিমানটি রিফুয়েলিং করে এবং ফ্লাইট ক্রু ও সিকিউরিটি সার্ভিসেস ফোর্স (এসএসএফ) সদস্যদের নিয়ে একই দিন ঢাকায় ফিরে আসে। জানা গেছে, হাসিনা-রেহানার পাশাপাশি ক্রু ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ ওই বিমানের কেউই ঢাকা ছাড়ার আগে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করেননি।
তদন্তকারী দলের এক সদস্য জানিয়েছেন, ছাত্র-জনতা যখন গণভবনে প্রবেশ করে, তখন শেখ হাসিনা উড়োজাহাজে। ওই সময়ই এটির ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দেওয়া হয়। ট্রান্সপন্ডারের মাধ্যমে উড়োজাহাজের অবস্থান, গন্তব্য, উচ্চতা, গতি ও স্বয়ংক্রিয় জিওলোকেটরের তথ্য পাওয়া যায়। উড়োজাহাজটি যখন পশ্চিমবঙ্গের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন এটির ট্রান্সপন্ডার পুনরায় চালু করা হয়।
অপরদিকে উড়োজাহাজটির জিওলোকেটর চালু করা হয় ঢাকা-কলকাতা রুটের ‘বিইএমএকে’ ওয়ে পয়েন্টে পৌঁছানোর পর। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ উড়োজাহাজটির কোড নম্বর দেয় ১৪৩১। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল থেকে প্রতিটি উড়োজাহাজকে চার সংখ্যার এমন আলাদা একটি কোড দেওয়া হয়। কোডটি হাসিনাকে বহনকারী উড়োজাহাজের ট্রান্সপন্ডারে ম্যানুয়ালি যুক্ত করা হয়। হাসিনাকে বহনকারী উড়োজাহাজের যাত্রাপথ ও বাংলাদেশের ভেতরে এটির অবস্থান গোপন রাখতেই বন্ধ রাখা হয় ট্রান্সপন্ডার।
হাসিনা-রেহানাকে বহনকারী উড়োজাহাজটিকে ২৪ হাজার ফুট উচ্চতায় যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। উড্ডয়নের পর শাহজালাল বিমানবন্দরের ট্রাফিক কন্ট্রোলার হাসিনাকে বহনকারী উড়োজাহাজের পাইলটকে একটি সতর্কতাবার্তাও পাঠান। এতে বলা হয়, একটি উড়োজাহাজ ঢাকার দিকে আসছে এবং এটি তাদের ঠিক উপরে আছে।
শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পরদিন ৬ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সে দেশের পার্লামেন্টে একটি বিবৃতি দেন। এতে তিনি শেখ হাসিনাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের জানামতে নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন ভারতে আছেন।’ পরে সংসদীয় কমিটির এক সভায় জয়শঙ্কর বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা জানতাম হাসিনার সরকার টিকবে না। তবে কিছু করার ছিল না। পরিস্থিতি আমাদের হাতের বাইরে চলে গিয়েছিল।’
জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশের কথা উল্লেখ করে ঢাকার পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে দিল্লির কাছে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। এসব চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
এদিকে শেখ হাসিনাকে ফেরত এনে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের বিষয়ে আশাবাদী বর্তমান সরকারও। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে দেওয়া পৃথক বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান শেখ হাসিনাকে দেশে এনে রায় কার্যকর করার অঙ্গীকার করেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, স্বৈরাচার হাসিনা একটি দেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। ওখান থেকে বড় বড় কথা বলছেন। আমরা তার প্রত্যাবর্তন চেয়েছি আইনানুগভাবে। এক্সট্রাডিশন চুক্তি অনুসারে ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের সময় পত্র দেওয়া হয়েছে, আমরা তাগাদাপত্র দিয়েছি। আমরা চাই তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা হবে।
আইনমন্ত্রী বলেছেন, শেখ হাসিনা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হওয়ায় দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় আদালতের রায় কার্যকর করা হবে। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে সরকার প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে ধারাবাহিকভাবে তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


