২০২৬ বিশ্বকাপের যত রেকর্ড

২০২৬ বিশ্বকাপের যত রেকর্ড

স্পেন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। ৩৯ দিন ধরে হওয়া বিশ্বকাপের এই ২৪তম আসরে শুধু উন্মাদনাতেই ভাসেননি ফুটবলপ্রেমীরা, ফুটবল ইতিহাসের পাতায় যোগ হয়েছে অনেক রেকর্ডও। রেকর্ড ভাঙা-গড়ার এ আসর যেমন নির্মল ফুটবল আনন্দ উপহার দিয়েছে বিশ্বকে, পাশাপাশি অজস্র গল্প আর সোনালি ইতিহাসও রচিত হয়েছে। টুর্নামেন্টের ফরম্যাট, খেলার বৈচিত্র্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পরিসংখ্যানের দিক থেকে রীতিমতো বিপ্লব ঘটেছে। এবারের বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক রেকর্ডগুলো দেখে নেওয়া যাক।

বিজ্ঞাপন

প্রথমবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপ

এবারের বিশ্বকাপ অতীতের সব আসরকে ছাড়িয়ে গেছে। ৩২ বলের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে এবারই প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ ৪৮ দল নিয়ে হয়েছে বিশ্বকাপ। আগের ৬৪ ম্যাচের জায়গায় এবার সর্বোচ্চ ১০৪টি ম্যাচ দেখার সুযোগ পেয়েছেন দর্শক। নকআউট পর্বে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে ‘রাউন্ড অব থার্টি টু’। শুধু তা-ই নয়, এবারই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিন দেশÑমেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করার কৃতিত্ব দেখায়।

সর্বাধিক গোল

বিশ্বকাপ ইতিহাসে এবার সবচেয়ে বেশি গোল হয়েছে। ১০৪ ম্যাচে মোট গোল হয়েছে ৩০৮টি। প্রতি ম্যাচে গোল গড় ২.৯-এর উপরে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ৬৪ ম্যাচে গোল হয়েছিল ১৭২টি। এবারের বিশ্বকাপে দ্রুততম গোলটি হয়েছে মাত্র ৬৫ সেকেন্ডে। তুরস্কের বিপক্ষে প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডার মাতিয়াস গালারজা গোলটি করেন।

ছয় বিশ্বকাপে খেলার কীর্তি

বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে লিওনেল মেসি ছয়টি বিশ্বকাপে খেলার রেকর্ড গড়েছেন। এই আর্জেন্টাইনের রেকর্ড গড়ার পর ফুটবল মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ছয়টি বিশ্বকাপে খেলার মাইলস্টোন স্পর্শ করেছেন। এমন রেকর্ড ইতিহাসে আগে কেউই গড়তে পারেননি। এর আগে জার্মানির লুথার ম্যাথিউস, ইতালির জিয়ানলুই বুফেন, গুইলামো ওচোয়া পাঁচ বিশ্বকাপ আসরে খেলার দৃষ্টান্ত দেখিয়েছিলেন।

বয়স্ক কোচ অ্যাডভোকেট

কুরাসাওয়ের ডিক অ্যাডভোকেট সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছেন। ৭৮ বছর ২৭১ দিন বয়সে কুরাসাও দলকে ডাগআউট থেকে নেতৃত্ব দেন অ্যাডভোকেট। এর আগে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বয়স্ক কোচ ছিলেন চেক প্রজাতন্ত্রের মিরোস্লাভ কোবেক। তিনি ৭৪ বছর ২৯৬ দিন বয়সে চেক দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার হুগো ব্রোস (৭৪ বছর ৭৯ দিন), ঘানার কার্লোস কুইরোজ (৭৩ বছর ১২৪ দিন) ও গ্রিসের হার রেহাগেল (৭১ বছর) বিশ্বকাপে বয়স্ক কোচ হিসেবে পরিচিতি পান।

বেলিংহাম-কেইন ও এমবাপ্পে-দেম্বেলে জুটি

সতীর্থ হিসেবে বিশ্বকাপে ছয়টি করে গোল করার রেকর্ড গড়লেন ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহাম-হ্যারি কেইন এবং ফ্রান্সের এমবাপ্পে-উসমান দেম্বেলে জুটি। বিশ্বকাপে আগে এমন কৃতিত্ব দেখান হাঙ্গেরির শান্দোর কোচিশ-ফেরেন্স পুসকাস ও ব্রাজিলের জাইরজেনিয়ো-পেলে এবং রোনালদো-রিভালদো।

দিদিয়ের দেশমের ২৬

কোনো দলের প্রধান কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২৬ ম্যাচে কোচিং করার নজির দেখালেন দিদিয়ের দেশম। এতে পেছনে ফেললেন জার্মানির হেলমুট স্কনকে। ২৫ বিশ্বকাপ ম্যাচে কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দেশের সংখ্যাটা আরো বাড়ত, যদি না তার মায়ের মৃত্যুর কারণে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি মিস না করতেন। ২০১৪ বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছিলেন ৫৭ বছর বয়সি ফরাসি কোচ দেশম। এরপর তার অধীনে ২০১৮ বিশ্বকাপ জিতেছে ফরাসিরা। ২০২২ বিশ্বকাপে ফাইনালে খেলে ফ্রান্স। এবার বিশ্বকাপে চতুর্থ হয়েছে দেশমের দল। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি জয়ের রেকর্ডেও দেশম ছাড়িয়ে গেছেন স্কনকে।

সবচেয়ে কম বদলি খেলোয়াড়

বসনিয়া ও হার্জেগোবিনার বিপক্ষে সুইজারল্যান্ডের হয়ে সবচেয়ে কম বয়সি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন জোহান মানজাম্বি। তখন তার বয়স ছিল ২০ বছর ২৪৭ দিন। এতে প্যারাগুয়ের নেলসন কুয়েবাসকে পেছনে ফেলে রেকর্ড গড়েন মানজাম্বি।

সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এমবাপ্পে

বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডটি এখন কিলিয়ান এমবাপ্পের দখলে। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে হারের ম্যাচে জোড়া গোল উপহার দেন এই ফরাসি তারকা। এতে ছাড়িয়ে যান লিওনেল মেসির রেকর্ড। এমবাপ্পের গোলসংখ্যা সর্বোচ্চ ২২। তার পেছনে থাকা মেসির গোল ২১টি। এর আগে ১৬ গোল করে বিশ্বকাপে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা। আর ব্রাজিলের রোনালদো করেন ১৫ গোল।

সর্বাধিক জয় মেসির

বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জয়ের রেকর্ড গড়েছেন লিওনেল মেসি। এই আর্জেন্টাইন সুপার স্টার সর্বোচ্চ ২৩ ম্যাচ জিতেছেন। এবার ফাইনালে হারের আগে টানা সাত ম্যাচ জিতেছে মেসির দল আর্জেন্টিনা। এই রেকর্ডে মেসির পেছনে আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। তার জয়ের সংখ্যা ১৭। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বকাপের এক ম্যাচে সর্বাধিক ৯ বার গোলপোস্টে শট নেন মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করার ম্যাচে এই রেকর্ড গড়েন তিনি। তাতে ছাড়িয়ে যান ফনটেইন ও জাইরজেনিয়োকে। তারা ছয়বার অন টার্গেটে শট নিয়েছিলেন। এছাড়া বক্সের বাইরে থেকে সর্বোচ্চ সাত গোল করার রেকর্ডও গড়েছেন মেসি।

ওলিসের অ্যাসিস্ট

এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ সাত অ্যাসিস্টের রেকর্ডও গড়েছেন স্পেনের মাইকেল ওলিস। এর আগে পেলে সর্বোচ্চ ছয় অ্যাসিস্টের রেকর্ড গড়েছিলেন। কিলিয়ান এমবাপ্পেকেই পাঁচ অ্যাসিস্ট করেছেন ওলিস। যে কারণে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা বনে গেছেন এমবাপ্পে।

পাসে সেরা রদ্রি

বিশ্বকাপে ৭৯০ পাস দিয়েছেন স্পেনের তারকা রদ্রি, যা বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত পাসের রেকর্ড। এর আগে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ৬৮৮ পাস দিয়েছিলেন রদ্রি। সেবার ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে জাভির ৫৯৯ পাসের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিলেন তিনি। এবার নিজেকে ছাড়িয়ে গড়লেন অনন্য রেকর্ড। এ নৈপুণ্য তাকে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার এনে দিয়েছে।

ভিন্ন ছয় বিশ্বকাপে গোল রোনালদোর

বিশ্বকাপ ইতিহাসে ভিন্ন ছয় আসরে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে গোল করার রেকর্ড গড়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এ রেকর্ড গড়তে পারেননি রোনালদোর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসিও।

এলোয়া রুমের ১৬ সেভ

এবারের বিশ্বকাপে নতুন দেশ কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক এলোয় রুম সর্বোচ্চ ১৬ সেভের রেকর্ড গড়েছেন, যা বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে। ২০১৪ বিশ্বকাপ আসরে যুক্তরাষ্ট্রের টিম হাওয়ার্ড এমন নৈপুণ্য দেখিয়েছিলেন। তবে তারচেয়ে ৩০ মিনিটের কম সময়ে সেভের রেকর্ড গড়লেন রুম।

ক্লিন শিটে রাজা সিমোন

এবারের বিশ্বকাপে আট ম্যাচ খেলে সাতটিতেই ক্লিন শিট রাখার রেকর্ড গড়েছেন স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমোন। এর আগে এক আসরে সর্বোচ্চ পাঁচ ম্যাচে ক্লিন শিটের রেকর্ড ছিল। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের জনব্লোয়েড রেকর্ডটি গড়েছিলেন।

দর্শক উপস্থিতি

বিশ্বকাপ মাঠে দর্শক উপস্থিতি আর টিকিট বিক্রিতে রেকর্ড গড়েছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে রেকর্ড সর্বোচ্চ প্রায় ৬৮ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন। এবার উত্তর আমেরিকার তিন দেশের স্টেডিয়ামে আয়োজিত বিশ্বকাপ সে রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। পুরো টুর্নামেন্টে ৬৫ লাখের বেশি দর্শকসমাগম হয়েছে। ফিফা বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দর্শক উপস্থিতির রেকর্ড এটি। শুধু তা-ই নয়, মেক্সিকোর ঐতিহাসিক এস্তাদিও এজটেকা স্টেডিয়াম প্রথম কোনো ভেন্যু হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের (১৯৭০, ১৯৮৬ ও ২০২৬) উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজন করার অনন্য রেকর্ড গড়েছে।

প্রযুক্তি ও রেফারিংয়ের নতুন যুগের সূচনা

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে ২০২৬ বিশ্বকাপ। সেমি-অটোমেটেড অফসাইড টেকনোলজি এবং উন্নত ‘স্মার্ট বল’ প্রযুক্তির ব্যবহারে অফসাইড বা ফাউল-সংক্রান্ত বিতর্ক অনেকটাই কমে আসে। ভিএআরের মাধ্যমে প্রতিটি গোল ও পেনাল্টি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ছিল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন