চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রকৌশল বিভাগে অতিরিক্ত দায়িত্বের নামে পদোন্নতি নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্থিরতা ও তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রধান প্রকৌশলীকে না জানিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে ছয়জনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়েছে সংস্থাটির সচিব আশরাফুল আমিন। শূন্য পদ না থাকার পরও অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। পাশাপাশি অর্গানোগ্রাম ও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি দেওয়ায় সংস্থার চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এ কারণে কর্মকর্তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ বাড়তে থাকায় নষ্ট হচ্ছে কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ, সেই সঙ্গে ভাবমূর্তি সংকটে পড়তে পারে চসিকের মতো সেবা সংস্থা।
চসিকের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী পদ রয়েছে ১৪টি। বর্তমানে যার কোনোটি শূন্য নেই। চসিকের বিদ্যমান অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী, মোট পদের ৬৭ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ ও ৩৩ শতাংশ অভ্যন্তরীণ পদোন্নতির বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে চসিকে সরাসরি নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি ছয়জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে পদোন্নতির নামে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন সচিব আশরাফুল আমিন। যাদের সবাই ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী প্রকৌশলী। এছাড়া সর্বশেষ ১৪ জুন জ্যেষ্ঠতার তালিকায় নবম স্থানে থাকা সহকারী প্রকৌশলী (পুর) জাহিদুর রশিদ ভূঁইয়াকে নিয়ম ভেঙে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। আটজনকে ডিঙিয়ে এই ব্যক্তিকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে সংস্থাটির প্রকৌশল বিভাগে।
অন্যদিকে, চাকরিতে অস্থায়ী হলেও নির্বাহী প্রকৌশলী এবং কন্ট্রোলার অব স্টোর পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে আসছেন তাসমিয়াহ তাহসীন। চসিকের চাকরি বিধিতে কোনো অস্থায়ী কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার বিধান নেই।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিভাগটিতে কোনো পদ খালি না থাকার পরও কীভাবে এই দায়িত্ব দেওয়া হলো, তা নিয়ে পুরো সিটি করপোরেশনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ মোটা অঙ্কের লেনদেনের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, মূল পদ উপসহকারী প্রকৌশলী হলেও অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়া কর্মকর্তারা কখনো আগের পদ ধারণ করেন না। তাছাড়া ১৪টি পদের সবকটি পূর্ণ থাকার পরও ছয়জনকে দায়িত্বে আনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে বলেও জানা তারা। এই অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা যোগ্য কর্মকর্তারা চরমভাবে বঞ্চিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
অথচ চলতি দায়িত্ব বা অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান নীতিমালা-২০২৩-এ বলা হয়েছে, অতিরিক্ত দায়িত্ব হলো সাময়িকভাবে কোনো সরকারি কর্মচারীকে তার মূল পদের/গ্রেডের/সমপদে/সমগ্রেডের কিংবা ক্ষেত্রমত, নিম্নপদে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত অন্য কোনো শূন্য পদে দায়িত্ব প্রদান। কিন্তু চসিকে ছয়জনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে এই নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটেছে। যেখানে কোনো শূন্য পদ না থাকার পরও সমপদের প্রকৌশলীদের পরিবর্তে নিম্ন পদের প্রকৌশলীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নীতিমালায় বলা আছে, সাময়িক শূন্যপদে সমপদধারী কর্মচারীদের অগ্রগণ্যতা দিতে হবে। এরও ব্যত্যয় ঘটেছে।
চসিক সূত্র জানায়, চসিকের অর্গানোগ্রাম অনুসারে সহকারী প্রকৌশলী পদ ১৪টি। একজন অস্থায়ীসহ মোট ১৫ জন রয়েছেন। নতুন করে ছয়জনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ায় পদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১। বড় ধরনের রদবদল হলেও খোদ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীকেও বিষয়টি জানাননি চসিকের সচিব আশরাফুল আমিন। নীতিমালার তোয়াক্কা না করে তিনি একক সিদ্ধান্তে ছয়জনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়েছেন বলে সংস্থাটির ভেতরে-বাইরে আলোচনা চলছে।
সূত্র আরো জানায়, ২১ জন সহকারী প্রকৌশলীদের মধ্যে অনেকে নির্বাহী প্রকৌশলী অতিরিক্ত দায়িত্বেও রয়েছেন। তাদের বাদ দিলে সহকারী প্রকৌশলীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫ জনে। যার মধ্যে মাত্র চারজন বিএসসি ও ১১ জন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী। সে হিসাবে বিএসসির হার ২৭ ও ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীর হার দাঁড়ায় ৭৩ শতাংশে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সহকারী প্রকৌশলী জানান, অর্গানোগ্রাম-বহির্ভূত এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চসিকের বিএসসি প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের সুপ্ত দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কাজের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে।
আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চসিকে সব পদোন্নতি ও অতিরিক্ত দায়িত্ব ওয়েবসাইটে গোপন করা হয়। তাছাড়া সচিবালয় শাখা থেকে দীর্ঘদিন জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হয় না। এসব অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তিরা পরবর্তী সময়ে মামলা করে অন্যদের পদোন্নতি আটকে দেবে বলে আশঙ্কা সহকারী প্রকৌশলীদের।
চসিকের সচিব আশরাফুল আমিন অর্গানোগ্রাম লঙ্ঘনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, অর্গানোগ্রাম অনুসরণ করলে সিটি করপোরেশন চালানো সম্ভব নয়। কাজের পরিধি বাড়ায় আমরা দায়িত্ব দিয়েছি। এছাড়া সিটি করপোরেশনে কখনো জ্যেষ্ঠতা মানা হয়নি। এরকম কোনো রেকর্ড অতীতেও নেই।
চসিকের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান জানান, তিনি পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে কিছুই জানেন না। বিভাগের প্রধান হিসেবে তাকে জানানো উচিত ছিল। অর্গানোগ্রাম লঙ্ঘনের বিষয়টিও স্বীকার করেন তিনি।
এ বিষয়ে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, যেসব অতিরিক্ত দায়িত্ব অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে সেগুলো থাকবে না। আমি সবকিছু অবগত হয়েছি। এগুলোর ব্যাপারে আমি ব্যবস্থা নেব। আইনবহির্ভূত কোনো কাজ হবে না ইনশাল্লাহ।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিটি করপোরেশন-২ শাখার উপসচিব রবিউল ইসলাম জানান, আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। যেহেতু আমার কোনো অনুমতি তারা নেয়নি। চসিক অতিরিক্ত দায়িত্বের আদেশগুলো দিয়েছে, সুতরাং তারাই ভালো জানবে।
এ বিষয়ে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) টিআইবি চট্টগ্রামের সভাপতি নগর বিশেষজ্ঞ দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, দ্রুত অর্গানোগ্রাম সংশোধন ও জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা জরুরি। তা না হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টি হয়ে এভাবে অশান্তি, অসন্তোষ দিনদিন বাড়বেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

