আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

পোস্টাল ভোটে অনীহা সরকারি কর্মচারীদের

বেলাল হোসেন

পোস্টাল ভোটে অনীহা সরকারি কর্মচারীদের

নির্বাচনের আর মাত্র আটদিন বাকি। ভোটের উৎসবে চারদিক সরগরম হলেও অনেকটাই চুপচাপ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এবারই প্রথম পোস্টাল ভোটের নিবন্ধন করেন তারা। নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ১৭ লাখ কর্মীর মধ্যে মাত্র পাঁচ লাখ ১৮ হাজার ৬০৩ জন নিবন্ধন করেন। নিবন্ধনের বাইরে থাকা প্রায় ১২ লাখ সদস্য অনীহার কারণে ভোট দেওয়া বিরত থাকছেন বলে জানা গেছে।

ভোটের বিষয়ে অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভোটের দায়িত্ব ও পরিবারের নিরাপত্তা ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দেন তারা। যাদের নির্বাচনের দায়িত্ব নেই, ওইসব সরকারি চাকরিজীবীর বড় একটা অংশও এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারে। আবার অনেকের মোবাইলে পোস্টাল ব্যালট পৌঁছানোর মেসেজ এলেও তা গ্রহণের বিষয়ে তেমন আগ্রহ নেই তাদের।

বিজ্ঞাপন

স্বাধীনতা-পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে পোস্টাল ভোট চালু ছিল। তবে বিগত সময়ে এর তেমন প্রচার না থাকলেও এবারই প্রথম অনলাইনে পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন শুরু করা হয়। নির্বাচন কমিশন বিষয়টা নিয়ে ব্যাপক প্রচার করেছে দাবি করলেও অনেক সরকারি কর্মচারী বিষয়টা জানেন না বলে অভিযোগ করেছেন।

দেশের প্রায় ২০ লাখ সরকারি কর্মচারীর মধ্যে বেশির ভাগই থাকেন নিজ ভোটার এলাকার বাইরে। রাজধানীতে কর্মরত বেশির ভাগের মধ্যে ভোট না দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। অনেকেই বলছেন, ভোটের দায়িত্ব নিয়ে বেশি ব্যস্ত। পোস্টাল ভোট নিয়ে এত ভাবছি না, এ জন্য নিবন্ধন করিনি। আবার যারা নির্বাচনের দায়িত্বে নেই, তারা ফ্যামিলিকে এলাকায় পাঠাতেও নিরাপত্তা বোধ করছেন না। নির্বাচনের দীর্ঘ ছুটিতে পরিবার নিয়ে যাতায়াত ও যানবাহনের ঝুঁকি দেখছেন।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৩৮২ জন দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে প্রিজাইডিং অফিসার ৪২ হাজার ৭৭৯ জন। সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার দুই লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন। পোলিং অফিসার চার লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন। সব মিলিয়ে ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাত লাখ ৮৫ হাজার ২২৫।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আট লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন সদস্য ভোটের মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর এক লাখ, আনসার ও ভিডিপির পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, পুলিশের এক লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, বিজিবির (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) ৩৭ হাজার ৪৫৩, ফায়ার সার্ভিসের ১৩ হাজার ৩৯০, র‌্যাবের সাত হাজার ৭০০, নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার, বিমানবাহিনীর তিন হাজার ৭৩০ এবং কোস্ট গার্ডের তিন হাজার ৫৮৫ জন দায়িত্ব পালন করবেন।

সম্প্রতি প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে কর্মরত বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মচারী, ব্যাংককর্মী ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ভোটের দায়িত্ব নিয়ে তো ব্যস্ত। পোস্টাল ভোটে নিয়ে তেমন আগ্রহ ছিল না বলে জানান। পরিবারের অন্য সদস্য এলাকায় গিয়ে ভোট দেবে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, এ সময় পরিবারকে এলাকায় পাঠানো নিরাপদ বোধ করছেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা বলেন, যারা নির্বাচনে ডিউটি করে, তারা কি আবার ভোট দেয়। পোস্টাল ভোট দিতে এ বছর থেকে অনলাইনে নিবন্ধন করা হয়েছে এ বিষয়ে জানেন কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটা নিয়ে তেমন কিছু জানি না। কেউ তো কিছু বলেনি।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে কর্মরত মো. সামছুল আলম বলেন, আমি ঢাকা সিটির ভোটার। প্রথমে ভেবেছিলাম নির্বাচনে দায়িত্ব হয়তো পড়বে না। তবে গত ৪ জানুয়ারি নির্বাচনে দায়িত্ব পাই। পরে পোস্টাল ভোটের জন্য কয়েকবার নিবন্ধনের চেষ্টা করি। পরে আর করতে পারিনি। একই মন্ত্রণালয়ের আরো বেশ কয়েকজন বলেছেন, নিবন্ধনের বিষয়টা একটু জটিল।

রাজধানীর গুলিস্থানের রূপালী ব্যাংক শাখার উপব্যবস্থাক মো. মামুনর রশীদ মোল্লা জানান, এখানে ২৩ জন কর্মী আছে। এদের মধ্যে ছয়জন নির্বাচনের দায়িত্ব পেয়েছেন। তবে পোস্টাল ভোটের জন্য দুজন নিবন্ধন করেছেন।

ব্যাংকের আরেক কর্মী জানান, তিনি গাজীপুরের ভোটার। নির্বাচনের দায়িত্ব পাননি। ভোট দিতে এলাকায় যাবেন কি না—প্রশ্নের উত্তরে বলেন, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করব।

বগুড়া জেলা সদরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, স্কুলে বাচ্চাদের নিয়ে ব্যস্ততা। আবার ভোটের দায়িত্ব পেয়েছি। তবে পোস্টাল ভোটের বিষয়ে সে রকম সময় হয়ে ওঠেনি। নিবন্ধনটা একটু জটিল ছিল। তাই করা হয়নি। তিনি আরো বলেন, অনেক শিক্ষক বিষয়টাতে সেভাবে আগ্রহ দেখায়নি। তবে কিছু শিক্ষক নিবন্ধন করেছে বলেও জানান।

নির্বাচন কমিশনের গত ৩১ জানুয়ারির তথ্য অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দিতে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে (দেশে ও প্রবাসী মিলে) ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে চার লাখ ৫৮ হাজার ৫৯ জন প্রবাসী ভোটার ভোটদান সম্পন্ন করেছেন। পোস্টাল ভোটে নিবন্ধনকারী সাত লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ব্যালট সংশ্লিষ্ট প্রবাসী গন্তব্যের দেশে পৌঁছেছে। পাঁচ লাখ ১৮ হাজার ৩৪৫ প্রবাসী ভোটার ব্যালট গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে এক লাখ ৪৪ হাজার ৮৬০ জন প্রবাসীর ভোটের ব্যালট বাংলাদেশে পৌঁছেছে।

এছাড়া পোস্টাল ভোটের জন্য দেশের ভেতরে নিবন্ধনকারী পাঁচ লাখ ১৮ হাজার ৬০৩ ভোটারের কাছে ব্যালট পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সাত হাজার ৩৬৭ জন ভোটার ব্যালট গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে চার হাজার ৯০২ জন ভোটার ভোটদান করেছেন।

এ বিষয়ে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ আমার দেশকে বলেন, এবার অনেকেই হয়তো মনে করেছেন ভোটে দায়িত্ব পড়বে না। তারা নিজ এলাকায় ভোট দিতে যাবেন। নিবন্ধনের প্রায় শেষ মুহূর্তে যখন ভোটের দায়িত্ব পেয়ে গেছেন, তখন হয়তো অনেকেই তাড়াহুড়ো করে নিবন্ধন করতে গিয়ে বাদ পড়েছেন।

পোস্টাল ভোটের নিবন্ধনের বিষয়ে অনেকে জানে নাÑএ বিষয়ে তিনি বলেন, এত প্রচারের পরও কেউ যদি বলে, এ বিষয়ে জানে না, তাহলে এটা নিয়ে আমার মন্তব্য করার কিছুই নেই। ভোটের দায়িত্ব অনুযায়ী পোস্টাল ভোটের নিবন্ধন কম হয়েছে কি? উত্তরে ইসি সচিব বলেন, এ বিষয়ে ভোটের পরে বলা যাবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন