দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে ঢাকা-ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক চুক্তি। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই বাণিজ্য সমঝোতার ফলে মার্কিন বাজারে শুল্ক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভারতের অর্থনীতিতে।
রুশ তেল ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্কের সময় ভারতের বস্ত্র রপ্তানি বড় ধাক্কা খায়। পরে তা কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হলে কিছুটা স্বস্তি আসে। তবে ঢাকা-ওয়াশিংটন চুক্তির সূক্ষ্ম শর্ত প্রকাশের পর সেই স্বস্তি মিলিয়ে গেছে। কার্যত মার্কিন বাজারে ঢাকার বাণিজ্য সুবিধার সামনে দিল্লি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ভারতের বস্ত্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি দিল্লি-ওয়াশিংটন দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় মার্কিন বাজারে ভারতীয় টেক্সটাইল পণ্যের শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে। সে সময় বাংলাদেশের ওপর ২০ শতাংশ, পাকিস্তানের ওপর ১৯ শতাংশ, চীনের ওপর ৩০ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর ছিল। তুলনামূলক কম শুল্কের কারণে ভারত এশিয়ার প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে অনেকটা এগিয়ে যায়।
তবে পাশার দান উল্টে যায় এর কিছুদিন পরেই। ঢাকা-ওয়াশিংটন চুক্তির পরে হতাশার আগুনে পুড়ছে দিল্লির বাণিজ্য। চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্কহার ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক মার্কিন বাজারে রপ্তানি করলে তা শূন্য শুল্কে প্রবেশের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে ভারতীয় পণ্যকে ১৮ শতাংশ শুল্ক দিয়েই প্রবেশ করতে হবে।
রপ্তানিকারকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানি কৌশলে মৌলিক পরিবর্তন আনবে। এতদিন ভারত থেকে তুলা আমদানি করে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হতো। এখন কাঁচামাল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকে এনে সেই বাজারেই শুল্ক সুবিধা নিয়ে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে সরবরাহ শৃঙ্খলে কৌশলগত সমন্বয় ঘটবে এবং বস্ত্র খাত লাভবান হবে।
তারা আরো মনে করেন, পারস্পরিক শুল্কহার কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও বাংলাদেশি তৈরি পোশাক বিনাশুল্ক সুবিধা নেবে। এতে প্রতিবেশী দেশের চেয়ে আমাদের ব্যবসায়ীরা অনেক বেশি সুবিধা পাবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে যত বেশি তুলা আমদানি করা হবে, তার অনুপাতে তৈরি পণ্য শুল্ক ছাড়ে রপ্তানির সুযোগ মিলবে।
পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের বস্ত্র রপ্তানি প্রায় ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট বস্ত্র ও পোশাক রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ যায় মার্কিন বাজারে। ফলে দুই দেশের জন্যই এ বাজার কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) জানায়, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত থেকে, যার মধ্যে নিট পণ্যের অবদান প্রায় ৫৫ শতাংশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে তুলা আমদানিতে ভারতের অংশ ছিল ৩১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। উল্লিখিত সময়ে ভারত ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তুলা সরবরাহকারী দেশ। কিন্তু নীতিগত অনিশ্চয়তা, রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ও মূল্য অস্থিরতার কারণে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশে। এক বছরে ভারত থেকে তুলা আমদানি কমেছে ২১ শতাংশের বেশি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে এক দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারের সুতা রপ্তানি করেছে, যার পরিমাণ প্রায় ৫৭ কোটি কেজি। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের তুলার বড় ক্রেতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতার বড় অংশই আসত ভারত থেকে, যা নিট পোশাক উৎপাদনে ব্যবহৃত হতো। এই নির্ভরতা ভারতের জন্য ছিল কৌশলগত সুবিধা।
তবে নতুন চুক্তিতে মার্কিন তুলা ব্যবহারের প্রণোদনা তৈরি হওয়ায় সরবরাহ চেইনে বড় রদবদলের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি হয়েছে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলারের, যা আগের বছর ছিল ২৭৮ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে মোট তুলা আমদানির প্রায় এক-দশমাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। নতুন ব্যবস্থায় এ হার আরো বাড়তে পারে। এতে তুলা আমদানিতে ভারত নির্ভরতা থাকছে না।
টেক্সটাইল মিল মালিকদের মতে, ভারতীয় তুলা একসময় সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে রপ্তানি নীতি বারবার পরিবর্তিত হওয়ায় আমরা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছি। ফলে বিকল্প উৎস খোঁজার প্রয়োজন দেখা দেয়। নতুন চুক্তি সেই সুযোগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি গুণগত মান ও মূল্য স্থিতিশীলতার বিষয়েও মার্কিন তুলা তুলনামূলক সুবিধাজনক বলে তারা মনে করেন।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল আমার দেশকে বলেন, চুক্তিটি সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক। চুক্তির দুটি দিক রয়েছে, একটি হলো আমরা কী পাব, আর কী দেব। তাদের দেওয়ার বিষয়টি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমি দেখতে চাই কী পাব।
তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শুল্কহার কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, যেখানে আমাদের আরো ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমের প্রত্যাশা ছিল। তবে যতটুকু হয়েছে তাতেও অনেক কিছু পাওয়ার আছে। ভারতের তুলনায় ১ শতাংশ বেশি শুল্ক থাকলেও মার্কিন তুলা ব্যবহার করে শূন্য শুল্ক সুবিধা পাওয়া গেলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, আমরা ভারতের তুলার সবচেয়ে বড় ক্রেতা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এখনো আমরা কিছু তুলা আনছি। চুক্তির বাস্তবায়ন শুরু হলে সেখান থেকে তুলা আমদানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে, তাতে ভারতের তুলা ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের দেশে কটন সুতার চাহিদাই বেশি, যার ফলে ভারত তাদের তুলার বড় বাজার হারাবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের তুলার মান পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় ভালো হওয়াতে আমাদের আমদানিকারকরা সেদিকেই ঝুঁকবে বেশি। তুলার দাম ও সরবরাহ সময় একটি বিবেচ্য বিষয়। তবে তাদের সুষ্ঠু রপ্তানি নীতি প্রয়োগ থাকলে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব। চুক্তির আলোকে দুই দেশ সমানভাবে লাভবান হবে।
ভারতের অভ্যন্তরেও এ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির মহাসচিব চন্দ্রিমা চ্যাটার্জি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, বাংলাদেশ যদি মার্কিন তুলা ব্যবহার করে নিজস্ব মিলগুলোতে সুতা উৎপাদন বাড়ায়, তবে ভারতীয় সুতার বাজার সংকুচিত হবে। ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের টেক্সটাইল বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান সঞ্জয় কে জৈন মনে করেন, ১০০ শতাংশ তুলাভিত্তিক পণ্যে ভারত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
এছাড়া কংগ্রেসের নেতারা বলছেন, বাংলাদেশি পণ্যের জন্য আমেরিকার শূন্য শুল্ক সুবিধা ভারতের জন্য দ্বিমুখী চাপ তৈরি করবে। একদিকে তুলাচাষি, অন্যদিকে সুতা উৎপাদনকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ইতোমধ্যে কয়েকটি বস্ত্র ও সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে দরপতন হয়েছে বলে ভারতীয় বাজার বিশ্লেষকরা তুলে ধরেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা-ওয়াশিংটন চুক্তি শুধু শুল্ক সুবিধার বিষয় নয়; এটি আঞ্চলিক বাণিজ্য ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভারতের জন্য এটি সতর্কবার্তা। আঞ্চলিক সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে আধিপত্য নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক ও সমতাভিত্তিক সহযোগিতার দিকে আরো গুরুত্ব দিতে হবে তাদের। বাংলাদেশ তুলাসহ কাঁচামাল আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য এনে মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্ত করছে। ফলে শুল্ক সমীকরণের এই পালাবদলে ঢাকার কৌশলগত সাফল্যে দিল্লির বাণিজ্যিক হিসাব নড়বড়ে হয়ে গেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

