আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মডেল ১২ ফেব্রুয়ারি

সৈয়দ আবদাল আহমদ

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মডেল ১২ ফেব্রুয়ারি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ’ নির্বাচনের মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সুষ্ঠু হওয়ার পাশাপাশি নির্বাচনটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণও ছিল। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইতিহাসসেরা নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার সেই স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতি শতভাগ পূরণ হয়েছে। সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দিনটি ছিল দেশের মানুষের কাছে একটি অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক দিন। গুলশান মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে ড. ইউনূস নিজেই বলেন, ‘এ নির্বাচন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন।’ নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৬১ শতাংশের কাছাকাছি। এর আগে ১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন সরকারের সেরা নির্বাচনটিতে ভোট পড়েছিল ৫৫ শতাংশ।

গতকালের নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ভূমিধস বিজয় লাভ করেছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের ইতিহাসে ৮০টির বেশি আসনে জয়ী হয়ে সংসদে বিরোধী দল হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।

বিজ্ঞাপন

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের কারিগর বিএনপির নতুন কান্ডারি, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার নির্বাচনি প্রচার কৌশল ও অঙ্গীকার (ইশতেহার) দেশের মানুষ গ্রহণ করেছে। ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ বা দেশ গড়ার পরিকল্পনা এবং ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কার্ড ও অন্যান্য সেবামূলক কর্মসূচি ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মতো তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বেরও বিজয় প্রমাণিত হয়েছে এ নির্বাচনে।

নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের মাধ্যমে তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। জীবনের প্রথম দুটি আসনে ভোটে দাঁড়িয়ে দুটিতেই জয়লাভ করেন। নিজ জেলা বগুড়ার সাতটি আসনে যেমন তার দল বিজয়ী হয়েছে, তেমনি শ্বশুরের এলাকা বৃহত্তর সিলেটেও চমক দেখিয়েছেন।

১৯৯১ সালের নির্বাচনের মতোই এবারের নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক গোষ্ঠীর মধ্যে ২৩ সদস্যের কমনওয়েলথ দল, ২০০ সদস্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন দল, সার্ক পর্যবেক্ষক দল, যুক্তরাষ্ট্রের আইআরআই, চীন ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার পাঁচ শতাধিক পর্যবেক্ষক বাংলাদেশের এ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন।

পর্যবেক্ষকেরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে প্রাথমিকভাবে তাদের প্রতিক্রিয়ায় এক বাক্যে বলেছেন, এ নির্বাচন সুন্দর এবং বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ, উদ্দীপনা ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমরা দেখতে পেয়েছি। ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ছিল সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ। আমরা এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করি।

বিগত দুই দশক ধরে বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রহীন অবস্থায় ছিলেন। শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈর ও ফ্যাসিবাদী শাসনামলে নির্বাচনের নামে এমন প্রহসন হয়েছে যে, সেসব কেলেঙ্কারির ঘটনা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এ নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহের কারণ সেটাই। নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটাররা ব্যাপক সংখ্যায় ভোট দিয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি থেকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের নেতানেত্রী দিনরাত অসংখ্য নির্বাচনি সভায় ভাষণ দিয়েছেন। এতে অনেক প্রার্থীর কণ্ঠস্বরও ভেঙে যায়। নির্বাচনের দিন বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে ভোটারদের উপস্থিতি ও আনন্দ উচ্ছ্বাস দেখে মনে হয়েছে, এটা বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব। নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুসের ভাষায় সেটা ছিল ‘ঈদ উৎসবের’ মতো ঘটনা। ভোটের দুই দিন আগে মানুষ বাস, ট্রেন ও লঞ্চে করে যেভাবে ভোট দেওয়ার জন্য বাড়ি গেছেন তা ঈদে বাড়ি ফেরার দৃশ্যের মতো ছিল।

আন্তর্জাতিক সব সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের নির্বাচনটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে। রয়টার্স ও আল জারিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চব্বিশের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত ১২ ফেব্রুয়ারির এ নির্বাচন ‘গণতন্ত্রে ফেরার এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’। এএফপি ও বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, তরুণ ও জেনজি ভোটারদের ব্যাপক আগ্রহ নির্বাচনে লক্ষ্য করা গেছে। অনেক তরুণ ভোটার এবারই প্রথম তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। সংবাদমাধ্যমগুলোতে আরো বলা হয়, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গেছে। বিবিসি মন্তব্য করেছে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রে ফেরার এক বিরাট সুযোগ এনে দিয়েছে।

একজন সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বাংলাদেশে নির্বাচন কভার করেছেন। তার কাছে মনে হয়েছে, ১৯৯১ সালের সেরা নির্বাচনের চেয়েও এবারের নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও সুন্দর হয়েছে।

রাষ্ট্রচিন্তক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, আমি আগেই বলেছিলাম নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৬০ শতাংশের নিচে নামবে না। আরো বেশি হতে পারে। এবারের নির্বাচনে সত্যিকারের প্রতিযোগিতা দেখা গেছে। ভোটারদের মধ্যে দীর্ঘ দেড় দশক পর ভোট দেওয়ার ব্যাপক উদ্দীপনা লক্ষ করা গেছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করবে—সেটা নিশ্চিত হয়েছে।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা এ নির্বাচনকে মানবাধিকারভিত্তিক সমাজ গঠনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনে ঐতিহাসিক একটি দিন। এত সুন্দর নির্বাচন হয়েছে যে, এ নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশের মানুষ আত্মত্যাগ করেছেন। নির্বাচনে মানুষের ভোটের প্রতি আস্থা ফিরেছে। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দল এবং জুলাইযোদ্ধাদের আন্দোলন সবার মনে রেখাপাত করেছিল। ওই আন্দোলনে মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবেই ওই আন্দোলন চলাকালে ১ হাজার ৪০০ ছাত্র-জনতা হত্যার শিকার হন। তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। ইতিহাসসেরা নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের নবযাত্রা শুরু হয়েছে। ভোটাররা তারেক রহমানের মধ্যে শহীদ জিয়া এবং দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার প্রতিচ্ছবি দেখেছেন। ভোটযুদ্ধে তারেক রহমানও পরিপক্বতা দেখিয়েছেন। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য না দিয়ে বিনয় ও শালিনতা প্রদর্শন করেছেন। তার মার্জিত বক্তব্য এবং ‘প্রতিহিংসা-প্রতিশোধ নয়’ মন্তব্য দেশবাসীকে দারুণ আকৃষ্ট করেছে। আমি তাকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...