আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জকসুতে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ শেষে গণনায় জটিলতা

আজাদুল আদনান, আশিক মাহমুদ ও লিমন ইসলাম

জকসুতে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ শেষে গণনায় জটিলতা
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মঙ্গলবার রাতে ব্যালট বাক্স পাহারায় নিরাপত্তাবাহিনী। ছবি: আমার দেশ

অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে বহু আকাঙ্ক্ষিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। কয়েক দফায় পেছানো ও স্থগিতের পর সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল, তার কোনোটাই হয়নি। গতকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই ভোটযুদ্ধে প্রার্থীদের বিচ্ছিন্ন কিছু পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপে সুষ্ঠুভাবে নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তবে ভোটারদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল। কেন্দ্রীয় সংসদে ৬৫ শতাংশ এবং হল সংসদে ভোট পড়েছে ৭৭ শতাংশ।

গতকাল বিকাল ৪টার দিকে ভোটগ্রহণ শেষ হয়। তবে গণনা নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। ওএমআর (অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন) মেশিনে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় ভোটগ্রহণের সাড়ে ছয় ঘণ্টায়ও গণনা শুরু করতে পারেনি জকসু নির্বাচন কমিশন।

বিজ্ঞাপন

সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে ভোট গণনা শুরু হলেও অতিরিক্ত জনসমাগমের কারণে প্রায় এক ঘণ্টা বন্ধ থাকে। পরে রাত ৮টার পর পুনরায় গণনা শুরু করলে মেশিনে ত্রুটি দেখা দেয়। মেশিনগুলো ভিন্ন ভিন্ন ফল দেওয়ায় স্থগিত রাখা হয় গণনা। সিদ্ধান্ত নিতে প্যানেলগুলোর প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠকে বসে নির্বাচন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

রাত ১২টার দিকে জকসু নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. কানিজ ফাতেমা কাকলি বলেন, ‘আমরা সব প্যানেলের ভিপি ও জিএস প্রার্থী, শিক্ষক সমিতি, বিভাগীয় প্রধান, ডিন, সিনেট সদস্য ও বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে মিটিং করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কনফারেন্স রুমে এক মিটিংয়ে সব পক্ষের সঙ্গে বসে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথমে ৩০০ ভোট হাতে গণনা করা হবে। এই ভোট দুই মেশিনে আবার গণনা করে দেখা হবে। যেই ওএমআর মেশিন হাতে গণনার অনুরূপ ফল দেবে সেটিতে ভোট গণনা করা হবে। এভাবে আমরা মাঝে মধ্যে হাতে গণনা করে ওএমআর মেশিনে চেক করব।’

জকসু নির্বাচনে চারটি প্যানেলে প্রত্যক্ষ ভোটে কেন্দ্রীয় সংসদে ২১ জন নির্বাচিত হচ্ছেন। আর একমাত্র ছাত্রী হল পেতে যাচ্ছে ১৫ সদস্যের সংসদ। দুই সংসদ মিলে মোট প্রার্থী ১৫৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৩৮ জন এবং নারী প্রার্থী ১৯ জন। নির্বাচনে ছাত্রদল সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান, ছাত্রশিবির সমর্থিত অদম্য জবিয়ান ঐক্য, জাতীয় ছাত্রশক্তি সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান এবং বামপন্থি ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সমর্থনে লড়ছে মওলানা ভাসানী ব্রিগেড পরিষদ।

কেন্দ্রীয় সংসদে ৬৫ ও হল সংসদে ভোট ৭৭ শতাংশ

প্রতিষ্ঠার ২১ বছর অনুষ্ঠিত জকসু নির্বাচনে আশা করা হয়েছিল সর্বোচ্চ ভোট পড়বে। তবে জকসু নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, মোট ভোটার ছিল ১৬ হাজার ৪৪৫ জন। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদে ভোট দিয়েছেন ৬৫ শতাংশ। আর হল সংসদে ভোট প্রদানের হার ৭৭ শতাংশ।

ভোটের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে জকসু

গত চার মাসের মধ্যে জকসুসহ পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটের হার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনের (ডাকসু) নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৭৩ দশমিক ৪২ শতাংশ ভোট পড়েছে। এছাড়াও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে (চাকসু) ৭০ শতাংশ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে ৬৭ শতাংশ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে (রাকসু) ৬৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ ভোট পড়ে। সেখানে জকসুতে ভোট পড়েছে মাত্র ৬৫ শতাংশ ভোট।

জীবনে এবারই প্রথম ভোট দেব

ঠিক প্রায় ২১ বছর আগে ২০০৫ সালে কলেজ থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে রূপ পায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর দুই দশক পেরিয়ে গেলেও কখনোই শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা জকসু গঠিত হয়নি। ফলে প্রথমবারের মতো প্রতিনিধি বাছাই করতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা।

মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জুনায়েদ খান চৌধুরী বলেন, ‘প্রথমবার ভোট দিতে পারছি, ফলে আনন্দটা অন্যরকম। তবে স্থগিতের দিনের যে আমেজটা ছিল এখন সেটি নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম।’

‘ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান’ প্যানেল থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘জীবনে কখনো ভোট দিতে পারিনি। এবার প্রথম ভোট দেব। প্রথমবারের মতো নিজেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। আশা করি শিক্ষার্থী ভাই-বোনেরা আমাকে ভোট দিয়ে তাদের উন্নয়নে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দেবেন।’

পক্ষপাতিত্ব নিয়ে প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

জকসু নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব ও প্রশাসনিক অসহযোগিতার অভিযোগ তুলেছেন বিভিন্ন পরিষদের প্রার্থীরা। সকাল থেকে ভোট গ্রহণ সুষ্ঠুভাবে শুরু হলেও পরে চিরকুট নিয়ে প্রবেশ, ভোটারদের লাইনে দাঁড়িয়ে প্রচারণা এবং নারীদের হেনস্তার ঘটনা নিয়ে একে-অপরের দিকে আঙুল তোলেন তারা।

ছাত্রদল সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান পরিষদের ভিপি (সহ-সভাপতি) প্রার্থী এ কে এম রাকিব বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন একটা নির্দিষ্ট একটি প্যানেলের পক্ষে কাজ করছে। একটি প্যানেলকে ভোটকক্ষে টোকেন নিয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও আমাদের দেওয়া হয়নি। পরে বিষয়টি ধরিয়ে দিলে আমাদেরকেও অনুমোদন দেওয়া হয়।’

অন্যদিকে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে নারীদের হেনস্তাসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্যে’র ভিপি প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘যখন নির্বাচন শুরু হয় তখন থেকে সুন্দর একটি পরিবেশ ছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীরা প্রবেশের পর পরই ছাত্রদলের ভাইয়েরা ক্যাম্পাসের মূল ফটকের সামনে ধাক্কাধাক্কি শুরু করে। আমরা পরবর্তী সময়ে পুলিশ প্রশাসনকে জানাই। পুলিশ প্রশাসন কিছুটা সহযোগিতা করলেও পরবর্তী সময়ে তারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এখানে তারা আমাদের একাধিক ভাইবোনসহ নারী শিক্ষার্থীদেরকে হেনস্তা করেছে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও চালিয়েছ।

ছাত্রশক্তি সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী কিশোর সাম্য অভিযোগ করে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন এই নির্বাচনে চরম পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছে। প্রশাসনের শিক্ষকদের একটি অংশ ছাত্রদল ও অন্য একটি অংশ শিবিরের প্যানেলের পক্ষে সরাসরি কাজ করেছেন।

শিবির সমর্থিত ভিপি প্রার্থীর স্ত্রীসহ ৩ নারীকে হেনস্তা

জকসু নির্বাচনকে ঘিরে কেন্দ্রের ভেতরে যখন শান্তিপূর্ণ ভোট দিচ্ছিলেন শিক্ষার্থীরা তখন কেন্দ্রের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে একাধিকবার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মূল ফটকের সামনে দুজন নারীকে জামায়াত কর্মী আখ্যা দিয়ে হেনস্তা করেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় তাদের উদ্ধারে এগিয়ে গেলে ছাত্রশিবির সমর্থিত ভিপি প্রার্থী রিয়াজুল ইসলামের স্ত্রী মাহিমা আক্তার (২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী) এবং এক পুলিশ সদস্যও হেনস্তার শিকার হন।

জানা গেছে, ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান করছিলেন ওই শিক্ষার্থী। এ সময় হিজাব ও নিকাব পরিহিত ছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে তাকে দেখে তার পরিচয় জানতে চেয়ে নিকাব ও মাস্ক খুলতে বলেন শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

ছাত্রদলের ভাষ্য, পরিচয়পত্র দেখাতে না পারায় ও জামায়াতের তিন নারী কর্মীকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে সহায়তা করায় পুলিশ মাহিমা আক্তারকে আটক করেছে। পুলিশ বলেছে, প্রাক্তন শিক্ষার্থী হয়েও নির্বাচনের প্রচার চালান মাহিমা আক্তার। তাকে হেনস্তার ঘটনা ঘটেনি। জিজ্ঞাসাবাদের পর অভিভাবকের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগী ও শিক্ষার্থী মাহিমা বলেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থান করছিলাম তখন ছাত্রদলের ভাইয়েরা এসে আমাকে হেনস্তা করে। সঙ্গে আমার এক আত্মীয় ছিল। আমরা গেটের বাইরেই অবস্থান করছিলাম। এ সময় আমি হিজাব পরিহিত থাকায় আমাকে হিজাব ও মাস্ক খুলতে বলে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভিপি প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, মহিমা আমার স্ত্রী ও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তিনি বাইরে আমাদের প্যানেলের হয়ে কাজ করছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক বলেন, বিষয়টি নজরে আসার পর এটি সমাধান হয়েছে।

এ বিষয়ে কোতোয়ালী থানার ওসি মোহাম্মদ ফয়সাল গণমাধ্যমকে বলেন, হেনস্তার কোনো ঘটনা ঘটেনি। উনি সাবেক শিক্ষার্থী হয়েও প্রচার চালাচ্ছিলেন। পরে কয়েকজন শিক্ষক আমাদের জানালে তাকে সেখান থেকে থানায় নিয়ে আসা হয়। কিছু সময় পর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংকের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সচিব ও জবির ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক বিলাল হোসাইন বলেন, জবি নিজস্ব হল না থাকায় শিক্ষার্থীরা দূর দূরান্তে অবস্থান করায় কেউ কেউ আসতে পারেননি। আবার শীতের তীব্রতা বেশি থাকায় অনেক ছাত্রছাত্রী উপস্থিত হতে পারেননি। এছাড়া পুরান ঢাকার জগন্নাথ ক্যাম্পাসে ঝামেলা হওয়ার আশঙ্কা থাকায় অনেকে ভোট দিতে আসেননি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন