আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে বাস্তবায়ন হবে জুলাই জাতীয় সনদ। বিদ্যমান সংবিধানের অনেক কিছুই পরিবর্তন হবে। ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে সমাজ, রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থায়। ভারসাম্য আসবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায়। ফিরবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, সক্রিয় হবে ন্যায়পাল। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে আপিল বিভাগ থেকে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয় পেলে আগামী সংসদ এ ধরনের ৮৪টি ধারা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে।
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতির কার্যভারের বৈধতা যাচাইয়ে ১৯৭৭ সালের ৩০ মে প্রথম গণভোট হয়। এরপর জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের অনুমোদনের জন্য ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ গণভোট হয়। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী (সংসদীয় সরকারব্যবস্থা) সংক্রান্ত গণভোট হয় ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। আর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে চতুর্থ গণভোট। অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বিষয়ে এই গণভোটের আয়োজন করেছে।
এবারের গণভোটে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি প্রস্তাবনা সাংবিধানিক এবং ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার কথা জানিয়েছে সরকার। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয় পেলে আগামী সংসদ এই ৮৪টা ধারা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। এছাড়া ‘হ্যাঁ’ জয় পেলে আগামী সংসদের সংবিধান সংস্কার পরিষদ ২৭০ দিনের (৯ মাস) মধ্যে জুলাই সনদ অনুযায়ী সাংবিধানিক সংস্কারে বাধ্য থাকবে। না করলে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া সংবিধান সংশোধনের বিল পাস বলে গণ্য করা হবে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য
জুলাই সনদে বলা হয়েছে— জরুরি অবস্থা জারি করতে হলে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে। সেই সভায় বিরোধী দলীয় নেতা/উপনেতাকেও উপস্থিত থাকতে হবে। অন্যদিকে, জরুরি অবস্থার সময় সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকারসমূহ খর্ব করা যাবে না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয় সংসদ সদস্যদের ভোটে। এই ভোট দিতে হয় প্রকাশ্যে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে গোপন ব্যালটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি তার নিজ ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারেন বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করতে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের ভোটের প্রয়োজন হয়। জুলাই সনদে সেখানে সংসদের নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ—দুই কক্ষের দুই তৃতীয়াংশের ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে।
আগে সরকারের অনুমোদনে যে কোনো অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারতেন রাষ্ট্রপতি। জুলাই সনদে বলা হয়েছে— শুধু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবার সম্মতি দিলে অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।
বিদ্যমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী পদে কত মেয়াদে থাকতে পারবেন সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে—এক ব্যক্তি এক জীবনে ১০ বছরের বেশি অর্থাৎ দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। অন্যদিকে, বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী একাধিক পদে থাকতে পারেন। তবে জুলাই সনদে বাস্তবায়ন হলে একাধিক পদে থাকতে পারবেন না প্রধানমন্ত্রী।
সংসদ, নির্বাচন ও সরকারব্যবস্থা
বিদ্যমান সংবিধানে নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নেই। জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত করার পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান উপদেষ্টাসহ এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি দল, বিরোধীদল, দ্বিতীয় বিরোধীদলের মতামতের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হবে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশের সংসদ এক কক্ষবিশিষ্ট থাকলেও এবার জুলাই সনদে সেটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা হবে ১০০ জন। এক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারেই উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন করা হবে বলেও জুলাই সনদে বলা হয়েছে। জাতীয় সংসদে বর্তমানে নারীদের সংরক্ষিত আসন রয়েছে ৫০টি। সেটি ক্রমান্বয়ে ১০০তে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে জুলাই সনদে।
সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সরকারি দল থেকেই নির্বাচিত হয়ে থাকেন। গণভোটে সনদ কার্যকর হলে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন বিরোধী দল থেকে।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, সংসদে এমপিরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়। তবে, জুলাই সনদে বলা হয়েছে— বাজেট ও আস্থাবিল ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে। সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে এতদিন নির্বাচন কমিশনের একক কর্তৃত্ব থাকলেও গণভোটে জুলাই সনদ পাস হলে একক কর্তৃত্ব হারাবে ইসি। তখন ইসির সঙ্গে বিশেষজ্ঞ কমিটিও এই দায়িত্ব পালন করবে।
যে পরিবর্তন আসবে আইন ও বিচারব্যবস্থায়
বর্তমানে রাষ্ট্রপতি যে কাউকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে পারেন। তবে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে আপিল বিভাগ থেকে।
সংবিধানে থাকলেও এর আগে কখনো ন্যায়পাল নিয়োগ হয়নি। জুলাই সনদে বলা হয়েছে—স্পিকারের সভাপতিত্বে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রতিনিধি, রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি এবং আপিল বিভাগের বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত সাত সদস্যের কমিটির মাধ্যমে ন্যায়পাল নিয়োগ হবে। একইভাবে সরকারি কর্মকমিশন নিয়োগ, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগ, দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ বিরোধী দলের সমন্বয়ে আলাদা আলাদা কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে জুলাই সনদে।
আইন সংশোধনে সংস্কার হবে ৩৭টি
৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কারের বাইরে আর যে ৩৭টি সংস্কার প্রস্তাব আছে জুলাই সনদে সেগুলো সংশোধন করা যাবে আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে। এছাড়া জনপ্রশাসন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি স্বাধীন ও স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন, প্রজাতন্ত্রের কর্মে জনবল নিয়োগের জন্য সরকারি কর্ম কমিশন (সাধারণ), সরকারি কর্ম কমিশন (শিক্ষা) এবং সরকারি কর্ম কমিশন (স্বাস্থ্য) গঠন করার কথা বলা হয়েছে জুলাই সনদে।
অন্যদিকে, ভৌগোলিক অবস্থান ও যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি প্রশাসনিক বিভাগ গঠন করার কথাও বলা হয়েছে জুলাই সনদে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের প্রশ্নের এসবের কিছুই উল্লেখ থাকবে না। ছোট ছোট চারটি পয়েন্টের কথা উল্লেখ করে ভোটারদের কাছ থেকে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট গ্রহণ করা হবে।
ভাষা, জাতি ও মৌলিক সংস্কার
দেশের বিদ্যমান সংবিধানে বাংলা ছাড়া অন্য ভাষার স্বীকৃতি নেই। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে— প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। অন্যসব মাতৃভাষাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হবে। বাংলাদেশের নাগরিকরা এতদিন বাঙালি জাতি হিসেবে পরিচিত হলেও সংস্কারের পর পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে, প্রয়োজন নেই গণভোটেরও। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে—সংবিধান সংশোধনে সংসদের নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। অন্যদিকে সংবিধানের প্রস্তাবনা- ৮, ৪৮, ৫৬ এবং ১৪২ অনুচ্ছেদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পরিবর্তনে গণভোট লাগবে।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ বর্তমান সংবিধানের মূলনীতি। তবে গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে সংবিধানের মূলনীতি হবে– সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সম্প্রীতি। বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। জুলাই সনদে সেই অনুচ্ছেদ যুক্ত হবে—সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।
সংবিধানে বর্তমানে ২২টি মৌলিক অধিকার রয়েছে। তবে জুলাই সনদে যুক্ত করা হয়েছে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়টি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

