আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

নাশকতার আশঙ্কা

জ্বালানি জাহাজের বিশেষ নিরাপত্তার তাগিদ

সোহাগ কুমার বিশ্বাস, চট্টগ্রাম

জ্বালানি জাহাজের বিশেষ নিরাপত্তার তাগিদ
বিপিসির জেটিতে নোঙর করা একটি অয়েল ট্যাংকার থেকে জ্বালানি তেল খালাস হচ্ছে: ছবি: আমার দেশ

এলএনজি, এলপিজি, ডিজেল ও ক্রুডবাহী ১৫টি জাহাজ বিভিন্ন জেটি ও বহির্নোঙরে অবস্থান করছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে আরো চারটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় এসে পৌঁছবে। সব মিলিয়ে আগামী দেড় মাসের সব ধরনের জ্বালানি পাইপলাইনে রয়েছে। তাই দ্রুত সংকটের কোনো শঙ্কা নেই। তবে নাশকতার আশঙ্কা আছে। দেশি-বিদেশি নানান অপশক্তি সংকটের সুযোগে জ্বালানিবাহী জাহাজে নাশকতা চালাতে পারে- এমন শঙ্কা থেকে বহির্নোঙরে অবস্থান করা জাহাজগুলোর বিশেষ নিরাপত্তা চেয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডকে এসব জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। কারণ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর চারটি জ্বালানিবাহী জাহাজে পরপর রহস্যজনক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বর্তমানে সংকটের শঙ্কাকে আরো বাড়িয়ে দিতে এমন নাশকতার চেষ্টা হতে পারে বলে ধারণা বন্দরের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমানের চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় জ্বালানিবাহী ১৫টি জাহাজের অবস্থান রয়েছে। এর মধ্যে এলপিজিবাহী দুটি, এলএনজিবাহী পাঁচটি, গ্যাসবাহী দুটি, হাইপার সালফারবাহী দুটি, কেমিকেলবাহী একটি, ক্রুড অয়েলবাহী একটি এবং ডিজেলবাহী দুটি জাহাজ রয়েছে। সবশেষ গত সোমবার সিঙ্গাপুর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় পৌঁছেছে শিউ চি ও লিয়ান হুয়ান হু নামের দুটি ট্যাংকার। শিউ চি তে ২৭ হাজার ২০৪ টন ও লিয়ান হুয়ান হু জাহাজে ৩০ হাজার টন ডিজেল রয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার তিন হাজার ৪৮৪ টন ডিজেল নিয়ে এসপিটি থেমিস নামের একটি ট্যাংকার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ১৪ মার্চ র‍্যাফেলস সামুরাই ও চ্যাং হ্যাং হং টু নামের আরো দুটি ট্যাংকার ৬০ হাজার টন করে ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করবে।

বিজ্ঞাপন

৪০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল নিয়ে দুটি জাহাজ ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় অবস্থান করছে। এটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি। বিপিসির মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়।

আল জোর, আল জাসাসিয়া ও লুসাইল নামের তিনটি জাহাজ ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। জাহাজ তিনটিতে প্রায় দুই লাখ টন এলএনজি রয়েছে। আজ বুধবার ‘আল গালায়েল নামে আরো একটি এলএনজিবাহী জাহাজ বন্দরের জলসীমায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে এই চার জাহাজে আড়াই লাখ টনেরও বেশি এলএনজি রয়েছে।

এর বাইরে কাতারের রাস লাফান বন্দরে আরো ৬২ হাজার টন এলএনজি লোড করে অলস বসে আছে লিব্রেথা নামের একটি ট্যাংকার। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ঘিরে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করায় ট্যাংকারটি এখন পারস্য উপসাগরেই আটকা পড়েছে।

৪১ হাজার ৪৮৮ টন এলপিজি নিয়ে এলপিজি সেভেন ও জি ওয়াই এম এম নামের দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। এছাড়া গ্যাসবাহী দুটি, হাইপার সালফারবাহী দুটি, ক্রুডবাহী একটি ও তেল পরিশোধনে ব্যবহৃত কেমিক্যালবাহী একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় রয়েছে। সবমিলিয়ে আগামী প্রায় দেড় মাসের সব ধরনের জ্বালানির মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন- বিপিসি।

বিপিসির মার্কেটিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিএম পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, অন্যান্য সময়ে সাধারণত এক মাসের জ্বালানি মজুত থাকে। বর্তমানে আসন্ন সংকটে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করেছে সরকার। তাই সাপ্লাইয়ারদের তাগিদ নিয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি আনা হয়েছে। এছাড়া একাধিক সোর্সের সঙ্গে আলোচনা করে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ও এলপিজি কেনার প্রস্তুতিও আছে সরকারের। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সংকটের শঙ্কা থাকলেও তা মোকাবিলা করার যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে সরকার ও বিপিসির। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেশি ছড়িয়ে পড়ায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বাজারে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তাকে সক্রিয় রাখা হয়েছে। জ্বালানিবাহী কোনো জাহাজ এলেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অ্যাসেসমেন্ট, ডকুমেন্টেশনের কাজ শেষ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে বার্থিং দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। চলতি মাসের শুরু থেকে এভাবেই চলছে। বিপিসি ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পদ্মা, মেঘনা, যমুনার জেটি, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে দ্রুত সময়ের মধ্যে জাহাজ ভিড়তে সব ধরনের সহযোগিতা করছে কাস্টমস।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, জ্বালানিবাহী কয়েকটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে রয়েছে। এসব জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন। কারণ ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতে কয়েকদিনের মধ্যে চারটি জ্বালানিবাহী ট্যাংকারে দুর্ঘটনা ঘটেছে। তখন জ্বালানি সরবরাহে কোনো সংকট ছিল না। এখন সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি খাত। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। তাই এ সেক্টরকে কেন্দ্র করে আরো বড় ধরনের অস্থিরতা ও আতঙ্ক ছড়ানোর শঙ্কা থেকে নাশকতার আশঙ্কা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। আর এ কারণেই জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা দিতে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র ও সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বন্দরে সমন্বয়সভা হয়েছে। এ সভায় নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডসহ সংশ্লিষ্ট সব স্টেক হোল্ডারের (অংশীজন) প্রতিনিধিরা ছিলেন। সবার সামনেই বন্দর চেয়ারম্যান জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডকে তাগিদ দিয়েছেন। তবে নাশকতার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেই বন্দর কর্তৃপক্ষ এই বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানান তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...