ঢাকার পর চট্টগ্রামেও পোশাক খাতে অস্থিরতার শঙ্কা

ঢাকার পর চট্টগ্রামেও পোশাক খাতে অস্থিরতার শঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত

বেতন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে ঢাকা, আশুলিয়া, গাজীপুরসহ দেশের কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন করছেন পোশাকশ্রমিকেরা, যার রেশ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও। ইতোমধ্যে ছয়টি কারখানাকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে নজরদারি বাড়িয়েছে শিল্প পুলিশ। কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কেউ যাতে উসকানি বা বিশৃঙ্খলা ছড়াতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে আছে গোয়েন্দারাও। তবে বিজিএমইএ বলছে, চট্টগ্রামে বড় ধরনের কোনো অস্থিরতার শঙ্কা নেই। এ অবস্থায় বিষয়টিকে হালকাভাবে না দেখে বরং প্রশাসনের মধ্যস্থতায় মালিক-শ্রমিক সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

চার দিন ধরে রাজধানী ঢাকায় বেতন বৃদ্ধিসহ নানা অজুহাতে আন্দোলন শুরু করেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। গাজীপুর, আশুলিয়াসহ গার্মেন্টসশিল্প এলাকায় অস্থিরতা দিনে দিনে বাড়ছে। তবে দেশের অন্যতম পোশাক শিল্পাঞ্চল চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো শ্রমিক আন্দোলন দৃশ্যমান হয়নি। নগরী ও আশপাশের এলাকায় থাকা প্রায় ৩৪০টি পোশাক কারখানার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু রাজধানীর ঢেউ চট্টগ্রামেও আছড়ে পড়ার শঙ্কায় আছেন পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা। কারণ, এখানকার বেশ কিছু কারখানায়ও ঘটেছে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা। গত ১০ মাসে ২৯টি বড় কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানার শ্রমিকদের অধিকাংশই এখনো বেকার অবস্থায় আছে। এর বাইরে নগরীর মোহরা, পাহাড়তলী, ডবলমুরিংয়ে অবস্থিত নতুন করে আরো ছয়টি কারখানা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ। এসব কারখানায় চার হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করেন।

বিজ্ঞাপন

এই খাতের উদ্যোক্তারা জানান, অতীতে চট্টগ্রামে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি কারখানার শ্রমিকেরা আন্দোলন শুরু করলে অন্য কারখানার শ্রমিকেরাও তাতে যোগ দেন। একপর্যায়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতায় রূপ নেয় এবং দ্রুত অন্যান্য কারখানায়ও ছড়িয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে পুরো শিল্প খাতই এখন অস্থিরতা ও ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরে তিন মাসের বকেয়া বেতনসহ বিভিন্ন আর্থিক পাওনা পরিশোধের দাবিতে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন মডেল সিজন লিমিটেডের শ্রমিকেরা। তাদের অভিযোগ, কারখানাটির প্রায় ১ হাজার শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা টানা তিন মাস ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। এছাড়া ছুটির টাকা, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির অর্থও বকেয়া রয়েছে। এসব পাওনা আদায়ে একাধিকবার কর্তৃপক্ষের কাছে গেলেও কোনো সমাধান পাননি বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

গত মে মাসের শুরুতে নগরের চান্দগাঁওয়ের সিঅ্যান্ডবি মোড় এলাকায় বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন আজিম গ্রুপের কয়েকটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকেরা। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আর্থিক পাওনা পরিশোধ করছে না কর্তৃপক্ষ। ২০২০ সাল থেকে টিফিন ভাতা এবং ২০২২ ও ২০২৫ সালের ওভারটাইমের টাকা বকেয়া রয়েছে। এছাড়া নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রামে শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে ১৩২টি বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এর মধ্যে ৯৬টিই পোশাক কারখানাকেন্দ্রিক। শ্রমিকদের অভিযোগে, বেতন-ভাতা পরিশোধ না করা, শ্রমিক ছাঁটাই, সার্ভিস চার্জ এবং ছাঁটাই করা শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ না করায় আন্দোলনে নামেন তারা।

এদিকে চলতি অর্থবছরে চট্টগ্রামে ছোট-বড় ৫৯টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে পোশাক কারখানা ২৯টি। মার্চে নগরের অলংকার মোড়ের একটি কারখানায় ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন না পাওয়ার অভিযোগে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। ঈদের আগে অর্ধেক বেতন দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন তারা। এ সময় অন্তত ১০ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। গত ১৯ আগস্ট আতুরার ডিপোর একটি জিন্স কারখানার শ্রমিকেরাও বকেয়া বেতনসহ বিভিন্ন দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন।

জেলা শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, বর্তমানে এ জেলার ছয়টি পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের ঝুঁকি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪,০০০ শ্রমিকের নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—মোডিস্ট বাংলাদেশ লিমিটেড, মোডিস্ট সিইপিজেড লিমিটেড, কমফোর্ট গার্মেন্টস লিমিটেড, ওয়েল কোম্পানি লিমিটেড, ওয়েল ফেব্রিক্স লিমিটেড এবং বিএনও লুব্রিকেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেড। এর মধ্যে ওয়েল কোম্পানি ও ওয়েল ফেব্রিক্স একই মালিকানাধীন দুটি কারখানা। প্রতিষ্ঠান দুটিতে একসময় প্রায় ৮০০ শ্রমিক কাজ করতেন। বেতন অনিয়মিত হওয়ায় তাদের অনেকেই চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন।

চাকরি ছেড়ে দেওয়া শাফায়েত হোসেন নামের শ্রমিক জানান, প্রায় সব সময় দুই মাসের বেতন বকেয়া থাকত। বেতনের কথা বললে কাজ নেইসহ নানা অজুহাত দেওয়া হতো। এ কারণে চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। আরেক শ্রমিক জোবায়ের মোহাম্মদ জানান, বেতন আটকে রাখার পাশাপাশি নিয়মিত বেতন বাড়ানো হতো না। অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক পেতেও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।

তবে শ্রমিকদের অভিযোগের বিষয়ে ওয়েল কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক তপন কুমার বিশ্বাস জানান, শ্রমিকদের বেতন নিয়মিত পরিশোধের চেষ্টা করি। অনেক সময় কার্যাদেশ কমে যাওয়ায় তা সম্ভব হয় না। চলতি মাসের মধ্যে সব শ্রমিকের বকেয়া পরিশোধ করা হবে।

জেলা শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম জানান, ঢাকার অসন্তোষ যাতে চট্টগ্রামে ছড়িয়ে না পড়ে সে ব্যাপারে সক্রিয় আছেন তারা। ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক ও শ্রমিক পক্ষের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ বকেয়া বেতন পরিশোধের কাজ শুরু করেছে। এই ঘটনাকে পুঁজি করে কোনো সুবিধাবাদী পক্ষ যাতে শ্রমিকদের প্ররোচিত করতে না পারে সে ব্যাপারেও শিল্প পুলিশ সচেতন আছেন।

মোডিস্টের একটি কারখনার শ্রমিকদের বেতন বকেয়ার বিষয়ে বেপজার চট্টগ্রাম অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক শরীফুল আলম জানান, এই কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিষদ পরিবর্তনসহ নানা কারণে সমস্যায় আছে প্রতিষ্ঠানটি। শ্রমিকদের যে বেতন বকেয়া ছিল সেটা সমাধানের চেষ্টা চলছে।

বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে চট্টগ্রামে সচল পোশাক কারখানার সংখ্যা ছিল ৬১০। ২০২৬ সালের অক্টোবরে তা কমে দাঁড়ায় ৩৩৬। জাতীয় পোশাক রপ্তানিতে একসময় চট্টগ্রামের অংশ ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ, বর্তমানে তা কমে ৯ শতাংশে নেমেছে। সংগঠনটির পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী জানান, এখন পর্যন্ত এখানে বড় ধরনের কোনো অসন্তোষ তৈরির শঙ্কা না থাকলেও বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন