আওয়ামী লীগের প্রায় দেড় যুগের শাসনকালে সংঘটিত গুমকাণ্ডে জড়িত বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা পালিয়ে গেছেন। কিন্তু তারা কীভাবে পালালেন—সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট কোনো জবাব মেলেনি।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকর্তাদের নজরদারি, তাদের পালানোর পথ বন্ধ করা কিংবা প্রতিটি ঘটনার পর ব্যর্থতা পর্যালোচনার দায়িত্বই কোনো একক ইউনিট নেয়নি। এটি তখনই সম্ভব, যখন এসব পলায়নকে অগ্রাধিকারভিত্তিক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ইস্যু হিসেবে বিবেচনার কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা কার্যকর ছিল না। এই বাস্তবতার কারণেই গুমে জড়িত একাধিক উচ্চপদস্থ সন্দেহভাজন কর্মকর্তা পালাতে সক্ষম হয়েছেন। তারা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ছিলেন এবং আনুষ্ঠানিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিলেন; তবু তাদের পলায়ন ঠেকানো যায়নি।
গত ৪ জানুয়ারি ‘জোরপূর্বক গুম সম্পর্কিত তদন্ত কমিশন’ প্রধান উপদেষ্টার কাছে যে প্রতিবেদন জমা দেয়, সেখানেই এই চিত্রটি স্পষ্টভাবে ওঠে আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এর ফলে যে পরিস্থিতি সামনে এসেছে, তা একটি বিস্তৃত গোয়েন্দা ও বাস্তবায়নগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। এই ব্যর্থতা ডিজিএফআই, এমআই, এএসইউ, এনএসআইসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত। কমিশনের মতে, বিষয়টি শুধু একটি পদ্ধতিগত ত্রুটি নয়; বরং এটি একটি চলমান জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ, যা ভবিষ্যতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং তা কার্যকর করার বিশ্বাসযোগ্যতা ও সম্ভাবনার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরবরাহ করা উপকরণ ও অভিযোগকারীদের নিজস্ব তদন্তের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) জোরপূর্বক গুমে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় ১১ জন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করে।
এই কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন জ্যেষ্ঠ ডিজিএফআই অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল সাইফুল আবেদীন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী, মেজর জেনারেল হামিদুল হক ও মেজর জেনারেল তৌহিদ-উল-ইসলাম। যখন ব্রিগেডিয়ার আজমি, রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান এবং আরো কয়েকজন জেআইসি, মূল আয়নাঘর এবং ডিজিএফআইয়ের অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণে ছিলেন, এই কর্মকর্তারা সেই সময় কমান্ডের পদে ছিলেন। কমান্ড কাঠামোর পুনঃপর্যালোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, জেআইসিতে সংঘটিত জোরপূর্বক গুম এসব জেনারেলের প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও সম্মতি ছাড়া সম্ভব ছিল না। সেনাবাহিনীর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কোর্ট অব ইনকোয়ারির ফলাফলও এই দাবিকে সমর্থন করে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ওয়ারেন্ট জারির সময় এসব কর্মকর্তার মধ্যে অন্তত তিনজন তখনো এলপিআরে ছিলেন। পলায়নের ঝুঁকি বিবেচনায় কমিশন ২০২৪ সালের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পাসপোর্ট বাতিলের আবেদন করে, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গ্রহণ করে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল আকবর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কমিশনের সামনে দুবার হাজির হয়ে আটকে পড়া ও চলাচল সীমিত হওয়ার কারণে হতাশা প্রকাশ করেন। নাম উল্লেখিত কয়েকজন কর্মকর্তা ওয়ারেন্ট জারির ঠিক আগে ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন; তবু কোনো ওয়ারেন্ট কার্যকর করা হয়নি। পরে ২০২৫ সালের মে মাসে কমিশন তাদের মধ্যে কয়েকজনকে তলব করলে সেনাবাহিনী সদর দপ্তর জানায়, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না এবং তাদের বর্তমান অবস্থান অজানা।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, যে প্যাটার্নটি দেখা যায় তা অত্যন্ত চমকপ্রদ। যেসব কর্মকর্তা ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে কঠোর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ছিলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যান। পাসপোর্ট বাতিল ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তারা পালাতে সক্ষম হয়েছেন। অর্থাৎ, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার একেবারে কাছাকাছি অবস্থান করেও তারা পালাতে পেরেছেন।
কমিশন বলছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তদন্তাধীন জেনারেলদের পলায়নে তিনটি স্বতন্ত্র ঢেউ দেখা গেছে। প্রথম ঢেউ ২০২৪ সালের আগস্টে, যখন মেজর জেনারেল মজিবুর রহমান দেশ ছাড়েন। তিনি সেনাবাহিনীর দুর্নীতি তদন্তের মুখে ছিলেন এবং র্যাবের এডিজি (অপস) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে (২০১১-১৩) জোরপূর্বক গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। দ্বিতীয় ঢেউ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, ওয়ারেন্ট জারির পর একাধিক জেনারেলের পলায়নের মাধ্যমে। তৃতীয় ঢেউটি ঘটে ২০২৫ সালের অক্টোবরে, যখন মেজর জেনারেল কবির আহমেদ পালিয়ে যান এবং দ্বিতীয় দফার ওয়ারেন্ট জারি হয়েছিল।
কমিশন আরো জানায়, মেজর জেনারেল কবির আহমেদের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে প্রত্যাশিত ছিল। তার পলায়নের এক সপ্তাহ আগে কমিশন তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। তাকে কমান্ড থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি পোস্টিংয়ে পাঠানো হয়েছিল এবং ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে তিনি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিলেন। তারপরও ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর ওয়ারেন্ট জারির পর, অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল জানান, তিনি ৯ অক্টোবর তার বাসভবন ছেড়ে যান এবং আর ফিরে আসেননি।
কমিশনের কাছে বিশেষ উদ্বেগজনক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে যে, এই কর্মকর্তাদের অনেকেই সম্ভবত ভারত সীমান্ত অতিক্রম করেছেন। এতে আন্তঃসীমান্ত হস্তান্তরে ভারতের সম্ভাব্য জড়িত থাকার এবং জোরপূর্বক গুমে সহযোগিতার প্রমাণ সামনে আসে। পাশাপাশি, ১৫ বছর ধরে হাসিনা শাসনামলে রাজনৈতিক সমন্বয় যেভাবে ইমপিউনিটি নিশ্চিত করেছিল, তারও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পূর্ববর্তী অপারেশনে জড়িত বিচারব্যবস্থার মূল সন্দেহভাজনদের এ ধরনের স্থানান্তর একটি চলমান নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
কমিশন খুঁজে দেখেছে, এত বড় ব্যর্থতা বারবার কীভাবে ঘটতে পারে। মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স, যার নেতৃত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল সেলিম আজাদ এবং আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট, যার নেতৃত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল শামস মোহাম্মদ মামুন-এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় পরিষ্কার হয়েছে, প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের পলায়নের পরও তৃতীয় ঢেউ ঠেকাতে কোনো কার্যকর প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব আলোচনায় একটি স্পষ্ট রক্ষণাত্মক মনোভাব লক্ষ করা গেছে। পাশাপাশি জোর দিয়ে বলা হয়েছে, যেসব জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্পষ্টভাবে পলায়নের ঝুঁকি তৈরি করেছিলেন, তাদের ওপর নজরদারি রাখা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ম্যান্ডেটের বাইরে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


নির্বাচন ও হ্যাঁ ভোটের প্রচারে পরিচালনা কমিটি পুনর্গঠন এনসিপির
নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করলে রুখে দেওয়া হবে: আদিলুর রহমান