দলীয়করণে পেশাদারিত্ব হারাচ্ছেন শিক্ষকরা

দলীয়করণে পেশাদারিত্ব হারাচ্ছেন শিক্ষকরা
ছবি: এ আই

দলীয়করণের নগ্ন সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারছে না দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। উপাচার্য ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদসহ নতুন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়া অনেকটা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পতিত আওয়ামী সরকারের সময় দলীয়করণের রেকর্ড সৃষ্টির ধারাবাহিকতা যেন বর্তমান সরকারের সময় এসেও বজায় রাখা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ইতোমধ্যে নতুন উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। একই ভাবে নিয়োগ চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য পদগুলোয়ও। সবক্ষেত্রে দলীয়করণে শিক্ষকদের অনেকেই পেশাদারিত্ব হারাচ্ছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় উপাচার্য পরিবর্তন নিয়ে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনকে নিয়োগ বিতর্কের সবশেষ নজির হিসেবে দেখছেন অনেকে ।

মূল্যায়নব্যবস্থা চালু না থাকায় দুর্নীতি বা রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত মানহীন শিক্ষকরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা আদায়ে মেধাবী শিক্ষকদের চেয়ে দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে সক্রিয়রাই যোগ্যতার মাপকাঠিতে এগিয়ে থাকছেন। প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের অবস্থা বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষক মূল্যায়নের দাবি জোরদার হচ্ছে।

এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি ডাকসুসহ কয়েকটি ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট চালুর উদ্যোগ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে বিতর্ক এবং এটাকে এখতিয়ারবহির্ভূত আখ্যায়িত করা হলেও বিষয়টির প্রয়োজনীয়তার কারণে বেশ চাপে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালগুলোর নিজস্ব উদ্যোগেই মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু এবং মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন শিক্ষাবিদরা। একই ধরনের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও (ইউজিসি)।

শিক্ষকদের দলীয়করণের প্রভাবমুক্ত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজ বলেন, স্বাধীন চিন্তাভাবনা থেকে শিক্ষকদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা আসতে পারে। তবে সেটার প্রভাব যেন কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের ওপর না আসে। এজন্য প্রথমেই মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে অন্য সমস্যাগুলো অটোমেটিক ঠিক হয়ে যাবে।

শিক্ষক মূল্যায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মান নিশ্চিত বা মূল্যায়নের ব্যবস্থা আছে। আমাদের দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও নিজেদের মতো করে মূল্যায়ন করা হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও এ উদ্যোগ নিলে ভালো হয়। তবে এটি শিক্ষকদের টার্গেট করে নয়; বরং এর উদ্দেশ্য হবে বেটার এডুকেশন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগেই এই মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সিস্টেম চালু করতে হবে। এটার অনেক ভালো দিক আছে। এ বিষয়ে ছাত্র সংসদ জোরালো অনুরোধ করতে পারে। কিন্তু তাদের মাধ্যমে এই মূল্যায়ন হলে পক্ষপাতিত্ব ও শিক্ষকদের জন্য অমর্যাদাকর হতে পারে। তাই ছাত্র সংসদ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষকদের মান-মর্যাদা বজায় রেখে এটা হলে ভালো হয়। তাছাড়া ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসিদের নিয়ে বৈঠক করে এ ধরনের মূল্যায়নের জন্য অনুরোধ করতে পারে বা একটি সমন্বিত দিকনির্দেশনাও দিতে পারে।

সূত্রমতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক সমিতির বাইরেও জাতীয় রাজনৈতিক আদর্শের লেজুড়বৃত্তিক নানা সংগঠন রয়েছে। বেশিরভাগ শিক্ষক কোনো না কোনো সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে তাৎক্ষণিক সুযোগ-সুবিধা পেতে ক্ষমতাসীন দলের অনুসারী শিক্ষকদের প্রভাব ও তৎপরতা একটু বেশিই থাকে। পতিত আওয়ামী সরকারের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক রাজনীতি নতুন মাত্রা পায়। ওই সময়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই সব শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে সর্বত্র পদায়ন-পদোন্নতিতে নগ্ন দলীয়করণ, দুর্নীতি এবং মেধাবী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের বঞ্চিত করার রেকর্ড সৃষ্টি হয়।

চব্বিশের বিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সে চিত্র অনেকটা পাল্টে যায়। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার একের পর এক দলীয়করণের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়াদপূর্তির আগেই উপাচার্য ও উপউপাচার্য সরিয়ে নতুন নিয়োগে দলীয় বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে চাপা অসন্তোষ ও অস্থিরতাও দেখা দিয়েছে।

সবশেষ ৫৬ দিন আগে নিয়োগ পাওয়া চুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর বিরুদ্ধে ক্যাম্পাস শাটডাউনসহ কঠোর আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে ঢুকতে না পেরে গত বৃহস্পতিবার অনলাইনে যোগদান করেন। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।

জানা গেছে, পতিত আওয়ামী সরকারের সময়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ ওঠায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা তদন্তের উদ্যোগ নেয় ঢাবিসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে সেগুলো আজও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাছাড়া দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক মূল্যায়ন কার্যক্রম চালু থাকলেও ভিন্নচিত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়। এ কারণে নির্বাচিত ছাত্র সংসদগুলো তাদের ইশতেহার অনুযায়ী বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে মূল্যায়ন ওয়েবসাইট চালু করা হলে তা নিয়ে চরম বিব্রত ও বিপাকে পড়ে কর্তৃপক্ষ। জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদও (জাকসু) একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত পরিসরে মূল্যায়ন চালু থাকায় তা পুরোপুরি কার্যকরের দাবি জানাচ্ছে রাকসু। বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করতে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সূত্রমতে, চব্বিশের বিপ্লবে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার অন্যতম প্রত্যাশা ছিল কোটা ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে মেধার মূল্যায়ন। সে প্রত্যাশার আলোকে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে মেধার মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ইশতেহারের মুখবন্ধে বলা হয়েছে, সুদীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে হাজারো শহীদের রক্ত, জুলাইযোদ্ধাদের অসীম আত্মত্যাগ এবং শহীদ মায়েদের প্রত্যাশা আমাদের সামনে অনিবার্য দায়িত্ব তুলে দিয়েছেÑএকটি বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যার লক্ষ্য মানবিক, জনগণকেন্দ্রিক ও ইনসাফভিত্তিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। ইশতেহারের ‘নির্বাচনি অঙ্গীকার : প্রধান প্রতিশ্রুতি’ অংশে বলা হয়েছে, মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।

এছাড়া দলটির ঘোষিত ৩১ দফার নবম দফায় ‘স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে সকল রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন’ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের সব সাংবিধানিক, আইনগত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের প্রভাবমুক্ত করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদগুলোয় নিয়োগের আগে সংসদীয় কমিটির শুনানি ও ভেটিং প্রক্রিয়া চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হয়। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে ইশতেহারের সে প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তবে সেটির তেমন কোনো বাস্তবায়ন নেই বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে ইউজিসি মনে করছে।

দলীয়করণের প্রভাব সম্পর্কে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপউপাচার্য ও ঢাবির অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, বিগত আওয়ামী সরকারের সময়ে শিক্ষক নিয়োগে অনেক অনিয়ম হয়েছে। দলীয় শিক্ষকদের অনেকে ঠিকমতো ক্লাস নেন না, পরীক্ষার ডিউটিতেও থাকতে চান না। তারা বাইরে বিভিন্ন জায়গায় অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত থাকেন। পেশাদারিত্ব ঠিকমতো দেখান না। মূল্যায়ন সিস্টেম চালু হলে অনেক ভালো হবে।

তবে ডাকসুর শিক্ষক মূল্যায়নের উদ্যোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি একটি এলোমেলো কাজ হচ্ছে। ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে একটি সিস্টেমে এই মূল্যায়ন করলে ভালো হবে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সব জায়গায় মূল্যায়ন চালু আছে বলেও জানান তিনি।

ডাকসুর ওয়েবসাইট নিয়ে তোলপাড়

ইশতেহারে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বর্তমান ডাকসু। সে অনুযায়ী মেয়াদের শেষপর্যায়ে এসে গত ১০ সেপ্টেম্বর শিক্ষকদের পাঠদানের মান, পেশাদারিত্ব ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাডেমিক আচরণ মূল্যায়নে ‘ডিইউ ইভ্যালুয়েশন’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করে সংগঠনটি। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া বলেন, ডাকসু নির্বাচনের ইশতেহারে শিক্ষক মূল্যায়নব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি ছিল। ওই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের পরও কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ায় ডাকসুর উদ্যোগে ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়েছে।

একই ধরনের মন্তব্য করে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যর্থ হওয়ায় আমরা ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি শুরু করেছি।

ওয়েবসাইটটি শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেললেও এতে বিব্রত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এই ওয়েবসাইট চালুর এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর ঘোষণা দিলে পাঁচ দিনের মাথায় ডাকসুর ওয়েবসাইটটি ডাউন করে দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে প্রায় ১৪ হাজার শিক্ষার্থী তাতে রিভিউ দেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবি উপউপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের দিয়েই নতুন এই মূল্যায়ন পদ্ধতি বাস্তবায়ন শুরু করা হবে।

তিনি বলেন, আমাদের যত ধাপ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল, সেগুলো ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছর ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে যারা প্রথম বর্ষে ভর্তি হবে, তাদের থেকেই আমরা এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন শুরু করব। সর্বশেষ এটি একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদিত হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি বাস্তবায়নের বিষয়ে ইউজিসি থেকে কোনো আগ্রহ বা নির্দেশনা রয়েছে কি নাÑজানতে চাইলে অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, ইউজিসির এ বিষয়ে আলাদা অবস্থান থাকতে পারে। তবে ঢাবির নিজস্ব নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব ধাপ অনুসরণ করা হয়েছে।

এদিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পেশাদারিত্ব হারাচ্ছেন কি না এবং এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো উদ্বেগ রয়েছে কি নাÑ জানতে চাইলে অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, এটা ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপট। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পেশাদারিত্ব হারাচ্ছেন কি না- বিশেষ করে যে পরিমাণ গবেষণা করা প্রয়োজন ছিল, সেটি রাজনৈতিক নিয়োগের কারণে কমে গেছে কি না- এমন কোনো নির্দিষ্ট তথ্য আমার কাছে নেই। তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে নিয়োগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পেশাদারিত্ব হারাচ্ছেন, এমন কোনো নির্দিষ্ট তথ্য আমার কাছে নেই। তাই নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না।

ঢাবিতে ১৫ বছরের নিয়োগ পর্যালোচনা হবে

২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুনের মধ্যে ঢাবিতে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সব নিয়োগ পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ২৮ জুলাই এমন সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেট। উপাচার্যের সভাপতিত্বে সিন্ডিকেট সভায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগগুলো পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সুপারিশের জন্য চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।

ওই তদন্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে উপউপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, ইতোমধ্যে আমাদের প্রথম সভা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। বর্তমানে কমিটি তদন্তের তথ্য সংগ্রহের পর্যায়ে রয়েছে। এখন প্রত্যেক ডিনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অনুষদের শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হচ্ছে। তথ্যগুলো যখন আমাদের কাছে পূর্ণাঙ্গভাবে এসে পৌঁছাবে, তখন আমরা পরবর্তী ধাপে যাব।

জাবিতে মূল্যায়ন ওয়েবসাইট নিয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় কর্তৃপক্ষ

শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ওয়েবসাইট তৈরি করে উপাচার্যের হতে তুলে দিয়েছে জাকসু। গত ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানের কাছে ওয়েবসাইটটি হস্তান্তর করা হয়।

এ বিষয়ে সদ্য সাবেক জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর দাবি জানিয়ে আসছিলাম। সর্বশেষ একাডেমিক কাউন্সিলে বিষয়টি গৃহীত হলেও এটি কমিটির মধ্যে রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে আমরা ওয়েবসাইটটি তৈরি করেছি। তিনি বলেন, আমরা দেখিয়ে দিতে চাই, শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চাইলেই সম্ভব। সদিচ্ছা থাকলেই সেটি চালু করা সম্ভব এবং একটি জবাবদিহিমূলক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইটের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান বলেন, জাকসুর শিক্ষক মূল্যায়নের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গত একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় আলোচনা হয়। গত ১৩ সেপ্টেম্বর সিন্ডিকেট সভায় এ লক্ষ্যে কমিটি গঠন করা হয়। গঠিত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে। সুতরাং, জাকসুর প্রস্তুত করা শিক্ষক মূল্যায়নের ওয়েবসাইট সিন্ডিকেটে গঠিত কমিটির রিপোর্ট চূড়ান্ত হওয়ার আগে উপাচার্যের গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে নেওয়া হবে।

সীমিত আকারে মূল্যায়ন চালু রাবিতে

রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষক মূল্যায়ন চালুর বিষয়টি ছিল। রাকসু নির্বাচনের পর কর্তৃপক্ষ মূল্যায়ন কার্যক্রম চালু করলেও তা সীমিত আকারে হচ্ছে। পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ বিষয়ে আমরা কর্তৃপক্ষকে বলে আসছি।

শিক্ষকদের দলীয় প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, বিগত সময়ে মেধার পরিবর্তে দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ বেশি হয়েছে। এতে শিক্ষার মানের পাশাপাশি ও শিক্ষার্থীদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পরীক্ষায় মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কা থাকায় আমাদের দাবি অনুযায়ী সম্প্রতি খাতায় কোডিং সিস্টেম চালু হয়েছে। আমরা চাই মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ হোক।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) জিএস আব্দুল আলিম আরিফ জানান, শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি এবং অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছি। তবে জবির কাঠামো ও বাস্তবতা অন্য অনেক ক্যাম্পাস থেকে ভিন্ন হওয়ায় বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে কিছুটা সময় প্রয়োজন হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুতই কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নিয়ে এগিয়ে যেতে পারব।

এদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গত মার্চে চালু হওয়া ‘আউটকাম বেজড এডুকেশন’ সংশ্লিষ্ট কারিকুলামের আওতায় শিক্ষক মূল্যায়নের কিছুটা অপশন আছে। তবে আরো ব্যাপকভাবে এই মূল্যায়ন কার্যক্রম চালুর জন্য চকসুর পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে। শিক্ষার্থীরাও এই মূল্যায়ন চান বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে চকসু ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি বলেন, চবিতে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি নেই। আমরা এটি চালুর বিষয়ে কাজ করছি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির এক শিক্ষার্থী জানান, এখানে আওয়ামী আমলে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষক ঠিকমতো পড়াতে পারেন না। তাদের বিষয়ে শিক্ষার্থীরা খুবই অসন্তুষ্ট। মূল্যায়ন সিস্টেম থাকলে বিষয়টি তারা তুলে ধরতে পারবেন। এছাড়া অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও মানসম্মত শিক্ষা ও শিক্ষক নিশ্চিতে শিক্ষকদের মূল্যায়ন কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইউজিসি চেয়ারম্যানের বক্তব্য

শিক্ষকদের রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, শিক্ষকতা ও রাজনীতিতে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। তবে অপরাজনীতির সঙ্গে শিক্ষকতার দ্বন্দ্ব আছে। রাজনীতির অপপ্রয়োগ ও অপচর্চার সঙ্গে দ্বন্দ্ব আছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সিস্টেমে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যা আছে, তাতে সুষ্ঠুভাবে মেধাবীদের নিয়োগের সুযোগ আছে। ইউজিসি মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে চায়। পাশাপাশি দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে চায়Ñনৈতিক মূল্যবোধ আছে কি না এবং পেশার প্রতি কমিটমেন্ট আছে কি না। এসব বিষয়ে সঙ্গতিপূর্ণ না হলে আমরা তা প্রতিরোধ করার কাজ করতে প্রস্তুত।

শিক্ষক মূল্যায়ন প্রসঙ্গে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স সিস্টেমের একটি অংশ হলো শিক্ষক মূল্যায়ন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্ব স্ব উদ্যোগে এটি বাস্তবায়ন করবে। তবে তারা কীভাবে, কখন তা বাস্তবায়ন করবে, এটা তাদের বিষয়।

তিনি বলেন, কোয়ালিটি নিশ্চিত হচ্ছে কি না, এটি যাতে বাস্তবায়ন হয়, সেজন্য আমরা কাজ করছি। কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স সেল গঠন করছি, এটি বাস্তবায়নের বিষয়ে জোর দিচ্ছি। যারা এটি বাস্তবায়নে পেছাবে, তারা অ্যাস্যুরেন্সেও পিছিয়ে পড়বে।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার, জাবি ও চবি প্রতিনিধি]

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন