ইউরিয়া সারের বাজার দখলের চেষ্টায় আওয়ামী সিন্ডিকেট

ইউরিয়া সারের বাজার দখলের চেষ্টায় আওয়ামী সিন্ডিকেট

দেশের ইউরিয়া সারের বাজার দখলে তৎপর হয়ে উঠেছে আওয়ামীসংশ্লিষ্ট একটি সিন্ডিকেট। এ চক্রের মূল হোতা পতিত আওয়ামী সরকার আমলের প্রভাবশালী রাশিয়াপ্রবাসী ব্যবসায়ী মিঞা সাত্তার। বর্তমানে রাশিয়া থেকে সার আমদানির তোড়জোড় শুরু করেছে এই গোষ্ঠী। আমদানি, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণে প্রভাব বিস্তার করে কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাই তাদের উদ্দেশ্য । এতে কৃষকপর্যায়ে সার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দেশে বার্ষিক ২৬-২৭ লাখ টন ইউরিয়ার চাহিদার বিপরীতে গত ২৩ জুলাই পর্যন্ত মজুত ছিল ৬.২ লাখ টন। সারের এ বিশাল চাহিদা ও বাজারকে লক্ষ্য করেই নতুন করে সক্রিয় হয়েছে এ আওয়ামী সিন্ডিকেট।

বিজ্ঞাপন

গত ২৮ জুলাই সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের কার্যালয়ে বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ভিয়াচেস্লাভ সেন্ত্যুরিন। এ সময় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মিঞা সাত্তারের ছোট ভাই ও ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুজ্জামান সোহেল। বৈঠকে দেশি চাহিদা মেটাতে অন্যান্য সরবরাহকারী দেশের তুলনায় প্রতি টনে ১০ ডলার কম দামে বাংলাদেশকে ইউরিয়া সরবরাহ করার প্রস্তাব দেন রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত।

দুদেশের সরকারি বৈঠকে মিঞা সাত্তার ভাইয়ের উপস্থিতি এবং এ প্রস্তাব সারের বাজার দখলে মরিয়া চেষ্টারই ইঙ্গিত দেয় বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। অন্য একটি ছবিতে মস্কোতে ঢাকার রাষ্ট্রদূত নজরুল ইসলামকে মিঞা সাত্তারের সঙ্গে দেখা গেছে।

রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে নিজের উপস্থিতি, সার আমদানিতে প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) প্রক্রিয়ার ভেতরেও তার অংশগ্রহণ সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে আমিরুজ্জামান সোহেল আমার দেশকে বলেন, এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশে রাশিয়ান দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রামে রাশিয়ার অনারারি কনসাল জেনারেল স্থপতি আশিক ইমরান আমার দেশকে বলেন, আমিরুজ্জামান সোহেলের কথা তিনি শুনলেও তার সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। তার (আমিরুজ্জামান সোহেল) ভাই মিঞা সাত্তারের প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়া সরকারের অনুমোদিত সংস্থা হিসেবে সরাসরি রাশিয়ান দূতাবাসের সঙ্গে জিটুজি-সংক্রান্ত কাজের লিয়াজোঁ রক্ষা করে। এটি মূলত একটি বাণিজ্যিক বিষয় এবং তার মূল কর্মক্ষেত্র চট্টগ্রাম হওয়ায় এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা নেই।

রাশিয়ান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রুশ প্রতিষ্ঠান ‘জেএসসি এফইসি প্রোদিনতর্গ’ বিসিআইসির মাধ্যমে বাংলাদেশকে দুই লাখ ৮০ হাজার টন ইউরিয়া সার (প্রিল্ড ইউরিয়া) সরবরাহ করতে চায়।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বিসিআইসি সচরাচর ‘গ্রানুলার ইউরিয়া এন-৪৬’ আমদানি করলেও এবার রাশিয়ার কোম্পানিটি কেন তাদের হয়ে ‘প্রিল্ড ইউরিয়া’ সরবরাহের প্রস্তাব দিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সিন্ডিকেটের পরিচয় ও নেপথ্য নেটওয়ার্ক

মিঞা সাত্তার রাশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা। সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ও শেখ রেহানাসহ বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক ছিল। ২০১৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপ’।

বাংলাদেশে তার ব্যবসা পরিচালনা করেন ছোট ভাই আমিরুজ্জামান সোহেল, যার কার্যালয় মহাখালী ডিওএইচএসে। তাদের আরেক ভাই রায়হান গফুর সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি। গম আমদানির সমালোচনা ও অনিয়ম ঢাকতে মহাখালীর একই ঠিকানায় ‘আরডি গ্লোবাল’ নামে আরেকটি ছায়া প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়।

আওয়ামী লীগ আমলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে মালামাল সরবরাহকারী রাশিয়ার সাতটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের (Eleron, Power Machines, AMT Engineering, INTER-RAO, Atomenergomash, KER Holding, Orgenergostry) স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে মিঞা সাত্তারের প্রতিষ্ঠান। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালে ভোলায় তিনটি গ্যাসকূপ খননে রাশিয়ার কোম্পানি ‘গ্যাজপ্রম’-এর এজেন্ট হয়ে সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর হস্তক্ষেপে দরপ্রস্তাব ৫২ মিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৬৪ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন করিয়ে নেয়। এতে করে ১২ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত হাতিয়ে নেয়।

জিটুজি পদ্ধতিতে গম আমদানিতে মধ্যস্থতাকারীর সুযোগ না থাকলেও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্রের নির্দেশে সাত্তারের প্রতিষ্ঠানকে কমিশন এজেন্ট করা হয়। প্রদিনটর্গের মাধ্যমে ২০২২ থেকে ২০২৪-এর আগস্ট পর্যন্ত ৪,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১ লাখ টন গম আনা হয়। নিম্নমানের ও পচা গম সরবরাহের সুবিধার্থে গমের প্রোটিন মান ১২.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১.৫ শতাংশ করা হয়। এতে করে বাজারদরের চেয়ে টনে ৫০-৬০ ডলার বেশি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের মাত্র এক মাস আগেও ‘আরডি গ্লোবাল’কে আরো এক লাখ টন গম আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

বর্তমানে গম আমদানির অনিয়মে সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র কারাগারে এবং তৎকালীন সচিব ইসমাইল হোসেন বাধ্যতামূলক অবসরে আছেন। আর বিদেশে বসে ছোট ভাইকে সামনে রেখে সারের বাজার দখলের চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন মিঞা সাত্তার।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন