বাণিজ্য সংগঠন দলীয়করণের খেসারত দিচ্ছে শিল্প খাত

বাণিজ্য সংগঠন দলীয়করণের খেসারত দিচ্ছে শিল্প খাত
আমার দেশ গ্রাফিক্স

ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরে বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোকে দলীয়করণের খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের শিল্প খাতকে। রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নেতা নির্বাচন করায় ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে দলীয় তোষণই ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য। এতে দেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য বিশেষ করে শিল্প খাত চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) থেকে শুরু করে জেলা চেম্বার পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচনে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ও দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হতো বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।

বিজ্ঞাপন

বাণিজ্য সংগঠনগুলো জানায়, এক-এগারোর পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে দলীয়করণ ক্রমেই বাড়তে থাকে। ২০১৪ সালের পর সেটি আরো গতি পায়। আর ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর তা চরম মাত্রায় পৌঁছায়। টানা ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের দলীয়করণ রাষ্ট্রীয় প্রতিটি স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। এর প্রভাবে আর্থিক খাত ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ব্যবসায়ী নেতারা জানান, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অন্যান্য খাতের মতো ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল আওয়ামী লীগের অনুসারীদের হাতে। এই সময়ে এফবিসিসিআইয়ের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে দলীয় পরিচয় হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় নিয়ামক। এর আগেও রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তিরা ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্বে থাকলেও এই সময়ে লেজুড়বৃত্তি চরমপর্যায়ে পৌঁছায়। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের আগে ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই ব্যবসায়ীদের নিয়ে এফবিসিসিআই আয়োজিত সেই সম্মেলনকে লেজুড়বৃত্তির ‘ঐতিহাসিক উদারহরণ’ হিসেবে দেখছেন তারা।

এফবিসিসিআইয়ের একাধিক সূত্র জানায়, ২০১২-১৫ মেয়াদে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি হন হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন গোপালগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ। হাসিনা তাকে ‘আকরাম চাচা’ বলে সম্বোধন করতেন। ৭০ বছর বয়সি আকরাম শারীরিকভাবে দুর্বল এবং কার্যত অক্ষম হওয়ার পরও তাকে সভাপতি করা হয় হাসিনার ঘনিষ্ঠ হওয়ায়। আকরামের পরে সংগঠনটির নেতৃত্বে আসেন আবদুল মাতলুব আহমাদ। তার স্ত্রী সদ্যপ্রয়াত সেলিমা আহমাদ মেরী ছিলেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এবং হাসিনার ঘনিষ্ঠ। এরপর সভাপতি করা হয় মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনকে। তিনি ২০২০ সালে ফজলে নূর তাপসের ছেড়ে দেওয়া আসন ঢাকা-১০-এর উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি হন।

শেখ সেলিমের ছেলে ও হাসিনার ভাতিজা শেখ ফজলে ফাহিম ২০১৯-২১ মেয়াদে সভাপতি হন। সংগঠনটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ফাহিম এফবিসিসিআইতে আসার পর পুরো সংগঠনটিকে দলীয়করণ করে একসঙ্গে ৫৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেন। বিপরীতে কিছু সাবেক সেনাসদস্য, আমলা এবং নিজের কাছের লোকজনকে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেন। ফাহিমের পর নোয়াখালী-২ আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মোরশেদ আলমের ভাই মো. জসিম উদ্দিনকে সভাপতি করা হয়। তারপর চট্টগ্রামের মাহবুবুল আলমকে সভাপতি করা হয়। তার সঙ্গেও ‘ব্যাংকখেকো’ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলমের সম্পর্ক ছিল।

সূত্র জানায়, এফবিসিসিআইতে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মুন্তাকিম আশরাফ টিটু বছরের পর বছর একই পদে এবং সর্বশেষ সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। মুন্তাকিমের বাবা সাবেক ডেপুটি স্পিকার এবং কুমিল্লা-৭ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক আলী আশরাফ পাঁচবার (২০১০, ২০১৫, ২০১৭, ২০১৯ এবং মৃত্যুর আগে সর্বশেষ ২০২১ সালে) এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। যেহেতু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পরিবর্তে সিলেকশনের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন হতো, তাই মুন্তাকিম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতেন। তবে যে বছর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছিল, সেবার হেরে যান কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি মুন্তাকিম।

নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত এমন দুজন সাবেক কর্মকর্তা আমার দেশকে জানান, এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হতো। এ নিয়ে ভোটে ম্যানিপুলেশনসহ নানা অভিযোগ ছিল ব্যবসায়ীদের। ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের।

অভিযোগ রয়েছে, শুধু এফবিসিসিআই নয়, জেলা চেম্বারগুলোও কবজা করে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ৬৪ জেলার চেম্বারগুলোতে কে নেতা হবেন, কারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেনÑ সেটাও অনেকাংশে নির্ধারণ করে দেওয়া হতো।

একইভাবে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) নির্বাচনেও দলীয় প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে। জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর মামলায় অভিযুক্ত বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম মান্নান কচিকে নির্বাচিত করার প্রক্রিয়া নিয়েও ছিল প্রশ্ন-অভিযোগ। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, কচি সভাপতি হলেও সেখানে আগে থেকেই ‘ইলেকশন মেকানিজম’ করে রাখা হয়েছিল। চব্বিশের ৫ আগস্টের পরপরই বিজিএমইএর বোর্ড ভেঙে দেওয়ারও দাবি ওঠে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে। এছাড়া আওয়ামী লীগ মনোনীত ঢাকা উত্তরের সাবেক মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক যেবার সভাপতি হন, সেই নির্বাচনে একটি প্যানেলের বিপরীতে কোনো প্রার্থী দিতে দেওয়া হয়নি। তবে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তাকে ভোটকেন্দ্রে মারধর করা হয়েছিল। এমনকি তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার চাপ এবং ব্যাংক ফাইন্যান্সিংও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

আর বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে (বিকেএমইএ) মোহাম্মদ হাতেম সর্বোচ্চ ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পরও তাকে সভাপতি হতে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে নির্বাচনের সময় তিনি দেশের বাইরে চলে গিয়েছিলেন। বিদেশ থেকে ফেরার পর হাতেমের জন্য নতুন পদ সৃষ্টি করে কমিটিতে ‘এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

শুধু সংগঠন করায়ত্তই নয়, নতুন ভুঁইফোড় সংগঠন দাঁড় করিয়েও নেতৃত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করতেন আওয়ামী অলিগার্করা। ব্যবসায়ীদের একটি সূত্র জানায়, আওয়ামীপন্থি ব্যবসায়ী ও হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ এফবিসিসিআইয়ের দায়িত্ব শেষে নিজেই একটি সংগঠন করে সেটার শীর্ষ নেতা হয়ে যান। ‘ঢাকা চেম্বার’ ও ‘মেট্রোপলিটন চেম্বার’ থাকার পরও ‘বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স’ নামে আজাদের ওই সংগঠন নিয়ে সে সময়ে প্রশ্ন তোলেন ব্যবসায়ী নেতারা।

আবার কখনো কখনো ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার অংশ হিসেবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের বিধিবিধান পরিবর্তন করতেন আওয়ামী ব্যবসায়ী নেতারা। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) একটি সূত্র জানায়, যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য মোহাম্মদ আলী (খোকন) ২০১৯ সাল থেকে সংগঠনটির সভাপতি ছিলেন। ২০২৩ সালের এপ্রিলে সংগঠনটির গঠনতন্ত্রে বড় সংশোধনী এনে টানা তিন মেয়াদের পরিবর্তে চার মেয়াদে সভাপতি থাকার সুযোগ তৈরি করা হয়। এ সময় তিনি ২০২৩-২৫ মেয়াদের জন্য তৃতীয়বারের মতো বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি নির্বাচিত হন। তবে জুলাই বিপ্লবের মুখে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যূত হলে খোকন পদত্যাগ করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট। এই সংকট প্রথম বড় আকারে সামনে আসে আওয়ামী লীগের মেয়াদে ২০০৯ সালে। তখন থেকেই দেশের আবাসিক, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং শিল্প কারখানায় গ্যাস সরবরাহে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০১০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। তবে দেশীয় উৎসের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ না করে আমদানির মাধ্যমে সংকট মেটানোর নীতি গ্রহণ করে সরকার, যা পরবর্তী সময়ে পুরো শিল্প খাতকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এর পেছনে বিদেশি প্রভুকে খুশি করারও একটা উদ্দেশ্য ছিল। বর্তমানে জ্বালানি সংকট সেই অব্যবস্থারই অনিবার্য পরিণতি বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।

দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকেও গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান না করার পেছনে তৎকালীন ব্যবসায়ী নেতাদের আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তিকে দায়ী করেছেন শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা। তাদের অভিযোগ, এই সময়ে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ব্যবসায়ীদের মূল সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে সরকারকে খুশি রেখে সরকারি ঋণের বিপুল অর্থ লোপাট করার সুযোগ পেয়েছেন তারা। যার খেসারত এখনো গুনতে হচ্ছে দেশকে।

ব্যবসায়িক সংগঠনকে রাজনীতিকরণ প্রসঙ্গে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, ‘দলীয়করণের ক্ষেত্রে এফবিসিসিআইতে একজনকে আগে থেকেই ঠিক করে দেওয়া হতো— তাকে সভাপতি করতেই হবে। সবাই মিলে তাকে সভাপতি করত। ‘আকরাম চাচার’ ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়েছিল। তাকে একটি নির্দিষ্ট পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি হিসেবে আনা হয়েছিল। পরেরবার অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকে আনা হয়েছে। তিনি প্রকৃত অর্থে ব্যবসায়ী কি না, সেটা তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। দলীয়ভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদেরই সংগঠনগুলোর শীর্ষ পদে বসানো হতো।’

তিনি বলেন, অতীতেও বিভিন্ন সময়ে এমনটা দেখা গেছে, তবে আওয়ামী লীগের এই সময়টাতে বিষয়টি অনেক বেশি স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। আমি ২০১০ সাল থেকে সভাপতি হতে পারিনি। আমাকে বারবার বঞ্চিত করা হয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সবসময় দলীয় লেজুড়বৃত্তি থেকে দূরে থাকা উচিত বলে মনে করেন বিকেএমইএ সভাপতি।

ব্যাংক খাতেও ছিল আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। এর মূলে ছিল আওয়ামী লুটপাটে সহযোগিতা করা। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তেও প্রভাব রাখতেন। আর নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান হিসেবে এই খাত নিয়ন্ত্রণ করেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার (দুদক, সিআইডি) তথ্য অনুযায়ী, সালমান এফ রহমানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকা দুই শতাধিক কোম্পানির নামে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, যার সিংহভাগই মন্দ বা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। আর হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীর মধ্যে এক নম্বরে ছিলেন এস আলম। আটটি ব্যাংকের মালিকানায় থাকা এস আলম গ্রুপের নামে-বেনামে ঋণের পরিমাণ দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।

নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবির চেয়ারম্যান হন। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর এই সংগঠনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি ব্যাংকিং খাতে ‘চাঁদা সংগ্রাহক’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিভিন্ন ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে জোরপূর্বক কোটি কোটি টাকা অনুদান হিসেবে নিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০০৭ থেকে প্রায় ১৭ বছর তিনি এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদ আঁকড়ে ছিলেন। তৎকালীন রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যাংক কোম্পানি আইন পরিবর্তন করিয়ে পরিচালকদের মেয়াদ বাড়ানো এবং নিজের স্বার্থান্বেষী মহলকে সুবিধা দেওয়ার মূল কারিগর ছিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন।

এছাড়া শেখ পরিবারের সদস্যরা ক্ষমতার দাপটে বিভিন্ন ব্যাংকের পদগুলো বছরের পর বছর আগলে রাখতেন বলে অভিযোগ খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের। এর মধ্যে হাসিনার চাচা কাজী আকরাম ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২৫ বছর স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। আওয়ামী লীগের পতনের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট তিনি পদত্যাগ করেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র থাকাকালে আইন লঙ্ঘন করে মধুমতি ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন হাসিনার ভাতিজা শেখ তাপস। এরপর থেকেই তার এই ব্যাংকেই সব লেনদেন করতে বাধ্য হয় ডিএসসিসি।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের আমলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি দেশের ব্যাংক খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। আওয়ামী অলিগার্কদের অনৈতিক ও নজিরবিহীন সুবিধা দিতে গিয়ে একপর্যায়ে ব্যাংকগুলোতে এলসি খোলা বন্ধ হয়ে যায়। বিপাকে পড়েন শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীরা।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, আওয়ামী লীগের শেষের পাঁচ বছর বাংলাদেশের প্রতিটি খাতে রাজনীতিকীকরণ করা হয়ছিল। ব্যাংকিং খাতে চূড়ান্ত রকমের রাজনীতিকীকরণের ফলে লুটপাটের অর্থনীতি চালু হয়। আজকে এত নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল)Ñ এগুলো সব প্রকৃত খেলাপি ঋণ নয়। হয়তো আমাদের হিসাবে মোট খেলাপি ঋণ ৩৫ শতাংশের মতো। কিন্তু আমরা যদি প্রকৃতভাবে মূল্যায়ন করি, তাহলে প্রকৃত খেলাপি হয়তো ৮-১০ শতাংশ। বাকি ২৫ শতাংশ বিভিন্নভাবে লুটপাট করা হয়েছে।

আওয়ামী আমলে ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোকে অতিরাজনৈতিক করার কারণে সরকার ও শিল্প দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করেন এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক। তিনি আমার দেশকে বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো রাজনীতি থেকে দূরে থাকলে সরকারও লাভবান হয়, ব্যবসায়ীদেরও কাজ হয়। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকার তার ভুলগুলো বুঝতে পারে, সংশোধন করার সুযোগ থাকে। তবে ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্মে থেকে রাজনীতি না করাটাই সংগঠনের জন্য ভালো।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন