চীনমুখী হচ্ছে মালয়েশিয়া

চীনমুখী হচ্ছে মালয়েশিয়া
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। ছবি: এপি

তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে স্বীকার করে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাম্প্রতিক মন্তব্যে দেশটির দীর্ঘদিনের জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কুয়ালালামপুর কি ধীরে ধীরে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে—এমন আলোচনা শুরু হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, আনোয়ারের মন্তব্যকে মালয়েশিয়ার কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের সরাসরি ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মালয়েশিয়ার শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যিক সম্পর্কও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চলতি মাসের শুরুতে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আনোয়ার বলেন, তিনি তাইওয়ানকে ‘চীনের অংশ’ হিসেবে দেখেন।

তার ভাষায়, বিষয়টি ‘সর্বত্র স্বীকৃত’।

তবে এর পরই বিতর্ক তৈরি হয় তার আরেক মন্তব্য নিয়ে। শান্তিপূর্ণভাবে চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের ‘পুনর্মিলন’ সম্ভব না হলে বেইজিং শক্তি প্রয়োগ করলে তিনি তার নিন্দা করবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার মালয়েশিয়ার উদাহরণ টানেন।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার কোনো অঙ্গরাজ্য বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করলে দেশের ‘অখণ্ডতা ও ঐক্য রক্ষায়’ তিনি শক্তি প্রয়োগ করবেন।

আনোয়ারের এ বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, তাইওয়ান ‘চীনের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ’। চীনকে পুনরায় একীভূত করতেই হবে এবং করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে তাইওয়ান সরকার আনোয়ারের বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, চীনের প্রতি আনোয়ারের ‘একপেশে সমর্থন’ মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তাইওয়ানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাইওয়ান বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিপ উৎপাদক। দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোর মালয়েশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে।

পরে স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার তার বক্তব্যের কিছুটা ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া চীনের অবস্থানকে সম্মান করে। তবে তাইওয়ান প্রণালির উত্তেজনার শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় কুয়ালালামপুর।

সাবাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ

তাইওয়ান নিয়ে মন্তব্যের কয়েক দিন পরই আনোয়ার আবার আলোচনায় আসেন বোর্নিও দ্বীপের মালয়েশিয়ান অঙ্গরাজ্য সাবাহর প্রতিরক্ষা জোরদারের আহ্বান জানিয়ে।

প্রতিবেশী ফিলিপাইনে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় সামরিক স্থাপনা উন্নয়নের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, এর পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো প্রয়োজন।

ফিলিপাইন বর্তমানে বালাবাক দ্বীপে সামরিক স্থাপনা আধুনিকায়ন করছে। দ্বীপটি মালয়েশিয়ার ব্যাংগি ও বালামবানগান দ্বীপ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে।

সম্প্রতি বালাবাককে যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের ‘এনহ্যান্সড ডিফেন্স কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ইডিসিএর আওতায় আনা হয়েছে। এর ফলে সেখানে থাকা নির্দিষ্ট স্থাপনায় মার্কিন বাহিনীর প্রবেশাধিকার রয়েছে।

আনোয়ারের এই মন্তব্যের পর পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মধ্যে পুরোনো একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, মালয়েশিয়া পশ্চিমের কাছ থেকে দূরে সরে চীনের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।

চীনের সঙ্গে বাড়ছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক

মালয়েশিয়ায় চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে চীন দেশটির সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার।

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভসহ বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্পেরও অন্যতম বড় সুবিধাভোগী মালয়েশিয়া।

ভূরাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতেও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মালয়েশিয়ার অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তার একটি উদাহরণ। ইসরাইলের কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত মালয়েশিয়া। আনোয়ারের নেতৃত্বে গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধের বিরোধিতায় দেশটির অবস্থান আরো জোরালো হয়েছে।

তবে এসব বিষয়কে মালয়েশিয়ার চীনের দিকে কৌশলগতভাবে ঝুঁকে পড়ার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন না কিছু বিশ্লেষক।

নটিংহাম মালয়েশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক চি মেং তান বলেন, তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে মালয়েশিয়ার স্বীকৃতি নতুন কিছু নয়। ১৯৭৪ সালে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তুন আবদুল রাজাকের দেওয়া যৌথ বিবৃতিতেই এর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।

তার মতে, নতুন বিষয় হলো আনোয়ারের শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্য। কারণ, ‘এক চীন’ নীতির মধ্যে এ ধরনের অবস্থান সরাসরি বাধ্যতামূলক নয়।

তান আরো বলেন, সেপ্টেম্বরে আনোয়ারের সম্ভাব্য চীন সফরের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার। বেইজিংকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টার অংশ হিসেবেও তিনি এমন মন্তব্য করে থাকতে পারেন।

সাবাহ নিয়ে ফিলিপাইনের সঙ্গে পুরোনো বিরোধ

বালাবাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে আনোয়ারের উদ্বেগের সঙ্গে ফিলিপাইনের সঙ্গে মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের সাবাহ বিরোধেরও সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

১৯৬৩ সালে সাবাহ মালয়েশিয়ার অংশ হওয়ার পর থেকেই অঞ্চলটির ওপর দাবি করে আসছে ফিলিপাইন। মালয়েশিয়া বরাবরই এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও ম্যানিলা সাবাহর ওপর তাদের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে। ফিলিপাইনের দাবি, দেশটির ২০২৪ সালের মেরিটাইম জোনস অ্যাক্টে সাবাহর একটি অংশের ওপর তাদের ‘বিদ্যমান ও বৈধ দাবি’ বহাল রয়েছে।

জুলাইয়ে এ বিষয়ে জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায় মালয়েশিয়া। ফিলিপাইনের বর্ধিত মহীসোপানের দাবি সাবাহর জলসীমার ওপর হস্তক্ষেপ করছে বলে অভিযোগ করে কুয়ালালামপুর।

অধ্যাপক তানের মতে, বালাবাকে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়ে আনোয়ারের মন্তব্যকে চীনপন্থী অবস্থান না ধরে ‘নিজের সীমান্ত রক্ষার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া’ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

পশ্চিমের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্কও অটুট

বোর্নিওতে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের আরেকটি কারণ দক্ষিণ চীন সাগর। বিতর্কিত এই সাগরে মালয়েশিয়াও দাবিদার দেশ। চীনের সঙ্গে বিরোধ থাকলেও এ বিষয়ে ফিলিপাইনের তুলনায় মালয়েশিয়া তুলনামূলকভাবে কম সরব।

তবে চীনের সামরিক সক্ষমতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্কও জোরালো রেখেছে কুয়ালালামপুর।

এর অন্যতম উদাহরণ ‘ফাইভ পাওয়ার্স ডিফেন্স অ্যারেঞ্জমেন্ট’ বা এফপিডিএ। এতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য রয়েছে।

এটি বাধ্যতামূলক কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়। তবে মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সদস্যদেশগুলো পরস্পরের সঙ্গে পরামর্শ করার অঙ্গীকার করেছে। এর আওতায় প্রতিবছর ‘বেরসামা শিল্ড’ ও ‘বেরসামা লিমা’ নামে দুটি বড় সামরিক মহড়াও হয়।

মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের বাটারওয়ার্থে দেশটির বিমানঘাঁটিতে এফপিডিএ-এর বিমান প্রতিরক্ষা কার্যক্রমের সদর দপ্তর রয়েছে। এর নেতৃত্বে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার বিমানবাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

অস্ট্রেলিয়া বাটারওয়ার্থে একটি রাইফেল কোম্পানিও মোতায়েন রেখেছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় সামুদ্রিক টহল বিমান মোতায়েনের মাধ্যমে নিয়মিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম চালায়।

বিশ্লেষকদের মতে, এফপিডিএ-এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে মালয়েশিয়া এ অঞ্চলে পশ্চিমা সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা করছে। সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এটি কুয়ালালামপুরের জন্য একধরনের নীরব প্রতিরোধও তৈরি করছে।

চীনের ঘনিষ্ঠতা, কিন্তু জোট নয়

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্কের পাশাপাশি পশ্চিমা বিনিয়োগ থেকেও লাভবান হচ্ছে মালয়েশিয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড্যানিয়েল লোয়েবেল বলেন, মালয়েশিয়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বৈচিত্র্যময় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এ কারণে কোনো বড় শক্তির সঙ্গেই দেশটি গভীরভাবে জোটবদ্ধ হয়ে পড়েনি।

তার মতে, অর্থনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তাই মালয়েশিয়া চীনের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে জোট বাঁধার চেষ্টা করছে বলে তিনি মনে করেন না।

লোয়েবেল আরো বলেন, তাইওয়ানের প্রতিষ্ঠানগুলো মালয়েশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বড় বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। আনোয়ার বিষয়টি জানেন এবং এটিকে স্বাগতও জানান।

সব মিলিয়ে তাইওয়ান নিয়ে আনোয়ারের সাম্প্রতিক মন্তব্য চীনের প্রতি মালয়েশিয়ার ঝুঁকে পড়ার আলোচনা জোরালো করলেও, দেশটির সামগ্রিক পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতিতে এখনো ভারসাম্যের ছাপ স্পষ্ট। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর পাশাপাশি পশ্চিমের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ধরে রাখাই আপাতত কুয়ালালামপুরের কৌশল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একটি অংশ।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন