জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা শিশু-তরুণ, বৃদ্ধ ও যুবক-যুবতী—সবার জন্য এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই, যে দেশ নিয়ে সবাই গর্ব করে বলবে আমি বাংলাদেশি। নারী-পুরুষ সবাই মিলেই বৈষম্য, চাঁদাবাজ এবং সন্ত্রাসমুক্ত নিরাপদ ও মানবিক আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তুলব।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ঘোষণা দিয়েছি—আমরা চাঁদা নেব না, কাউকে চাঁদাবাজি করতে দেব না। আমরা দুর্নীতি করব না, কাউকে দুর্নীতি করতে দেব না। ইনসাফকে আর টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হবে না। জুলাই বিপ্লবীদের সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ১০ দলের প্রার্থীদের প্রতীকে ভোট এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। এ বিজয় কোনো পরিবার বা গোষ্ঠীর হবে না, এ বিজয় হবে জনসাধারণের।’
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরে আদর্শ স্কুল মাঠে আয়োজিত নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির। এ সমাবেশের মধ্য দিয়ে তিনি নির্বাচনি প্রচার কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। বেলা ৩টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জনসভা শুরু হলেও দুপুরের পর থেকেই দাঁড়িপাল্লার স্লোগান দিয়ে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে মাঠে জড়ো হন জামায়াতের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। একপর্যায়ে মানুষের উপস্থিতি মাঠ পেরিয়ে আশপাশের সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।
জনসভায় বক্তব্যে বিএনপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন কার্ড বিতরণের প্রতিশ্রুতির দিকে ইঙ্গিত করে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা কোনো কার্ডের ওয়াদা করছি না। ২ হাজার টাকার কার্ডে কোনো পরিবারের সমস্যার সমাধান হবে না। এতে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি হবে।’
তিনি বলেন, ‘জনগণের ট্যাক্সের টাকায় দেশ চলে। এর বাইরে বেসরকারি একটি ট্যাক্স আছে—গরিব, ভিক্ষুক থেকে শুরু করে সবার কাছ থেকেই এ ট্যাক্স নেওয়া হয়। ওই ট্যাক্স বন্ধ করতে হবে। ওই ট্যাক্স নামের চাঁদাবাজি আর চলবে না।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘সমাজে সব ধরনের বৈষম্য, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের কারণ ইনসাফ না থাকা। ইনসাফ থাকলে দুর্নীতিবাজ, লুটেরা, ব্যাংক ডাকাতেরা নিরাপদে পালানোর সুযোগ পেতেন না, বেগমপাড়া বানাতে পারতেন না, বাংলাদেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে পারতেন না।’
তিনি বলেন, ‘সাড়ে ১৫ বছরে গোটা দেশকে রক্তে লাল দেশে পরিণত করা হয়েছিল। ইতিহাসের কলঙ্ক আয়নাঘর গড়ে তোলা হয়েছিল। ওই আয়নাঘর থেকে সেনা কর্মকর্তা, উচ্চ আদালতের আইনজীবীও রক্ষা পাননি। অনেককে এখনো তার স্বজনেরা ফেরত পাননি। সম্ভবত তারা আর দুনিয়ায় নেই।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ সবার জন্মভূমি। এখানে আর কোনো ফ্যাসিবাদের ছায়াও দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ নতুন জামা পরে এলেও একই পরিণতি হবে।’
তিনি বলেন, ‘বিগত তিন নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। ভোট ডাকাতি হয়েছে। নতুন করে কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চাই না।’ তিনি তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘চব্বিশে তরুণদের বিপ্লবের কারণে আমরা কথা বলতে পারছি। তাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ন্যায়বিচার ও ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তোমরা ঘরে ফিরে যাবে না। আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি। যারা মামলাবাজি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, হত্যার রাজনীতি থেকে নিজেদের কর্মীকে রক্ষা করতে পারবে না, তারা আগামীর বাংলাদেশ রক্ষা করতে পারবে না। তারা যত স্বপ্নই দেখাক না কেন, তাদের ক্ষমতায় আসার সুযোগ দেওয়া যাবে না।’
জামায়াত আমির বলেন, “১২ ফেব্রুয়ারি মানুষ দুটি ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে মুখিয়ে আছে। একটি হলো গণভোটের হ্যাঁ, আরেকটি দেশের স্বার্বভৌমত্ব, সবার অধিকার প্রতিষ্ঠায় নির্বাচনের মাঠে এসে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ের মাধ্যমে দখলবাজ, চাঁদাবাজ, ডাকাত, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ‘হ্যাঁ’ ভোট।”
এ সময় তিনি এনসিপির আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলামের হাতে শাপলা কলি এবং ঢাকা-১২, ১৪, ১৬ ও ১৭ আসনে জামায়াতের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দিয়ে তাদের বিজয়ী করার আহ্বান জানান।
নিজ নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১৫ আসনের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা সব ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়িয়ে সব সমস্যার সমাধান করব, যেটা করতে পারব না সেটা এবং কেন দেরি হচ্ছে, তা স্পষ্ট করব। আমি বিজয়ী হলে এ এলাকায় মানসম্মত হাসপাতাল, বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মনিপুর স্কুলকে বিশ্বমানের করার চেষ্টা করব। বাকি সমস্যা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সমাধান করব।’
তিনি বলেন, ‘আমি এখানে জামায়াতের আমির হিসেবে নয়, সব বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পক্ষ নিয়ে দাঁড়িয়েছি। সবার ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘যাদের কারণে চব্বিশের বিপ্লব হয়েছে, তাদের ওপর অত্যাচার বন্ধ হয়নি। শহীদ শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা তার প্রমাণ। সে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ও মানুষের অধিকার আদায়ের কথা বলত। যারা এটা চায় না, তারাই তাকে শেষ করে দিয়েছে। ১৮ কোটি মানুষের অন্তরে এখন হাদি। তার স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই থামাব না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা তরুণদের প্রফেশনাল ও নৈতিক শিক্ষা দিতে চাই। যে শিক্ষা সার্টিফিকেট নয়, দক্ষতা তৈরি করে চাকরি নিশ্চিত করে।’
তিনি বলেন, ‘মায়েদের সম্মান রক্ষা করতে চাই। তাদের জন্য নিরাপদ কর্মস্থল ও রাস্তাঘাট নিশ্চিতে যা যা করার, সবকিছুই করব। যারা আজেবাজে কথা বলে, মা-বোনরা তাদের উপযুক্ত জবাব নির্বাচনের মাধ্যমে দিতে প্রস্তুত। মায়েদের ইজ্জত নিয়ে টানাটানি বরদাস্ত করা হবে না।’
জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা-১৫ আসনের বাসিন্দাদের সৌভাগ্য যে, জামায়াতের আমির এ আসন থেকে নির্বাচন করছেন। তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের কান্ডারি। সারা দেশে তার পক্ষে যে জনজোয়ার এসেছে, তা ১২ ফেব্রুয়ারি দেখা যাবে।’
তিনি সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অবশ্যই সুষ্ঠু হতে হবে। অন্য কোনো প্ল্যান কাজে দেবে না। নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ হতে হবে। কোনো বৈষম্য মানা হবে না। আমাদের মাঠে নামতে বাধ্য করবেন না।’
বিএনপির বিভিন্ন কার্ড দেওয়ার ঘোষণা প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘কার্ড পাক কিন্তু জনগণ পর্যন্ত এটা পৌঁছাবে তো? ঘুস দেওয়া লাগবে না তো? একদিকে কার্ড দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণখেলাপিদের প্রার্থী করা হচ্ছে। নতুন কোনো লুটেরাদের ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হবে না। তিনি ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীদের জয়ী করা এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।’
এ সময় শিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, সারা দেশে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি একটি নতুন ভোর আসবে ইনশাআল্লাহ।
ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের নির্বাচন পরিচালক আব্দুর রহমান মুসার সভাপতিত্বে জনসভায় আরো বক্তব্য দেন—জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা তাওহিদুজ্জামান, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, ঢাকা-১৪ আসনের প্রার্থী ব্যারিস্টার আহমেদ বিন কাশেম আরমান, কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা মুফতি আহসান উল্লাহ কাসেম, ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামান, ঢাকা-১৬ আসনের প্রার্থী কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনেরসহ সভাপতি লস্কর মোহাম্মদ তসলিম, কাফরুল থানার নেতা আনোয়ারুল করিম, আব্দুল মতিন খান, রেজাউল করিম মাহমুদ, জুলাইযোদ্ধা কাজী সাইফুল ইসলাম ও শহীদ আব্দুল হান্নানের ছেলে ডা. সাইফ আহমেদ খান।
ঢাকার এ জনসভার মধ্য দিয়ে জামায়াত আমিরের টানা চারদিনের নির্বাচনি কর্মসূচি শুরু হয়েছে। শুক্রবার থেকে তিনি উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা সফর করবেন। ২৫ জানুয়ারি ঢাকায় বিভিন্ন নির্বাচনি আসনে ফের গণসংযোগ করবেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


দুর্গ পুনর্দখলের লড়াইয়ে বিএনপি, নিরবচ্ছিন্ন প্রচারে জামায়াত
দিল্লি নয় পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ