হাইপোগ্লাইসেমিয়া কী এবং কেন হয়?
রক্তে শর্করার মাত্রা যদি ৩.৯ মিলিমোল/লিটার (৭০ মি.গ্রা./ডে.লি.) বা তার নিচে নেমে যায়, তবে সেই অবস্থাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলা হয়। রোজার সময় দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা, ওষুধের ভুল মাত্রা বা অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে এই সমস্যা হতে পারে। এটি সময়মতো সামাল দিতে না পারলে রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
হাইপোগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত সতর্ক হতে হবে—
- তীব্র ক্ষুধা অনুভূত হওয়া।
- শরীর হঠাৎ ঘেমে যাওয়া বা বুক ধড়ফড় করা।
- হাত-পা কাঁপা এবং শরীর অবশ লাগা।
- মাথা ঘোরা বা চোখে ঝাপসা দেখা।
- হঠাৎ খুব বেশি বিরক্তিবোধ বা মেজাজ খিটখিটে হওয়া।
- অসংলগ্ন কথা বলা বা চেতনা হারানো।
হাইপোগ্লাইসেমিয়া এড়াতে করণীয়
রমজানে নিরাপদ থাকতে ডায়াবেটিক রোগীদের নিচের নিয়মগুলো মেনে চলা জরুরি—
চিকিৎসকের পরামর্শ
চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে ওষুধের ডোজ ঠিক করে নিন। দিনের বেলার ওষুধগুলো ইফতার বা সাহরির সময়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। বিশেষ করে যারা ইনসুলিন নেন, তাদের ক্ষেত্রে ডোজ পরিবর্তন করা অত্যাবশ্যক। মোটাদাগে বলা হয়ে থাকে, রোজার সময় সাহরিতে ইনসুলিন ডোজ হবে স্বাভাবিক সময়ের রাতের ইনসুলিন ডোজের অর্ধেক, আর ইফতারের সময় ইনসুলিন ডোজ হবে স্বাভাবিক সময়ের সকালের ডোজের সমান।
খাবারের সঠিক নির্বাচন
সাহরিতে এমন খাবার খান, যা দেরিতে হজম হয় (Complex Carbohydrates), যেমন—লাল চালের ভাত, ওটস, রুটি, ডাল ও প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি। ইফতারে অতিরিক্ত মিষ্টি বা ভাজাপোড়া এড়িয়ে সুষম খাবার গ্রহণ করুন।
পর্যাপ্ত পানি পান
ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত সময়টায় পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার পান করুন, যেন পানিশূন্যতা না হয়।
শারীরিক পরিশ্রম নিয়ন্ত্রণ
রোজার অবস্থায় দিনের বেলা বিশেষ করে শেষ বিকালে ভারী ব্যায়াম বা কঠোর পরিশ্রম করবেন না। এতে ক্যালরি খরচ হয়ে সুগার দ্রুত কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তারাবিহর নামাজ নিজেই একটি ভালো ব্যায়াম, তাই আলাদা করে ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই।
নিয়মিত গ্লুকোজ পরীক্ষা
রোজা রেখে রক্ত পরীক্ষা করলে রোজা ভাঙে না। তাই সন্দেহ হলে বা নিয়মিত রুটিন অনুযায়ী দিনে অন্তত তিন-চারবার (দুপুরে, ইফতারের আগে এবং সাহরির দুই ঘণ্টা পর) সুগার মেপে দেখুন।
হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়ে গেলে কী করবেন? (ম্যানেজমেন্ট)
যদি গ্লুকোমিটার দিয়ে মাপার পর রক্তে সুগারের মাত্রা ৩.৯ মিলিমোল/লিটার বা তার কম পাওয়া যায়, অথবা রক্ত মাপার সুযোগ না থাকলেও যদি তীব্র লক্ষণ দেখা দেয়, তবে অবিলম্বে রোজা ভেঙে ফেলতে হবে। এক্ষেত্রে ‘১৫-১৫ নিয়ম’ অনুসরণ করা সবচেয়ে কার্যকর।
- দ্রুত শোষণযোগ্য চিনি গ্রহণ : দ্রুত ১৫ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট বা চিনিজাতীয় খাবার খান। যেমন ৩ চা-চামচ চিনি বা গ্লুকোজ পানিতে গুলে খাওয়া, আধা গ্লাস ফলের রস অথবা তিন-চারটি গ্লুকোজ ট্যাবলেট।
- বিশ্রাম ও পুনর্নিরীক্ষণ : চিনি খাওয়ার পর ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন এবং আবার সুগার মাপুন।
- পুনরাবৃত্তি : যদি সুগার এখনো ৩.৯-এর নিচে থাকে, তবে আবার ১৫ গ্রাম চিনি খান।
- স্থায়ী খাবার : সুগার স্বাভাবিক পর্যায়ে এলে পরবর্তী ইফতার বা খাবারের সময় অনেক দেরি থাকলে অল্প কিছু স্থায়ী শর্করা (যেমন : বিস্কুট বা মুড়ি) খেয়ে নিন, যাতে পুনরায় সুগার কমে না যায়।
সতর্কবার্তা : যদি রোগী অজ্ঞান হয়ে যান, তবে তাকে মুখে কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না। এতে খাবার ফুসফুসে গিয়ে বিপদ হতে পারে। এমন অবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গ্লুকোজ ইনজেকশন দিতে হবে।
কখন রোজা ভেঙে ফেলা বাধ্যতামূলক?
ইসলামি শরিয়াহ এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান উভয় মতেই জীবন রক্ষা আগে। নিচের পরিস্থিতিতে রোজা ভেঙে ফেলতে দ্বিধা করবেন না—
- রক্তে শর্করার মাত্রা ৩.৯ মিলিমোল/লিটারের নিচে নেমে গেলে।
- রক্তে শর্করার মাত্রা ১৬.৬ মিলিমোল/লিটারের বেশি হয়ে গেলে (হাইপারগ্লাইসেমিয়া ঝুঁকি)।
- তীব্র অসুস্থতা, পানিশূন্যতা বা অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম হলে।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে রমজানে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বিশেষ দিকনির্দেশনা
- পূর্বপ্রস্তুতি : রমজান শুরুর আগেই চিকিৎসকের কাছে গিয়ে ওষুধের ডোজ এবং সময় ঠিক করে নেওয়া (ডোজ অ্যাডজাস্টমেন্ট)।
- পারিবারিক সহায়তা : পরিবারের সদস্যদের উচিত বয়স্ক রোগীর সুগার লেভেল নিয়মিত চেক করা এবং তাদের খাবারে নজর রাখা।
- পর্যাপ্ত পানি : ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত প্রচুর পরিমাণে পানি ও তরল খাবার খাওয়া, যাতে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা না হয়।
- বিশ্রাম : দিনের বেলা অতিরিক্ত পরিশ্রম না করে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক (মেডিসিন) বারডেম জেনারেল হাসপাতাল
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

