বিপুল বকেয়া ও অবকাঠামোগত দুর্বলতায় ধুঁকছে টেলিটক

বিপুল বকেয়া ও অবকাঠামোগত দুর্বলতায় ধুঁকছে টেলিটক

বিভিন্ন ফি, চার্জ ও রাজস্ব বাবদ প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা বকেয়া পরিশোধে রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর টেলিটককে কড়া বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)। বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি বকেয়া পরিশোধ না করায় এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একদিকে হাজার হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তির পাহাড়, অন্যদিকে নড়বড়ে নেটওয়ার্ক ও মাত্র ৩-৪ শতাংশ বাজারের হিস্যা নিয়ে ধুঁকতে থাকা টেলিটকের আর্থিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা এখন চরমে পৌঁছেছে।

নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২১ মে বিটিআরসির অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগ থেকে পাঠানো চিঠিতে টেলিটকের কাছে পাওনার বিষয়টি উঠে আসে। এতে উল্লেখ করা হয়, টেলিটকের বকেয়া পরিশোধের জন্য ২০২৪ ও ২০২৫ সালে একাধিকবার চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি আজ অবধি কোনো অর্থ পরিশোধ করেনি। সরকারি রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে টেলিটককে বকেয়া টাকা এবং এর ওপর প্রযোজ্য মূসক ও বিলম্ব ফি অবিলম্বে পরিশোধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ হিসাব-নিকাশ বিটিআরসিতে দাখিল করার জন্যও বলা হয়। চিঠিতে টেলিটকের কাছে বকেয়া পাওনা প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার সুনির্দিষ্ট বিবরণ তুলে ধরা হয়।

বিজ্ঞাপন

টেলিটকের কাছ থেকে পাওনা কীভাবে আদায় করা হবেÑএ বিষয়ে জানার জন্য বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারীকে মোবাইলে কল ও বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া মেলেনি।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে টেলিটকের সেবার মান বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। বৈঠকে গত পাঁচ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে টেলিটকের ব্যর্থতার বিষয়টিও আলোচিত হয়।

টেলিটকের আর্থিক কার্যক্রমে অনিয়মের দীর্ঘ চিত্র উঠে এসেছে বিটিআরসির একটি অডিট আপত্তির তালিকায়। ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত এই নিরীক্ষায় লাইসেন্স ফি, স্পেকট্রাম চার্জ, রেভিনিউ শেয়ারিং এবং মূসক বা ভ্যাট বাবদ হাজার হাজার কোটি টাকার অনাদায়ী ও আর্থিক ক্ষতির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষায় টেলিটকের কাছে লাইসেন্স ফি, রেভিনিউ শেয়ারিং ও স্পেকট্রাম চার্জ বাবদ পাওনা অনাদায়ী থাকায় সরকারের তিন হাজার ৯০৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকার বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের চাঁদা অনাদায়ী থাকায় প্রতিষ্ঠান বা সরকারের পাঁচ কোটি ২৬ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অডিট আপত্তিতে স্থান পেয়েছে।

টাওয়ারসহ অবকাঠামোগত স্থবিরতা

বিটিআরসি প্রকাশিত চলতি বছরের আগস্টের সবশেষ উপাত্ত অনুযায়ী, দেশে বিভিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর এবং টাওয়ার শেয়ারিং কোম্পানির মোট টাওয়ারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ৭১৭টিতে। টেলিযোগাযোগ খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, মোবাইল নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি এবং সংযোগের গুণগত মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে টাওয়ারের সংখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।

বিটিআরসির তালিকায় থাকা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অপারেটর বিটিসিএলের টাওয়ারের সংখ্যার সঙ্গে অন্যান্য বেসরকারি ও টাওয়ার শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর তুলনা করলে রাষ্ট্রীয় খাতের বেশকিছু স্পষ্ট দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা ফুটে ওঠে। আগস্টের তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট ৪৬ হাজার ৭১৭টি টাওয়ারের মধ্যে বিটিসিএলের দখলে রয়েছে মাত্র ৫১৪টি টাওয়ার, যা মোট বাজারের মাত্র ১ শতাংশের কাছাকাছি।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, বিটিআরসির দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়েও বিটিসিএলের টাওয়ার ৫১৪টিতেই স্থির রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়, ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল যুগেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি নতুন কোনো টাওয়ার স্থাপন বা নেটওয়ার্ক অবকাঠামো বৃদ্ধিতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি এবং তাদের কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে।

অন্যদিকে, বেসরকারি টাওয়ার শেয়ারিং কোম্পানি এডোটকো প্রায় ১৭ হাজার টাওয়ার পরিচালনা করছে। এছাড়া গ্রামীণফোনসহ প্রধান মোবাইল অপারেটরদের কাছে রয়েছে প্রায় ১২ হাজার টাওয়ার।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের এই বিশাল প্রতিযোগিতায় যেখানে বেসরকারি খাত অভাবনীয় গতিতে নিজেদের অবকাঠামো বিস্তৃত করছে, সেখানে বিটিসিএল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং আধুনিক ব্যবসায়িক কৌশলের অনুপস্থিতির কারণে পুরোপুরি পিছিয়ে পড়েছে। এই তীব্র ব্যবধান রাষ্ট্রীয় খাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে তাদের গভীর অক্ষমতাকেই স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।

গ্রাহক কম, পিছিয়ে পড়ছে টেলিটক

বিটিআরসির সবশেষ জুলাইয়ের উপাত্ত অনুযায়ী, টেলিটক এবং অন্য বেসরকারি অপারেটরগুলোর গ্রাহকসংখ্যার মধ্যে তফাৎ আকাশচুম্বী। দেশের মোট ১৯০.৪৪ মিলিয়ন মোবাইল গ্রাহকের মধ্যে গ্রামীণফোনের গ্রাহক ৮৭.০১ মিলিয়ন, রবি আজিয়াটার ৫৮.৭৭ মিলিয়ন এবং বাংলালিংকের ৩৭.৮৪ মিলিয়ন। এর বিপরীতে টেলিটকের গ্রাহক মাত্র ৬.৮২ মিলিয়ন।

বাজার হিস্যার দিক থেকে জিপি প্রায় ৪৬% এবং রবি ও বাংলালিংক যথাক্রমে ৩১% ও ২০% বাজার দখল করে আছে। অপরদিকে, টেলিটকের অংশ মাত্র ৩-৪ শতাংশের ঘরে সীমাবদ্ধ। এই বিশাল ব্যবধানই প্রমাণ করে, বেসরকারি অপারেটরগুলোর তুলনায় টেলিটক গ্রাহক আকর্ষণে খুবই পিছিয়ে রয়েছে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একমাত্র মোবাইল অপারেটর হওয়া সত্ত্বেও টেলিটকের এই পিছিয়ে পড়ার পেছনে বেশকিছু কাঠামোগত ও কার্যগত দুর্বলতাকে দুষছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

প্রথমত, অপর্যাপ্ত নেটওয়ার্ক কাভারেজ ও আধুনিক প্রযুক্তি (যেমন মানসম্মত ফোরজি ও ফাইভজি সেবা) সম্প্রসারণে ধীরগতি গ্রাহকদের টেলিটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও ঘরের ভেতরের নেটওয়ার্কে সিগন্যালের দুর্বলতা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা।

দ্বিতীয়ত, বেসরকারি অপারেটরগুলোর তুলনায় বিপণন কৌশল, আকর্ষণীয় ইন্টারনেট অফার এবং কাস্টমার কেয়ার সেবার আধুনিকায়নে টেলিটক মারাত্মকভাবে পিছিয়ে রয়েছে, যা নতুন প্রজন্মের গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

তৃতীয়ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং দক্ষ পেশাদারিত্বের ঘাটতির কারণে টেলিটক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেদের প্রসার ঘটাতে পারছে না।

এছাড়া অন্য অপারেটররা যখন ক্রমাগত নতুন প্রযুক্তি ও গ্রাহকবান্ধব ডিজিটাল সেবা নিয়ে বাজারে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করছে, তখন সঠিক পরিচর্যা ও আধুনিক বাণিজ্যিক দূরদর্শিতার অভাবে টেলিটক তার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন