উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ বগুড়া ক্রমেই মাদক সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র বা ‘ডাম্পিং পয়েন্টে’ পরিণত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান, গ্রেপ্তার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পরও জেলায় মাদকের বিস্তার থামছে না। পুরোনো কারবারিদের পাশাপাশি এতে জড়িয়ে পড়ছে নতুন নতুন যুবক। ফলে তাদের শনাক্ত করতে বেগ পেতে হচ্ছে প্রশাসনকে।
জানা গেছে, মাদক নির্মূলে নিয়মিত অভিযান ও মামলা দায়েরের পাশাপাশি জেল-জরিমানা এবং জনসচেতনতা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মাদকবিরোধী বিলবোর্ড স্থাপন, দেয়ালঘড়ি ও টিস্যু বক্সে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হচ্ছে। প্রচার চালানো হচ্ছে সেলুন ও বিউটি পার্লারেও। তবে এসব উদ্যোগের পরও মাদক কারবারিদের তৎপরতা বন্ধ করা যাচ্ছে না।
জেলার ১৯টি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে গত সাত মাসে প্রায় ২,০০০ ব্যক্তি চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু প্রশাসনিক অভিযান বা নিরাময় কেন্দ্রের চিকিৎসা দিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, পরিবার ও স্থানীয় জনগণকে মাদক বিক্রি ও সেবনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত জেলায় ১,২৫৫টি অভিযান চালিয়ে ৫৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় ৪৫১টি মামলা দায়ের এবং বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়। গত বছরের একই সময়ে অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ২,২৪২টি অভিযানে ৯৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন সীমান্তপথ ব্যবহার করে ভারত থেকে ফেনসিডিল, বুপ্রেনরফিন ইনজেকশন, গাঁজা ও ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উত্তরাঞ্চলে প্রবেশ করছে। জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার উচ্চমা সীমান্তের প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকা কাঁটাতারবিহীন থাকায় মাদক পাচারকারীদের জন্য সেটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
পাচারকারীরা বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদক এনে কয়েক ধাপে দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ করছে। দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত দিয়েও অভিনব কৌশলে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় মাদক পৌঁছানোর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া টেকনাফ ও কক্সবাজার অঞ্চল থেকে আসা ইয়াবার বড় চালান বগুড়ায় মজুত করে পরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
বগুড়া শহরের হাড্ডিপট্টি এলাকা দীর্ঘদিন ধরে মাদকের অন্যতম প্রধান আখড়া হিসেবে পরিচিত। এছাড়া বাদুড়তলা, সুইপার কলোনি, লতিফপুর, চকলোকমান, বনানী, চেলোপাড়া, ফুলতলা, কানচগাড়ি, রেলস্টেশন, সেউজগাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারিদের তৎপরতা রয়েছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও মাদক বিক্রির অর্থসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সবশেষ গত ২০ আগস্ট মাদকবিরোধী অভিযানে এক দম্পতিকে আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
মাদক নির্মূলে কঠোর অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে। বগুড়ার প্রবেশ ও বের হওয়ার পাঁচটি প্রধান পয়েন্টে বড় আকারের মাদকবিরোধী বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। জেলার ১০৯টি ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌর এলাকায় ব্যাপক প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেলুন ও বিউটি পার্লারের কর্মীদের মাদকবিরোধী স্লোগানসংবলিত অ্যাপ্রোন দেওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সমাবেশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সচেতন করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বগুড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জিল্লুর রহমান ও বগুড়া ডিবির ইন্সপেক্টর ইকবাল বাহার জানান, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি খেলাধুলা, সভা ও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে কাজ করা হচ্ছে।
তারা বলেন, পুরোনো কারবারিদের তালিকা ধরে অভিযান ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম চালানো হলেও গোপনে নতুন নতুন যুবক এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
বগুড়াকে মাদকমুক্ত করতে সমন্বিত অভিযান ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

