দুই বছর বয়সে পোলিও আক্রান্ত হয়ে রিনি ইসলামের শরীরের নিচের অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে তিনি সম্পূর্ণভাবে চলাচলের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। জন্মস্থান নারায়ণগঞ্জেই বেড়ে ওঠা। সেখান থেকেই স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়েছেন রিনি। বর্তমানে রিনির ভাষ্য, জীবনের পথচলায় মা-ই ছিলেন তার প্রেরণার উৎস। মাকে ধরেই প্রতিদিন স্কুলের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেন। ২৫ বছর বয়সি রিনি বর্তমানে রাজধানীতে একটি বায়িং হাউজে কর্মরত।
তিনি জানান, প্রতিদিন অফিসের মাইক্রোবাস ধরার জন্য রিকশা ব্যবহার করেন। রিকশাচালকরা প্রায়ই তাকে হুইলচেয়ারসহ নিতে চান না। কখনো কখনো তাকে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়, না হলে তারা হুইলচেয়ারটি ভাঁজ করে এবং পুনরায় খুলে দিতে চান না।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রাহা আক্তার তার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময়কার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানান, রেলস্টেশন ব্যবহার করতে গিয়ে তিনি প্রায়ই দিক হারিয়ে ফেলতেন। সেখানে ব্রেইল সাইনবোর্ড বা অডিও নির্দেশনা না থাকায় প্রতিনিয়তই এ ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হতো। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমরা যেন যাতায়াত-ব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষ।
একই রকম গল্প হায়দার আলীর। তিনি জন্ম থেকেই অস্টিওজেনেসিস ইমপেরফেক্টা (ব্রিটল বোন ডিজিজ) রোগের কারণে চলাফেরা করতে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা তিনি। প্রতিদিন সকালে তিনি তার মিরপুরের বাসা থেকে কাজের জন্য যাত্রা শুরু করেন। তিনি মিরপুর স্টেশন থেকে মেট্রোতে চড়ে সচিবালয় স্টেশনে নামেন। তার ব্যাংক কাছেই অবস্থিত। তিনি আরো বলেন, ‘পরিবহনে বিদ্যমান ব্যবস্থা আমাদের ব্যবহারযোগ্য নয়। বাসের হেলপাররা হুইলচেয়ার নিতে চায় না এবং প্রায়ই খারাপ আচরণ করে। রিকশা এবং সিএনজিতে হুইলচেয়ারের জন্য জায়গা নেই। উবার এবং পাঠাও খুবই ব্যয়বহুল। কখনো কখনো সঠিক যানবাহন খুঁজে পাওয়া কঠিন।
প্রতিবন্ধীদের অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ একটি মানবাধিকার চুক্তি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারসংক্রান্ত কনভেনশন (সিআরপিডি) ২০০৮ সালে কার্যকর হয়। এর সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলাদেশ ২০১৩ সালে ‘প্রতিবন্ধীদের অধিকার এবং সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন করে সিআরপিডির নীতিগুলো দেশের আইনগত কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। তবে বাস্তবতা প্রায়ই এ নীতির উদ্দেশ্য থেকে ভিন্ন থাকে।
বাংলাদেশে ‘প্রতিবন্ধী অধিকার আইন, ২০১৩’ স্পষ্টভাবে বলা আছে, সব গণপরিবহন প্রতিবন্ধীবান্ধব করতে হবে। এ আইনের ৩২ ধারা অনুযায়ী, গণপরিবহনে প্রতিবন্ধীদের জন্য পাঁচ শতাংশ আসন সংরক্ষিত থাকবে। তবে অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, সহায়ক নয়—এমন ব্যবস্থা এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য কার্যকর নয়—এমন পরিবহনের কারণে তাদের অনেকেই গণপরিবহন ব্যবহার করতে পারেন না। এ অসুবিধা তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত করে। এটি তাদের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘনও বটে।
তবে ডিটিসিএর অধীন পরিচালিত মেট্রোরেলে (এমআরটি লাইন-৬) প্রতিবন্ধী যাত্রীদের একক যাত্রা টিকিটে শতকরা ২৫ ভাগ বিশেষ ভাড়া ছাড় কার্যকর করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকায় কিছু উচ্চমানের স্কুল ছাড়া দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য লিফট বা র্যাম্পের ব্যবস্থা নেই। এখন পর্যন্ত মেট্রোরেল ছাড়া দেশের অন্য কোনো গণপরিবহন প্রতিবন্ধীদের চলাচলের জন্য উপযোগী নয়। তবে মেট্রোরেল শুধু একটি নির্দিষ্ট রুটে চলে এবং শহরের একটি ছোট অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তারা আরো বলেন, প্রতিবন্ধীদের জন্য চলাফেরা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ তৈরি করতে সহজলভ্য ও নিরাপদ যাতায়াতব্যবস্থা অপরিহার্য। তবে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবহন অবকাঠামো এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রাস্তা, বাস, ট্রেন, লঞ্চ কিংবা ফুটপাত—সব ক্ষেত্রেই রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা, যা তাদের চলাচলকে কঠিন করে তুলছে।
যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার
২ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও সেবা নিশ্চিতকরণ এবং বাস্তবায়ন কমিটির দ্বিতীয় ফলোআপ সভায় দেশের ৫০০ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিবন্ধীবান্ধব হচ্ছে বলে জানানো হয়। সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এমএ মুহিত বলেন, প্রত্যেক প্রতিবন্ধী নাগরিকের জন্য খোলা হবে ‘আলাদা ফাইল’, নিশ্চিত হবে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন। হুইলচেয়ার নিয়ে সহজে ওঠা যাবে ইভি বাসে। প্রতিবন্ধী শিশুদের স্কুলে ফেরাতে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণেরও পরিকল্পনা করেছে সরকার।
সরকারের যেকোনো অবকাঠামো বা ভবন নির্মাণে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, নতুন নির্মিতব্য ৫০০টি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিবন্ধীদের যাতায়াতের জন্য র্যাম্প, লিফট এবং অন্তত একটি বিশেষ টয়লেটের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো প্রকল্প মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সেটি প্রতিবন্ধীবান্ধব কি না, তা কড়াভাবে যাচাই করা হবে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে পরিবেশবান্ধব ও বিদ্যুৎচালিত ইভি বাস চালুর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেখানেও প্রতিবন্ধীদের সুবিধার কথা ভাবা হচ্ছে।
একই সভায় সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল জানান, প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা চ্যারিটি নয়। একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে তার নাগরিকদের যে সামাজিক চুক্তি থাকে, সে চুক্তি অনুযায়ী একজন নাগরিক হিসেবে এটি তাদের প্রাপ্য অধিকার। আমরা সে অধিকার সুনিশ্চিত করার কাজ করছি।
বাংলাদেশে ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধিতার শিকার। ঢাকা শহরে ১০ লাখের বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বসবাস করেন। তাদের মধ্যে শহরে বসবাসকারী ব্যক্তিদের প্রায় শতকরা ৭৫ ভাগ প্রতিদিন যাতায়াত সমস্যায় পড়েন (বিবিএস জরিপ)।
বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস-এর (বি-স্ক্যান) সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব বলেন, আমি নিজেও একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী। আমাদের অবকাঠামো প্রতিবন্ধীদের জন্য একেবারেই সহায়ক নয়। অধিকাংশ ফুটপাতে হুইলচেয়ার চলাচলের ব্যবস্থা নেই। সরকারি ও বেসরকারি বাসের শতকরা ৯৫ ভাগ এ প্রতিবন্ধীর জন্য আলাদা র্যাম্প বা লিফট নেই, রেলস্টেশনে টিকিট কাউন্টার থেকে শুরু করে বগিতে ওঠার ব্যবস্থা পর্যন্ত প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। পুরো রেলব্যবস্থায় শুধু সুবর্ণ এক্সপ্রেসেই প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রয়েছে। তিনি জানান, তার সম্প্রদায়ের একজন প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। তবে কর্তৃপক্ষ শুধু উদাসীনই ছিল।
উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (ডব্লিউডিডিএফ)-এর নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, আমাদের নগর অবকাঠামো এখনো ইউনিভার্সাল ডিজাইন নীতির বাইরে। ফুটপাত, জেব্রাক্রসিং, আন্ডারপাস—এসব জায়গায় প্রতিবন্ধীদের জন্য ন্যূনতম মান বজায় রাখা হয়নি। আমাদের দেশের বাস সার্ভিস, তা নগর-মহানগর বা মফস্বল যেখানেই হোক না কেন, পরিবহন আমদানির সময় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, এগুলো প্রতিবন্ধীদের ব্যবহারের উপযোগী কি না।
‘প্রতিবন্ধীবান্ধব’ বলতে শুধু ছয়-সাতটি আসন সংরক্ষণ নয়, বরং যেহেতু দেশে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ প্রতিবন্ধী, সেহেতু সে অনুপাতে পরিবহনে ব্যবস্থা রাখতে হবে। আমার দেশের সঙ্গে আলাপচারিতায় মিষ্টি কিছু চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেন, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে—অর্থায়নের অভাব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি, পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিকদের সচেতনতার অভাব, সঠিক নকশা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ ছাড়াই অবকাঠামো নকশা তৈরি। সমাজের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে এখনই পরিবহন খাতে প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) কাজী মোরছালিন আমার দেশকে বলেন, ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রতিবন্ধীবান্ধব মোটরযানের কথা উল্লেখ থাকলেও এখনো সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা প্রতিবন্ধীবান্ধব মোটরযানের ড্রাইভিং লাইন্সেস প্রাপ্তির জন্য বিআরটিএতে আবেদন করতে পারেন। তবে বিষয়টি অনেকের কাছেই অজানা। আইনের এ বিধিবিধান বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এনজিওদের উচিত এ বিষয়ে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



