দেশে বৃষ্টিপাতের তথ্য কতটা নির্ভুল, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিন দেখা গেছে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কয়েকটি বৃষ্টি পরিমাপক কেন্দ্র আন্তর্জাতিক মানদণ্ড উপেক্ষা করে বড় গাছের নিচে বা ঘন ছায়ার মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত বৃষ্টিপাতের তুলনায় কম বা ত্রুটিপূর্ণ তথ্য রেকর্ড হচ্ছে।
একই সময়ে একই এলাকায় বাপাউবো ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের বৃষ্টিপাতের তথ্যে ২১ থেকে ৪৩ মিলিমিটার পর্যন্ত পার্থক্য পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ তথ্য জলবায়ু গবেষণা, বন্যা পূর্বাভাস ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এর প্রভাব খুবই সীমিত।
রেইন গেজ স্থাপনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ বাধ্যতামূলক। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) নির্দেশিকা অনুযায়ী, গাছ, ভবন বা অন্য কোনো বাধা থেকে রেইন গেজ অন্তত ওই বাধার উচ্চতার দ্বিগুণ দূরত্বে স্থাপন করতে হয়, যাতে বৃষ্টিপাতের সঠিক পরিমাপ পাওয়া যায়। অন্যথায় বাতাসের প্রভাবে বৃষ্টির ফোঁটা রেইন গেজে না পৌঁছানোর আশঙ্কা থাকে। ফলে প্রকৃত বৃষ্টিপাতের তুলনায় কম তথ্য রেকর্ড হতে পারে।
সরেজমিন দেখা গেছে, সিলেট ও কুড়িগ্রামসহ দেশের কয়েকটি স্টেশনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মানা হয়নি। ফলে বাপাউবো ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের বৃষ্টিপাতের তথ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।
বিডব্লিউসিএসআরপি প্রকল্পের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে ওয়াটার লেভেল, রেইন গেজ ও আবহাওয়া স্টেশন আধুনিকায়নে প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে স্থাপনের মৌলিক মানদণ্ডই অনুসরণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা আমার দেশকে জানান, এতে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ ব্যাহত হচ্ছে। এ তথ্য বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জলবায়ু ও পানিসম্পদবিষয়ক গবেষণায় ব্যবহার করা হয়। ফলে ভুল তথ্য গবেষণার ফলাফলকেও প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরেজমিন সিলেটের শাহী ঈদগাহ এলাকায় অবস্থিত বারিপাত ও বাষ্পায়ন স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, স্টেশনটি ৬০-৭০ ফুট উচ্চতার বড় বড় গাছে ঘেরা। রেইন গেজের ঠিক উপরে মাত্র পাঁচ থেকে সাত ফুট খোলা জায়গা রয়েছে। বাকি অংশ গাছে ঢেকে আছে। এমন অবস্থায় সামান্য বাতাসেও বৃষ্টির ফোঁটা রেইন গেজে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্টেশনটির তথ্যানুযায়ী, গত ২৬ জুন সকাল ৯টা থেকে ২৭ জুন সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ৩৮ মিলিমিটার। অন্যদিকে একই এলাকার বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের রেইন গেজে একই সময়ে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ৫৯ মিলিমিটার।
সরেজমিন দেখা যায়, আবহাওয়া অধিদপ্তরের স্টেশনটি খোলামেলা স্থানে স্থাপিত, যার আশপাশে কোনো বড় গাছ বা স্থাপনা নেই। ফলে দুই প্রতিষ্ঠানের তথ্যের মধ্যে ২১ মিলিমিটার পার্থক্য দেখা যায়।
কুড়িগ্রামের বৃষ্টি পরিমাপক কেন্দ্রেও একই চিত্র। সেখানে একটি আমবাগানের ভেতর বড় বড় গাছের নিচে রেইন গেজ স্থাপন করা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য হৃষিকেশ আমার দেশকে জানান, কেন্দ্রের গেট কখনো খোলা হয় না। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি লোহার বেড়া টপকে ভেতরে গিয়ে বৃষ্টিপাত পরিমাপ করেন। ওই কেন্দ্রে গত ২৪ জুন সকাল পর্যন্ত শেষ ২৪ ঘণ্টায় ৫২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ওই দিনের কুড়িগ্রামের তথ্য না থাকায় তুলনা করা সম্ভব হয়নি।
শুধু সিলেট নয়, অন্য এলাকায়ও দুই সংস্থার তথ্যে বড় ধরনের ব্যবধান দেখা গেছে। গত ২৭ জুন নেত্রকোনার জারিয়া-ঝাঞ্জাইলে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করলেও একই সময়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী নেত্রকোনায় বৃষ্টিপাত হয় ৪৯ মিলিমিটার। অর্থাৎ ব্যবধান ৪৩ মিলিমিটার।
একই দিন দিনাজপুরে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্যে বৃষ্টিপাত ছিল ১৭ দশমিক শূন্য ৪ মিলিমিটার, যেখানে আবহাওয়া অধিদপ্তর রেকর্ড করে ২৯ মিলিমিটার। ব্যবধান প্রায় ১২ মিলিমিটার। শ্রীমঙ্গল, রাঙামাটি, বরিশালসহ আরো কয়েকটি কেন্দ্রেও পার্থক্য দেখা গেছে।
এ বিষয়ে সারফেস ওয়াটার হাইড্রোলজি সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবিএম মুজাহিদী আমার দেশকে জানান, রেইন গেজ স্থাপনে তারা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার নির্দেশিকা অনুসরণ করেন। তবে সব জায়গায় পর্যাপ্ত নিজস্ব জমি না থাকায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রেইন গেজ বসানোর পর আশপাশের গাছ বড় হয়ে যায়। তখন ডালপালা ছেঁটে প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারেন্স বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে স্থাপিত অনেক রেইন গেজের ক্ষেত্রে জমির মালিক গাছ কাটতে না দেওয়াও একটি সমস্যা। এছাড়া চুরিসহ অন্যান্য সমস্যার কারণে কিছু রেইন গেজ মসজিদের ছাদেও স্থানান্তর করা হয়েছে।
সিলেট কেন্দ্রের ছবি দেখানো হলে তিনি বলেন, এখানে গাছগুলো দূরেই মনে হচ্ছে। সম্ভবত অ্যাঙ্গেল করে ছবি তোলা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি জানান, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে প্রতিদিন সকাল ৯টায় একজন কর্মী স্টেশনে গিয়ে আগের ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাত পরিমাপ করে রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করেন। মাস শেষে তা কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে পাঠানো হয়। ডিজিটাল রেইন গেজের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সফটওয়্যারে চলে আসে। অন্যদিকে বন্যা পূর্বাভাসের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য প্রতিদিন সকাল ৯টায় এসএমএসের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক পাঠানো হয়।
তিনি জানান, বর্তমানে বাপাউবোর ২৭৪টি স্টেশন সচল রয়েছে। এর মধ্যে ২৭২টি ডিজিটাল এবং ২৭৪টি ম্যানুয়াল রেইন গেজ রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী স্টেশন স্থানান্তর বা পুনর্বিন্যাস করা হয়।
দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান আমার দেশকে জানান, তাদের বুলেটিনের জন্য ৮১টি স্টেশন নিয়মিত মনিটর করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাইড্রোলজি বিভাগ থেকেই মাঠ পর্যায়ের গেজ রক্ষণাবেক্ষণ করে। সে তথ্যই আমরা ব্যবহার করি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যের সঙ্গে পার্থক্যের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুই প্রতিষ্ঠানের রেইন গেজ একই স্থানে নয়। স্থানীয়ভাবে বৃষ্টিপাতের তারতম্য থাকায় তথ্যে পার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক। যেমন ঢাকার গ্রিন রোডে বৃষ্টি হতে পারে কিন্তু আগারগাঁওয়ে হয়তো হচ্ছে না। তাই হুবহু ম্যাচিং হওয়া কঠিন।
রেইন গেজ সঠিকভাবে স্থাপন না হলে পূর্বাভাসে প্রভাব পড়তে পারে কি নাÑএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রথমত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট হাইড্রোলজি ডিভিশনের, আমাদের নয়। তবে কারিগরিভাবে বললে, বাংলাদেশের বন্যার প্রায় ৯২ শতাংশই উজানের বৃষ্টিপাতের কারণে হয়। এতে দেশের অভ্যন্তরের বৃষ্টিপাতের অবদান মাত্র ৮ শতাংশ। তাই অভ্যন্তরীণ রেইন গেজের তথ্যে কিছু বিচ্যুতি থাকলেও সামগ্রিক বন্যা পূর্বাভাসে তার প্রভাব হবে খুবই নগণ্য।
তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা যে তথ্য প্রকাশ করি, তা যাচাই-বাছাই করেই করি। প্রতিদিন সকাল ৯টায় এসএমএসের মাধ্যমে তথ্য আসে। সেগুলো যাচাই করে বুলেটিন প্রকাশ করা হয়। আমাদের দায়িত্ব হলো প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মানুষকে সতর্ক করা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ না করে রেইন গেজ স্থাপন করলে বৃষ্টিপাতের নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়, যা দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু গবেষণা ও স্থানীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, রেইনফল ডেটার অ্যাকুরেসি ও কনসিস্টেন্সি মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ, কোনো এলাকায় বৃষ্টিপাত প্রকৃতের চেয়ে বেশি দেখানো হলে অবকাঠামোর নকশা অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। আবার কম দেখানো হলে নকশা দুর্বল হবে, যা ভবিষ্যতে ঝুঁকি বাড়াবে। পানি, বন্যা ও পরিবেশবিষয়ক গবেষণাও ভুল তথ্যের কারণে বিজ্ঞানসম্মত ফলাফল দিতে ব্যর্থ হবে।
অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম উল্লেখ করেন, অনেক রেইন গেজ প্রকল্প ঋণের টাকায় বাস্তবায়িত হয়। তাই রাষ্ট্রের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ডেটার মান নিয়ন্ত্রণ বা কোয়ালিটি কন্ট্রোল করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে সরকারকে ডেটার দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার বাঁধ করেছে কি না, গাছ লাগিয়েছে কি নাÑএসব খেয়াল রাখে। কিন্তু ডেটা অর্থাৎ তথ্যউপাত্তের যে বেসিস, তার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। সরকারের উচিত এদিকে খেয়াল রাখা।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ আল মুজাহিদ ও সিলেটের ফটোসাংবাদিক শহীদুল ইসলাম]
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

