ইরানে আমেরিকা-ইসরাইলের হামলা, কাতারের সার রপ্তানিতে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি না করা এবং গ্যাস-জ্বালানি সরবরাহ সংকটে দেশে সারের মজুতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। চাহিদা অনুযায়ী কারখানায় গ্যাস না পাওয়ায় ইউরিয়া উৎপাদন প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। এতে নিরাপদ সার মজুতের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ টন থেকে বর্তমান মজুত ক্রমেই তলানিতে নামছে। গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের সার মজুত পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এ চিত্র উঠে এসেছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সার আমদানিতেও তৈরি হয়েছে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা। এছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিকল্প রুটে মিসরের ইয়ানবু বন্দর হয়ে প্রায় ১২০০ মাইল ঘুরে সার আনতে হচ্ছে। এতে আমদানি ব্যয় ও সময় দুই-ই বাড়ছে। এর সঙ্গে কাতার চুক্তিবদ্ধ না হওয়ায় তিন দেশের পরিবর্তে এখন দুই দেশনির্ভর আমদানিতে সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কৃষকের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিদিন মাঠ পর্যায়ে সার সরবরাহ ও বিতরণ করতে হয়। উৎপাদনে ঘাটতি ও বিলম্বে জাহাজ পৌঁছানো এবং কাতারের পিঠটান—এই তিন কারণে সার সরবরাহ চাহিদায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা কমানোর লক্ষ্যে বিকল্প দেশ হিসেবে রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাই থেকে ইউরিয়া সার আমদানির জন্য দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সার আমদানি কার্যক্রম গ্রহণ করতে হলে আরো দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে। তখন কিন্তু আমন মৌসুমও শেষ হয়ে যাবে।
সূত্র জানিয়েছে, চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে বীজতলা ও চারা রোপণে আমনের এই ভরা মৌসুমে সার সংকটে ফসল উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। এসব সংকটের মধ্যে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের নিয়োগ করা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সার ডিলারদের নিয়োগ বাতিল করা হয়। এর বিপরীতে নতুন নীতিমালার আলোকে সরকার নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া শুরু করেছে।
পুরাতনদের বাদ ও নতুন নিয়োগকে কেন্দ্র করে মাঠ পর্যায়ে সারের মজুত ও বিতরণ নিয়ে একধরনের জট তৈরি হয়েছে। কৃষির মাঠ অফিসের কর্মকর্তাদের দাবি, পুরোনো ডিলাররা বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া দুই ক্ষেত্রেই দাম বস্তাপ্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে কৃষকের ওপর নতুন করে আর্থিক খরচের চাপ তৈরি হয়েছে।
দাম বৃদ্ধির কারণে শুধু সাতক্ষীরাতেই গত ১৬ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ৩ অসাধু সার ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে। একই সময় শেরপুর জেলায় ১৫ ডিলারের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এ নিয়ে সারা দেশেই একই চিত্র দেখা গেছে।
এদিকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সূত্রে জানা গেছে, ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপি সারের দাম ১,৩৫০ টাকা এবং ডিএপি ১০৫০ টাকা সরকার নির্ধারণ করেছে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে সার না পেয়ে তারা খোলাবাজার থেকে টিএসপি কিনছেন ১,৭০০ থেকে ১,৮০০ টাকায়। আর ডিএপির জন্য তাদের গুনতে হচ্ছে প্রায় ১,৫০০ থেকে ১,৬০০ টাকা।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বসন্তপুর গ্রামের কৃষক ওয়ালিউল্লাহর অভিযোগ, দোকানে সার না রেখে গোপনে অন্যত্র মজুত করে পরে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। দুর্গাপুর উপজেলার কৃষক আবির আহম্মেদের অভিযোগ, কৃষি কর্মকর্তা ও ডিলারদের একাংশের যোগসাজশে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। তার দাবি, অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা দিলে অনেক ক্ষেত্রে সার পাওয়া যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ) অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমাম বৃহস্পতিবার আমার দেশকে বলেন, সার সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছু অনিয়ম ধরা পড়েছে। কোনো এলাকায় চাহিদা কম থাকলে কিছু ডিলার সেই সার অন্য এলাকায় বেশি দামে বিক্রি করছেন। আবার কোনো কোনো ডিলার সরকারি গুদাম থেকে সার উত্তোলন করে নিজস্ব গোডাউন খালি রেখে খুচরা বিক্রেতা বা সাব-ডিলারের মাধ্যমে সার বিক্রির চেষ্টা করছেন। এতে কৃষক ডিলারের দোকানে সার না পেলেও খুচরা পর্যায়ে বেশি দামে পাচ্ছেন।
এর আগে গত রোববার কৃষি সচিব সেলিম খান রংপুরে মতবিনিময় সভায় বলেছেন, বর্তমানে দেশে সারের কোনো সংকট নেই এবং পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। কৃষকের স্বার্থে সার ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তদারকি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়ে তিনি অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের (সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখা) যুগ্ম সচিব ড. জাহাঙ্গীর আলম গত রোববার আমার দেশকে বলেন, আমন মৌসুমে সারের স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে সরকারি সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু নতুন নীতিমালার আলোকে ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার পর থেকেই একটি অসাধু গোষ্ঠী ও কিছু ডিলার অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম আতঙ্ক ছড়িয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
এদিকে রোববার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ বলেছেন, আগামী দুবছরেও দেশে গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের সমাধান হবে না। বিসিআইসির কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যদি বিকল্প হিসেবে দেশের বন্ধ তিনটি সার কারখানা চালু করা না যায়, তাহলে আমনের পাশাপাশি আগামী বোরো মৌসুমে সারের বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে পারে। যার প্রভাবে কৃষিতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা ২৬ লাখ ২০ হাজার টন। এর সঙ্গে নিরাপত্তা মজুত হিসেবে ৫ লাখ টন রাখতে হয়। সব মিলিয়ে প্রয়োজন ৩১ লাখ ২০ হাজার টন। বর্তমানে দেশে ইউরিয়া মজুত রয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৩২৯ টন, যা নিরাপদ মজুতের চেয়ে মাত্র ৩২৯ টন বেশি।
কদিন আগে এ মজুত ছিল প্রায় ৮৫ হাজার টন বেশি। কারণ, আগে যেখানে ১০ শতাংশ উৎপাদন ঘাটতি ছিল, গতকাল বৃহস্পতিবার এই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ।
জানা যায়, বিদেশ থেকে মোট ১০ লাখ ২৯ হাজার টন ইউরিয়া আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৩ লাখ ২৫ হাজার টন এবং রাশিয়া থেকে টেন্ডারের মাধ্যমে আরো ১ লাখ ৬০ হাজার টন সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে।
বিসিআইসির কর্মকর্তারা জানান, দেশে বর্তমানে কয়েকটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে। ঘোড়াশালের পলাশ ও শাহজালাল সার কারখানা প্রায় ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন করছে। দুটি কারখানা প্রতিদিন এক লাখ টনের ওপরে উৎপাদন করছে।
বিসিআইসির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মঞ্জুর রেজা আমার দেশকে বলেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে আরো কয়েকটি বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এছাড়া আশুগঞ্জসহ কয়েকটি কারখানা চালু করা সম্ভব হলে দেশে সার উৎপাদন বাড়বে এবং আমদানির ওপর চাপ কমবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।
তবে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইউরিয়ার পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক হলেও ডিএপি, টিএসপি ও এমওপির মজুত নিরাপদসীমার নিচে রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ডিএপি মজুত রয়েছে ৩ লাখ ৩৫৩ টন। নিরাপদ মজুতের জন্য প্রয়োজন ৫ লাখ টন। অর্থাৎ, ঘাটতি ১ লাখ ৯৭ হাজার টন। টিএসপির মজুত রয়েছে ৩ লাখ ৪৭৯ টন। নিরাপদ মজুত প্রয়োজন ৪ লাখ টন। ঘাটতি ৯৬ হাজার টন।
অন্যদিকে এমওপির মজুত রয়েছে ১ লাখ ৬২৩ টন। নিরাপদ সীমা ৩ লাখ টন হওয়ায় ঘাটতি ১ লাখ ৩৯ হাজার টন। এ ঘাটতি দিন দিন বাড়বে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী চলতি মৌসুমে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৫৭ লাখ ১০ হাজার ৭৬২ হেক্টরে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৮০,৫৭৬ টন।
বিসিআইসি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী ডিলাররা সরকারি গুদাম থেকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সার উত্তোলন করেন। এরপর জেলা ও উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির তত্ত্বাবধানে কৃষকদের কাছে সরকার নির্ধারিত দামে সার বিক্রি করার কথা। ফলে কোনো পর্যায়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি হলে সংশ্লিষ্ট মনিটরিং কমিটির নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ ও পরিবহন ঝুঁকি থাকায় একাধিক উৎস থেকে সার সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। এতে কোনো একটি দেশ বা সরবরাহ রুটে সমস্যা হলেও বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানি করা সম্ভব হবে।
তবে ইউরিয়া সরবরাহে আমদানিনির্ভরতা বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



