বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে বিদ্যমান ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২’-এ বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, পাচার করা সম্পদের বিষয়ে অভিযোগ প্রমাণের প্রচলিত ধারায় বড় পরিবর্তন এনে ‘নিরপরাধ প্রমাণের দায়ভার’ অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপরই অর্পণ করা হচ্ছে। ফলে নতুন আইন পাস হলে অভিযুক্তকেই নিজ দায়িত্বে প্রমাণ করতে হবে তার অর্জিত বা পাচার করা সম্পদ সম্পূর্ণ বৈধ।
এদিকে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ থেকে শুল্ক-কর আদায়ের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সাত সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া নিরপরাধ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য আইনে সুনির্দিষ্ট প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে এবং বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার আবেদনের সময়সীমাও বাড়ানো হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী এই আইন প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারকের সভাপতিত্বে বিদেশে পাচার করা সম্পদ পুনরুদ্ধারের জন্য বিদ্যমান মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর কিছু ধারার সংশোধন সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় ও অংশীজন সভার কার্যবিবরণী সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিএফআইইউয়ের (বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট) প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে মতামত দিয়েছেন।
বিদেশে পাচার হওয়া অবৈধ অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর বিভিন্ন ঘাটতি দূর করার লক্ষ্যে প্রথমে বিশেষ অধ্যাদেশ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তা পরিবর্তন করে বিদ্যমান আইন সংশোধনের পথ বেছে নেয় সরকার। নতুন প্রস্তাবিত খসড়ায় মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ অর্থের লেয়ারিং বা বারবার হাতবদল রোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানি লন্ডারিংয়ের জটিল অপরাধে অপরাধীরা নানা উপায়ে অর্থের উৎস ও আসল মালিকানা লুকিয়ে ফেলে। এতে প্রচলিত আইনে প্রসিকিউশনের পক্ষে অপরাধ প্রমাণ করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে। এই আইনি মারপ্যাঁচ ও দীর্ঘসূত্রতা দূর করতেই আন্তর্জাতিক আইন বা ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো দেশের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে অভিযুক্তের ওপর অপরাধ প্রমাণের দায়ভারের বিধান যুক্ত করা হচ্ছে।
হয়রানি রোধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা
আইন সংশোধনের এই প্রক্রিয়ায় কঠোরতার পাশাপাশি মানুষের আইনি সুরক্ষা ও হয়রানি রোধের বিষয়টিতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে নিরপরাধ কোনো মানুষ যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য ‘দ্য এভিডেন্স অ্যাক্ট, ১৮৭২’-এর আলোকে সামগ্রিক বিধানগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
পাশাপাশি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ধারা ১৮-এর বিধান অনুযায়ী বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বা সম্পদ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ফেরত দেওয়ার জন্য আবেদন করার নির্ধারিত সময়সীমা ৩০ দিন থেকে বাড়িয়ে ৪৫ দিন করা হচ্ছে। এই সময়সীমা বৃদ্ধির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত বা সংশ্লিষ্ট দাবিদার পক্ষ তাদের আইনি অধিকার সাব্যস্ত করার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ পাবেন।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ আমার দেশকে বলেন, সময়ের প্রয়োজনে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে সংশোধনী আনা অত্যন্ত জরুরি। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
শুল্ক-কর আদায়ে কমিটি
বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদের মধ্যে আদালতে অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ হওয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সরকারের প্রাপ্য শুল্ক ও কর আদায়ের উপায় নির্ধারণে সাত সদস্যের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কেন্দ্রীয় ব্যাংক শাখা এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। অ্যাটর্নি জেনারেলকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব, দুদকের মানিলন্ডারিং শাখার মহাপরিচালক, বিএফআইইউর প্রধান কর্মকর্তা, এনবিআরের সিআইসির মহাপরিচালক এবং সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম শাখার ডিআইজি। আর এনবিআরের কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) মহাপরিচালক কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
এই কমিটির মূল কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে—বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধান পর্যালোচনা করে অবরুদ্ধ হিসাব থেকে রাষ্ট্রের প্রাপ্য অর্থ আদায়, প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা। পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের চলমান প্রক্রিয়াকে আরো গতিশীল করতে এবং রাষ্ট্রের আর্থিক স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



