বাংলাদেশ বনাম ভারত

সংখ্যালঘুদের ধর্মপালনের অধিকারের বিপরীত চিত্র

সংখ্যালঘুদের ধর্মপালনের অধিকারের বিপরীত চিত্র
বাঁয়ে নামাজরত মুসল্লিকে পুলিশের লাথি, মার্চ ২০২৪ এবং ডানে নয়াদিল্লির তুর্কম্যান গেট এলাকায় মসজিদ ধ্বংস, জানুয়ারি ২০২৬। ছবি: দ্য হিন্দু

তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ নামধারী হিন্দুত্ববাদী ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে। ধর্মপালনের পাশাপাশি বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোয় আসছে নিয়মিত বাধা ও নানারকম বিধিনিষেধ। ঈদের সরকারি কোনো ছুটি নেই দেশটিতে, যদিও সেখানে ২০ কোটির বেশি মুসলমানের বসবাস।

হিন্দুত্ববাদী বিজেপি শাসিত এই দেশে নামাজে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি নামাজরত মুসল্লিদেরও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লাথি মারার দৃশ্য এখন সবার চোষে ভাসে। বিভিন্ন প্রদেশে মসজিদ-মাদরাসা ভাঙার উৎসব চলছে। গরুর মাংস খাওয়া রীতিমতো বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। আর এর শাস্তি পিটিয়ে হত্যা।

বিজ্ঞাপন

ভারতের ঠিক বিপরীত চিত্র বাংলাদেশে। এবার সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে পূজার ছুটি পাঁচ দিন করা হয়েছে। এর বাইরে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ঐচ্ছিক ছুটিও নিতে পারছে। বিভিন্ন স্থায়ী মন্দির ছাড়াও মোড়ে মোড়ে বসেছে পূজামণ্ডপ। অনেক মণ্ডপের সামনের রাস্তা বন্ধ করে চলছে পূজা উৎসব। এই নিয়ে সাধারণ মানুষের সাময়িক ভোগান্তি হলেও কারো কোনো বিরক্তি নেই।

হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় এই ধর্মীয় উৎসব পালনে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। পূজা উপলক্ষে মন্দিরগুলোয় সরকারের বরাদ্দের পরিমাণ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মুসলিমরা হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়িয়েছে, যাতে তাদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবটি তারা শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করতে পারেন।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে অভিযোগ ভারত করে আসছে, সেটা আবারও মিথ্যা প্রমাণিত হচ্ছে শান্তিপূর্ণ দুর্গাপূজার মধ্য দিয়ে। এবারে পূজায় হিন্দুত্ববাদী বিজেপিশাসিত পশ্চিমবঙ্গ থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের বেশকিছু মানুষ এসেছেন বাংলাদেশে। তারাও অনেকটা অবাক হয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, কলকাতায় বসে অনেক কিছু শুনেছি, এখন দেখছি সবই মিথ্যা। রাজধানীর প্রধান পূজামণ্ডপ ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখেছি, এখানে হিন্দু-মুসলিম সবাই ভাই ভাই। কারো প্রতি কোনো বিদ্বেষ নেই।

রাজধানী ঢাকার শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ বনানী সার্বজনীন পূজামণ্ডপ। কামাল আতাতুর্ক পার্কের স্থায়ী পূজামণ্ডপে প্রতি বছর জাঁকজমকপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। নিত্যনতুন ডিজাইন ও থিমে প্রতি বছরই এখানে পূজা উদযাপিত হয়। পাশাপাশি মঞ্চ ও অন্যান্য সাজসজ্জায় আনা হয় নতুনত্ব। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

শনিবার রাত ও গতকাল রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ওই পূজামণ্ডপ এলাকায় ঘুরে উৎসবের আমেজ দেখা গেছে। লোকসমাগমও দেখা গেছে ব্যাপক। বিকাল হতেই ভক্ত-অনুসারীদের উপচেপড়া ভিড় পূজার মাঠ ছাড়িয়ে মূল সড়ক ছাপিয়ে যায়। এতে ওই এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। তবে এতে কাউকে বিরক্ত হতে দেখা যায়নি। বরং হিন্দু সম্প্রদায় তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব যাতে শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপন করতে পারে সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হাসিমুখে যানজটসহ সাময়িক ভোগান্তি মেনে নিতে দেখা গেছে।

শনিবার সন্ধ্যায় পূজামণ্ডপের পাশ থেকে গুলশান-১-এর দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় কামাল হোসেন নামে এক পথচারীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, দুর্গাপূজার সময় তিন-চার দিন সন্ধ্যার দিকে এখানে যানজট লেগেই থাকে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে আমরা বিরক্ত হই না। এটাকে বিরক্তের কিছু মনেও করি না। হিন্দুদের প্রধান উৎসব, তারা আনন্দ করবে এটাই স্বাভাবিক।

বনানী ও গুলশান ছাড়াও ধানমন্ডি, উত্তরা এবং বিভিন্ন এলাকার বনেদি পরিবারের সদস্যরা বনানী মণ্ডপে আসেন বলে জানান পূজা উদঘাটন কমিটির সদস্যরা। পূজায় আসা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন অনেক বাসাবাড়ির সামনে গাড়ি রাখছেন। পূজার কারণে ওইসব বাড়ির নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের হাসিমুখে বরণ করে নিচ্ছেন।

তিন দিন ধরে পূজামণ্ডপের আশপাশের সড়কে যানজট হচ্ছে বলে এলাকাবাসী ও ট্রাফিক পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। ট্রাফিক পুলিশ দক্ষতার সঙ্গে যানজট সামলাচ্ছেন। এছাড়া রাত যত গভীর রাত পর্যন্ত মণ্ডপের সামনে হিন্দু সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণীরা নেচে গেয়ে উৎসব করেন।

গান গাইতে কেউ ছোট হ্যান্ডমাইকও ব্যবহার করছেন। কাউকে ছোট সাউন্ড বক্স বহন করতে দেখা গেছে। তাদের এই আনন্দ দেখতে পথচারীরাও ভিড় জমাচ্ছেন। কেউ উৎসাহ দিচ্ছেন আবার কাউকে তালি দিতে দেখা গেছে।

পূজা উপলক্ষে আশপাশের ফুটপাতে হকাররা বিভিন্ন দোকান বসিয়েছেন। রাতের বেলায় প্রচুর বিক্রি হতে দেখা গেছে। মণ্ডপের পাশেই ছোট ছোট ফাস্টফুড ও আইসক্রিমের দোকান বসানো হয়েছে। সেখানেও দেখা গেছে প্রচণ্ড ভিড়।

শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি দেখা গেছে। বাহিনীর নিজস্ব পোশাকে ও সাদা পোশাকে তাদের নজরদারি চোখে পড়ার মতো। পুলিশ, এসআরবি, বিজিবি, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সংস্থাগুলোর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সক্রিয় তারা। এছাড়া পুলিশের টহল পার্টি ছিল সক্রিয়।

পূজায় আসা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সুবল কুমার আমার দেশকে জানান, পূজা ঘিরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। আমরা নির্বিঘ্নে পূজা করছি। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত উৎসবের আমেজ রয়েছে।

তিনি বলেন, মহাষষ্ঠী গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে উদযাপন করেছি। এখন মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী ঢাকায় উদযাপন করব। আমরা অনেক আনন্দ নিয়ে এই উৎসব পালন করছি।

মণ্ডপে আসা আরেক দর্শনার্থী আশা চক্রবর্তী বলেন, ‘উৎসব মানেই ছুটি, নিজেদের মতো করে সময় কাটানো। মা দুর্গার প্রধান শিক্ষা হলো অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয় অর্জন’।

তিনি আরো বলেন, এই পূজা আমাদের শিক্ষা দেয়, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো জরুরি। আশা করি দুর্গার শিক্ষা নিয়ে দেশে দুর্নীতি, হিংসা ও বৈষম্য দূর হবে। আমাদের দেশ অসাম্প্রদায়িক। এখানে সব ধর্মের লোকজন সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করে আসছে। যারাই বৈষম্য করবে মানুষ তাদের প্রতিহত করবে।

আবির রায় নামে আরেক দর্শনার্থী জানান, বাংলাদেশে আমরা প্রত্যেক উৎসব আনন্দ নিয়ে পালন করে আসছি। মণ্ডপের ঠাকুর জানান, দুর্গাপূজা সাহস ও লড়াইয়ের প্রতীক। খুব সুন্দরভাবে পূজা উদযাপন হচ্ছে। কোনো সমস্যা হচ্ছে না। উৎসব আনন্দে পরিণত হয়েছে।

মণ্ডপের সামনে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশ জহির উদ্দিন জানান, পূজা উপলক্ষে যানজট দেখা দিয়েছে। আমরা যানজট নিরসনে কাজ করছি।

পাশে থাকা আরেক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য জানান, এটি একটি ভিআইপি পূজামণ্ডপ। গুলশান ও বনানী ছাড়াও আশপাশের সনাতন ধর্মের লোকজন আসছেন। উৎসুক লোকজনও আসছেন। এতে গাড়ির চাপ বেড়েছে।

মণ্ডপের উল্টা দিকের পাশের বাসার নিরাপত্তারক্ষী সাব্বির জানান, মণ্ডপের বাম দিকের রাস্তা খুব সরু। ডানে ও বামে দুটি গাড়ি চলতে পারে। অনেকেই বাসার সামনে গাড়ি রেখে পূজা দেখতে যাচ্ছেন। আমরা তাদের সহযোগিতা করছি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন