সংসদীয় আসনে অপ্রতুল বরাদ্দ, এমপিদের চাপে পড়তে পারে সরকার

গাজী শাহনেওয়াজ

সংসদীয় আসনে অপ্রতুল বরাদ্দ, এমপিদের চাপে পড়তে পারে সরকার

তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়নের গতি সচল রাখতে এবং স্থানীয় জনগণকে সহায়তার জন্য দেশের ২৮০টি সংসদীয় আসনে অর্থ ও খাদ্যশস্য বরাদ্দ দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। তবে এই বরাদ্দকে অপ্রতুল দাবি করেছেন অসন্তুষ্ট আইনপ্রণেতারা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, চলতি অধিবেশনে এ নিয়ে সংসদ সদস্যদের চাপের মুখে পড়তে পারে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন এলাকার আসন ছাড়া অন্য আসনগুলোয় বিশেষ এ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মেয়র বা সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকদের মাধ্যমে শহরের অবকাঠামো উন্নয়নসহ সব ধরনের কাজ সম্পাদন করায় সংশ্লিষ্ট আসনগুলোয় এ বরাদ্দ রাখা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, ২৮০টি সংসদীয় আসনের প্রতিটির জন্য এককালীন ৫৫ লাখ টাকা এবং ২০০ টন খাদ্যশস্য (চাল বা গম) বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। আইনপ্রণেতাদের অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও চাহিদার তুলনায় এই বরাদ্দ অপ্রতুল। অনেকেই একে ‘নামমাত্র বরাদ্দ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

এদিকে, চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মন্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তার মৌখিক সম্মতি নিয়ে বরাদ্দ প্রস্তাবে কিছুটা কাটছাঁট করে প্রতিটি সংসদীয় আসনের বিপরীতে ২৫ লাখ টাকা এবং ২০ লাখ টন চাল/গম ছাড় করা হয়। পরে আরেক দফা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেটা খুব বেশি নয় বলে জানা গেছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, সংসদ সদস্যদের অনুকূলে নগদ অর্থ ও খাদ্যসামগ্রী বরাদ্দের প্রথম দফা বিলিবণ্টন করা হয়েছে। এই বরাদ্দ সংসদ সদস্যরা প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কাজে ব্যয় করতে পারবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, প্রতিটি সংসদীয় আসনের জন্য এককালীন ৫৫ লাখ টাকা এবং ২০০ টন খাদ্যশস্য (চাল বা গম) বরাদ্দ দেওয়ার জন্য প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছিল। হঠাৎ মন্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার মৌখিক সম্মতিতে বরাদ্দ কমিয়ে প্রথম ধাপে কিছু অর্থ ছাড় করা হয়। পরে আরেক দফা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ধাপে ধাপে আরো কিছু বরাদ্দ দেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ অর্থ মূলত স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। এর মধ্যে ধর্মীয় উপাসনালয়, মসজিদ ও ঈদগাহ নির্মাণ বা সংস্কার, কবরস্থান ও শ্মশান মেরামত, গ্রামীণ সড়কে ইট বসানোসহ ছোটখাটো উন্নয়নমূলক কাজ অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষের সহায়তায় ব্যবহার করা হবে খাদ্যসামগ্রী।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মাথায় এলাকার উন্নয়নে এটি ছিল প্রথম বরাদ্দ। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদের ভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার শপথ নেয়। সংসদ অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছে, এ বরাদ্দ বাস্তবতার তুলনায় খুবই সীমিত। তাদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে নির্মাণসামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় উন্নয়ন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এ অর্থ দিয়ে কার্যকর উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, একটি উপজেলায় যদি ১০-১২টি ইউনিয়ন থাকে, তাহলে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য গড়ে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা দিয়ে একটি ছোট কালভার্ট নির্মাণ বা সংস্কার করাও সম্ভব নয়।

এদিকে বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এর পাশাপাশি সরকার ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করায় উন্নয়ন বরাদ্দ সীমিত রাখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কম বরাদ্দের কারণে সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় প্রত্যাশিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করতে না পারলে জনঅসন্তোষ বাড়তে পারে। এর প্রভাব সংসদেও পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাজেট অধিবেশন বা অন্যান্য অধিবেশনে ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’-এ এমপিরা বিষয়টি উত্থাপন করতে পারেন।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতের আমির ও সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, সব আসনের ভৌগোলিক পরিস্থিতি এক নয়। কোথাও ইউনিয়নের সংখ্যা বেশি, কোথাও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ বেশি। সে তুলনায় এ বরাদ্দ যথেষ্ট নয়।

তবে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেন। আমার দেশকে তিনি বলেন, বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় এ বরাদ্দকে একেবারে অপ্রতুলও বলা যায় না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন বাজেট অধিবেশনের পর বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো হতে পারে।

অন্যদিকে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল আলীম আমার দেশকে বলেন, সংসদ সদস্যদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা সমীচীন নয়। তারা তো উপজেলায় উপদেষ্টা হিসেবে থাকেন। তাই তাদের অনুকূলে কোনো বরাদ্দ রাখার প্রয়োজন নেই। সংসদ সদস্যদের প্রধান দায়িত্ব আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখা। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা প্রশাসনের কাজ। তারা সুপারভিশন কর্তৃপক্ষ হয়ে কাজগুলো তদারক করতে পারেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, প্রতি বছর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ এবং দুর্যোগসহ নানা সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকার থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। রাজনৈতিক সরকার এ বরাদ্দ থেকে অর্ধেক অর্থাৎ ৯০০ কোটি টাকা সংসদ সদস্যদের নামে থোক বরাদ্দ হিসেবে কর্তন করে রাখে।

এই থোক বরাদ্দ সব সংসদ সদস্যের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করার কথা। তবে অভিযোগ রয়েছে, যেসব সংসদ সদস্য প্রভাবশালী এবং যারা মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ করতে পারেন, তারাই চাহিদার অতিরিক্ত বরাদ্দ নিয়ে যেতে পারেন। ফলে যেসব সংসদ সদস্য প্রভাবশালী নন কিংবা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-সচিবকে ম্যানেজ করতে ব্যর্থ হন, তারা এই থোক বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হন। এর ফলে সারা দেশের নির্বাচনি এলাকার উন্নয়নে বড় ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হয়।

এসব অনিয়ম ও নানা দুর্নীতির কারণে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে সংসদ সদস্যদের জন্য থোক বরাদ্দ রাখার বিধান বাতিল করে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছিল। এ নীতিমালার আলোকে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদে কোনো থোক বরাদ্দ রাখেনি। এমনকি প্রতি বছরের যে এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, দুর্যোগ মন্ত্রণালয় তার পুরোটাই সংসদীয় আসনগুলোর উন্নয়নে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) মধ্যে বরাদ্দ দিয়েছিল।

দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, থোক বরাদ্দ না থাকলে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবদের ক্ষমতা কমে যায়। সংসদ সদস্যরা এসে তাদের তোয়াজ-খাতির করবেন না। এসব নানা দিক বিবেচনা করে ও নানা অজুহাতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের এ নীতিমালা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে অতীতের রেওয়াজ অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেলে সেখান থেকে ৯০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ হিসেবে কর্তন করে রাখার বিষয়টি প্রায় পাকাপোক্ত হয়ে গেছে। ফলে থোক বরাদ্দটির সঠিক ব্যবহার না হওয়ার আশঙ্কা করছেন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন