দেশের ৮৭ হাজার গ্রামে গতিশীল ইন্টারনেট সেবা প্রদানসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তথ্য ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ফাইবার লাইন আন্ডারগ্রাউন্ডে স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে বিভিন্ন টানাপোড়েনে আটকে আছে প্রকল্পটির অগ্রগতি। বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংক ইতঃপূর্বে এ-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০২২ সালে প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয় ‘টাইগার প্রজেক্ট’। পরে এটি পরিবর্তন করে নতুন নাম দেওয়া হয় ‘ডি-স্টার’ বা ‘ডিজিটাল স্টার’ প্রকল্প। এ প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ ধরা হয় ৩০০ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা।
প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করে। প্রকল্পের উপস্থাপনায় প্রথম সারাংশে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিতে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে ইন্টারনেট সংযোগের বিকল্প নেই। দেশের ইউনিয়ন পর্যায়ে ও গ্রামভিত্তিক ফাইবার ক্যানেক্টিভিটি করা গেলে সারা দেশ ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরিত হবে। তখন গ্রাম পর্যায়ের মানুষ এ সেবার আওতায় আসবে। আরো বলা হয়েছে, গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা পেলে প্রযুক্তির ব্যবহারে তারা আরো দক্ষ হবে। প্রজেক্টে ওয়াইফাই, রেডিও কমিউনিকেশন ও স্যাটেলাইট সংযুক্ত হবে।
তবে সরকার যখন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে, তখন মাঠ পর্যায়ে দ্বিমুখী দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ ঠান্ডা লড়াইয়ে জড়ায় মোবাইল অপারেটর ও ফাইবার ব্যবসায়ীরা। মোবাইল অপারেটররা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে, সরাসরি ফাইবার সংযোগ না দিয়ে দেশের প্রত্যেক টাওয়ারে স্পেকট্রাম (তরঙ্গ) সরবরাহ করলে ঝুট-ঝামেলা ছাড়া সেবার পরিধি আরো বাড়বে। অন্যদিকে ফাইবার ব্যবসায়ীরা বলছেন, যেহেতু গ্রাম পর্যায়ের ক্যানেক্টিভিটি তৈরির জন্য এ প্রকল্প, সেহেতু সারা দেশের ইউনিয়ন পর্যায়ে ফাইবার লাইন সংযোগ দেওয়া হলে প্রকল্প মানসম্মত হবে। দ্বিমুখী এ দ্বন্দ্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি আটকে আছে। প্রকল্পের সুবিধাভোগী হওয়ার দ্বিমুখী দ্বন্দ্বে একনেকে ফাইলটি পাস হয়নি। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই অব্যাহত আছে। তবে এর নিয়ন্ত্রণ নিতে দুপক্ষই চেষ্টা চালাচ্ছে।
ফাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পের সুফল পেতে গেলে ফাইবার লাইন মাটির নিচ দিয়ে নেওয়া সবচেয়ে ভালো হবে।
এ বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের কাছে গত মঙ্গলবার মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। মেসেজ পাঠালেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
টেলিকম বিশেষজ্ঞ নুরুল কবীর আমার দেশকে জানান, ফাইবার লাইন আন্ডারগ্রাউন্ড দিয়ে গেলে ভালো হয়। কারণ, পিলার দিয়ে লাইন গেলে বিভিন্ন দুযোর্গে ফাইবারের তার ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা আমার দেশকে জানান, প্রকল্পের চিঠি চালাচালি হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ নিজেদের পক্ষে নেওয়ার জন্য তদবির করছে দুপক্ষই। বিষয়টি ঝুলে আছে।
টেলিকমভিত্তিক একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার মাঠ পর্যায়ে হোল্ড স্টাডি করতে থাকে। ইনফো সরকারের আওতায় চার হাজার ৫৭২টি ইউনিয়নকে এ ক্যানেক্টিভিটিতে সংযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে সারা দেশের ৮৭ হাজার গ্রামকে এ প্রকল্পের আওতায় আনা হবে।
জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রকল্পটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তা নিয়ে একাধিক আলোচনা করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ফাইবার লাইন যাবে মাটির তল দিয়ে।
সূত্র জানায়, পিলারের মাধ্যমে ফাইবার লাইন গেলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে তার ছিঁড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের তার, টিঅ্যান্ডটি টেলিফোনের তার ও ইন্টারনেটের তার একাকার হয়ে জঞ্জাল দেখা দিয়েছে। নতুন করে তারের সংযোগ দিলে এ জঞ্জালের মাত্রা বাড়বে। এছাড়াও এখানে দুর্নীতির সুযোগ থাকবে। অতীতে দেখা গেছে, ফাইবার ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সংযোগ দিয়ে সরকারকে বলেছেন, পুরো জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে ফাইবার সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ফাইবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে উঁচু ভবনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সে হারে টাওয়ার বাড়েনি। পর্যাপ্ত তরঙ্গ না থাকার কারণে মোবাইলে কলড্রপ বাড়ছে। ইন্টারনেট সেবায়ও ভোগান্তি বাড়ছে। এজন্য সরাসরি ফাইবার সংযোগের বিকল্প নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



রিজার্ভ চুরিতে জড়িত আতিউরসহ ৬৪ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান