চীনের অর্থনৈতিক পতন নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরে নানা পূর্বাভাস দেওয়া হলেও দেশটি বরং অর্থনীতি, শিল্প ও প্রযুক্তিতে নিজেদের অবস্থান আরো শক্ত করেছে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে চীন। এমনটাই মনে করছেন দ্য গার্ডিয়ানের কলামিস্ট ল্যারি এলিয়ট।
সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে এলিয়ট বলেন, অতিরিক্ত বিনিয়োগ, বিপুল ঋণ, আবাসন খাতের সংকট, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও জনসংখ্যাগত সমস্যাকে চীনের সম্ভাব্য পতনের কারণ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এসব পূর্বাভাস সত্ত্বেও চীন বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে এবং উৎপাদন ও প্রযুক্তিতে বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
চীনের অর্থনৈতিক উত্থানকে মোটামুটি তিনটি পর্যায়ে দেখা যায়। প্রথম পর্যায়ে দেশটি কম খরচে পণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। সস্তা শ্রমের সুবিধা কাজে লাগিয়ে চীন দ্রুত বিশ্বের বড় উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়।
এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়। চীন শুধু সস্তা পণ্য উৎপাদনে আটকে না থেকে উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পে বড় বিনিয়োগ শুরু করে। সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে দেশটি বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করে। এমনকি যেসব যন্ত্রপাতির জন্য আগে জার্মানিসহ উন্নত দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে হতো, সেগুলোর অনেক কিছুই এখন চীন নিজেই তৈরি করতে সক্ষম।
চীনের এই শিল্পনীতির তৃতীয় পর্যায় হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটি ‘চীন ৩.০’। এ পর্যায়ে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআই প্রযুক্তিতে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে চীনা স্টার্টআপ মুনশটের তৈরি ‘কিমি কে৩’ এআই মডেল। জুলাইয়ে মডেলটি উন্মোচনের পর মাত্র দুই দিনের মধ্যে এত বেশি ব্যবহারকারীর চাপ তৈরি হয় যে প্রতিষ্ঠানটি নতুন সাবস্ক্রিপশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। কিমি কে৩-কে মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বী মডেলগুলোর সঙ্গে সক্ষমতায় প্রতিযোগিতামূলক এবং বিনামূল্যে ব্যবহারের উপযোগী হিসেবে বাজারজাত করা হয়েছে।
এ ধরনের সস্তা বা বিনামূল্যের এআই মডেল যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এআই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগের অন্যতম ভিত্তি হলো ভবিষ্যতে এসব প্রযুক্তি থেকে বড় মুনাফা অর্জনের প্রত্যাশা। কিন্তু চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তুলনামূলক কম খরচে একই ধরনের সক্ষমতার মডেল তৈরি করে বিনামূল্যে বা কম দামে বাজারে দিতে পারে, তাহলে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর উচ্চ মূল্যায়ন নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
তবে চীনের অর্থনীতির দুর্বলতাও রয়েছে। দেশটির অর্থনীতি এখনো অতিরিক্ত বিনিয়োগ ও অতিরিক্ত উৎপাদনের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। অভ্যন্তরীণ চাহিদা তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় চীনকে উৎপাদিত অতিরিক্ত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করতে হয়। এ কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সমালোচনার মুখেও পড়ছে।
চীনের সাফল্যের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এলিয়ট। তার মতে, প্রায় পাঁচ দশক আগে চীন যখন উৎপাদনশিল্প শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেয়, তখন দেশটি নিজের উন্নয়নশীল অবস্থান সম্পর্কে বাস্তবতা বুঝেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং সেটি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করে।
সরকার ভর্তুকি, শুল্ক, মুদ্রানীতি, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগসহ বিভিন্ন হাতিয়ার ব্যবহার করেছে। কোনো নির্দিষ্ট শিল্পকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে সেখানে রাষ্ট্রীয় সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও চীন পিছপা হয়নি। এর ফলে সস্তা পণ্যের উৎপাদক থেকে দেশটি ধীরে ধীরে উচ্চপ্রযুক্তি ও ব্যাপক শিল্প উৎপাদনের শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
এই নীতির সঙ্গে যুক্তরাজ্যের শিল্পনীতির তুলনা করলে দেখা যায়- ব্রিটেন গত কয়েক দশকে শিল্প পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে চীনের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক পরিকল্পনা নিতে পারেনি। চীনের অভিজ্ঞতা থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর শিল্প ও প্রযুক্তিনীতি নিয়ে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এদিকে চীনের এআই অগ্রগতি নিয়ে শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিমি কে৩সহ চীনা এআই মডেলের অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে চীনা ‘ওপেন-ওয়েট’ মডেলগুলোর কম খরচ ও সহজলভ্যতা বৈশ্বিক এআই বাজারের ব্যবসায়িক কাঠামোকেও চ্যালেঞ্জ করছে।
ফলে—চীনের পতনের যে পূর্বাভাস পশ্চিমা বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া হচ্ছিল, তা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। বরং উৎপাদনশিল্পের পর উচ্চপ্রযুক্তি এবং এখন এআইয়ের দৌড়ে চীন নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। তবে দেশটির অর্থনৈতিক দুর্বলতাগুলো কতটা মোকাবিলা করতে পারে এবং এআই প্রতিযোগিতায় কতটা এগোতে পারে, সেটিই ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

