বগুড়ায় গড়ে ওঠা মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র বা রিহ্যাব সেন্টারগুলোতে চলছে চরম স্বেচ্ছাচারিতা। মানহীন চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রগুলোর একটি বড় সমস্যা। দক্ষ চিকিৎসক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছাড়াই চলছে তাদের কর্মকাণ্ড।
বৈধ বলে যে ১৯টি রিহ্যাব সেন্টার রয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্রেও অনুসরণ করা হয়নি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিধিবিধান। পাশাপাশি গড়ে উঠেছে অনুমোদনহীন মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র। এদের সংখ্যাও প্রায় বৈধের সমান। এগুলোতে চিকিৎসাসেবার ছিটাফোঁটাও দেওয়া হয় না। অথচ মাস শেষে গুনতে হয় বড় অঙ্কের টাকা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় এ অনিয়মের ডালপালা মেলেছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
প্রাপ্ত সরকারি তথ্য মতে, বগুড়ায় মাত্র ১৯টি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র আছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাবমতে, বগুড়া মাদক নিরাময় কেন্দ্র, বগুড়া কমিউনিটি পুলিশিং মাদকসেবী নিরাময় কেন্দ্র, মাদকাসক্তি পুনর্বাসন উদ্যোগ (আইআরএ), রান রিহ্যাব মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র, নতুন সূর্যোদয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, সেফ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, আদর্শ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, সেফ প্লাস মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, রেনেসাঁ রিহ্যাব মাদকাসক্ত পুনর্বাসন পদক্ষেপ, চেঞ্জ দ্য লাইফ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, বগুড়া রিহ্যাব সেন্টার মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, সুজন মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, আস্থা মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, টিএমএসএস রিহ্যাব সেন্টার, নিউ ওয়ার্ল্ড মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, সৃষ্টি সান্তাহার মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, সুপথ প্লাস মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, বগুড়া সেফহোম মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, মায়ের আশ্রয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে।
বৈধ কাগজপত্রের বাইরে রয়েছে- বনানী বাইপাসে সিডার মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, রিয়্যাল লাইফ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, সুপথ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, বগুড়া স্টেশন রোডে রয়েছে মানসিক ও মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র ছাড়াও আরো কয়েকটি ।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বগুড়ায় যে ১৯টি কেন্দ্র রয়েছে, তাদের অধিকাংশই অনুমোদিত আসনের বাইরে মাদকাসক্তদের রাখছে। তাদের একরকম আবদ্ধ করেই রাখা হয়। এসব কেন্দ্রগুলোতে মাদকাসক্তদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য নেই চিকিৎসক ও পরিচর্যাকারী। শুধু তিন বেলা খাবার ও ঘুমের ওষুধই তাদের একমাত্র ভরসা। মাস গেলেই তাদের গুনতে হয় সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা। একজন রোগীকে সর্বনিম্ন তিন মাস রাখা হয়। হাতেগোনা দুয়েকটি বাদে সবকটির অবস্থা একই রকম।
রোগীর আত্মীয়স্বজনদের অভিযোগ, বাইরের কাউকে কোনোভাবেই ঢুকতে দেওয়া হয় না। কারো সঙ্গে কথা বলা তো দূরের কথা ডেকেও পাওয়া যায় না। শুধু ফর্মে উল্লিখিত অভিভাবক ব্যতীত কারো প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ।
বগুড়া মাদকাসক্ত রিহ্যাব সেন্টার মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলমের রেনেসাঁ রিহ্যাব সেন্টার সরকারি কাগজকলমে বগুড়া শহরের খান্দারে থাকলেও সেটি তিনমাথা রেলগেটে স্থানান্তর করা হয়েছে। তিনি বলেন, বগুড়ায় ১৯টি বৈধ কেন্দ্র থাকলেও বেশ কয়েকটি অবৈধ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। আমাদের সংগঠনের সদস্যসংখ্যা মাত্র ১৪ জন। অন্যদিকে দত্তবাড়িতে কমিউনিটি রিহ্যাব সেন্টার এতদিন চালু থাকলেও এখন অবস্থা নাজুক। বর্তমানে এর পরিচালক তরুণ চক্রবর্তী পলাতক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানিয়েছেন, চিকিৎসা মানের সংকট কেন্দ্রগুলোর একটি বড় সমস্যা। বছরের পর বছর দক্ষ চিকিৎসক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছাড়াই চলছে তাদের কর্মকাণ্ড। তিনি বলেন, অনেক কেন্দ্রে অতিরিক্ত ফি নেওয়া ও হয়রানিরও অভিযোগ শোনা যায়। এছাড়াও রোগীদের নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হয়। শুধু লাভের আশায় গাদাগাদি করে অনেক বেশি রোগী রাখা হয়। রোগীদের জোরপূর্বক আটক, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, যা মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলছে।
সিরাজগঞ্জ থেকে আসা সুরুজ মিয়া, গাইবান্ধা ভরতখালী থেকে আসা রানা জানান, তার আত্মীয়দের দুই মাস ধরে রাখা হয়েছে। তবে তাদের কোনো উন্নতি হয়নি। কী চিকিৎসা করা হয়, তার ব্যবস্থাপত্রও দেখানো হয় না। শুধু তিন বেলা খাবার আর ঘরে আবদ্ধ করে রাখার কথা জানিয়েছে মাদকাসক্তরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

