শরীয়তপুরে দীর্ঘ দুইবছর পাঁচ মাস পর আলোচিত পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী হৃদয় খান নিবিড় হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। এছাড়াও এ মামলায় আরো এক আসামিকে ২১ বছরের আটকাদেশ দেয়া হয়। এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে নিবিড়ের পরিবার। তবে রায়ে সঠিক বিচার মেলেনি উল্লেখ করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী।
মঙ্গলবার দুপুরে রায় ঘোষণা করেন শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দু্ই আসামি হলেন, শাকিল হোসেন গাজী (১৯) ও সিয়াম হোসেন (২০)। আরেক ১৬ বছর বয়সি কিশোর আসামিকে ১০ বছরের আটকাদেশ দেয়া হয়েছে।
আদালত সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ১ আগস্ট বিকেলে খেলাধুলার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় সদর উপজেলার ডোমসার ইউনিয়নের খিলগাঁও এলাকার প্রবাসী মনির খান ও নিপা আক্তার দম্পত্তির ছেলে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী হৃদয় খান নিবিড়। সেদিন সন্ধ্যার নিবিড়ের মা নিপা আক্তারের ফোনে কল করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। বিষয়টি পুলিশকে জানালে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় সদর উপজেলার খিলগাঁও এলাকার শাকিল হোসেন গাজী, পাবনার সিংঙ্গা এলাকার সিয়াম হোসেন ও খিলগাঁও এলাকার ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরকে আটক করে।
পরে তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন সকালে বাড়ির অদূরে পরিত্যক্ত জমি থেকে উদ্ধার করা হয় নিবিড়ের মাটিচাপা দেওয়া লাশ। এ ঘটনায় নিহতের দাদা মমিন আলী খান বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করলে শরীয়তপুর চিফ জুডিশিয়াল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় মামলায় আটক আসামিরা।
মামলাটি প্রথমে পালং মডেল থানার এক কর্মকর্তা তদন্ত করেন। এরপর ওই মামলাটি পিবিআই তদন্ত করে ২০২৪ সালের ১ জুন আদালতে অভিযোগপত্র দায়ের করেন। দীর্ঘ দুই বছর পাঁচ মাস পর ২১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে মঙ্গলবার দুপুরে শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান অভিযুক্ত শাকিল হোসেন গাজী ও সিয়াম হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড ও আরেক ১৬ বছর বয়সী কিশোর আসামীকে ২১ বছরের আটকাদেশের রায় ঘোষণা করেন। এদিকে আসামিদের আজলাস থেকে পুলিশি হেফাজতে নেয়ার সময় বিক্ষুব্ধ জনতা হামলার চেষ্টা চালালে পুলিশ কোনমতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
হৃদয় খান নিবিড়ের বাবা মনির হোসেন খান বলেন, আমি দীর্ঘদিন প্রবাসী ছিলাম। হত্যাকারীরা আমার ছেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে। মুক্তিপণ দেয়ার আগে তারা আমার ছেলেকে হত্যা করে মাটি চাপা দিয়ে রাখে। পরে পুলিশ তদন্ত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনে। দীর্ঘ দুই বছর পাঁচ মাস পর আমার ছেলের হত্যার রায় আজকে দেওয়া হয়েছে। দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এতে আমরা খুশি। তবে আমাদের দাবি অতি দ্রুত যেন এই রায় কার্যকর করা হয়।
নিবিড়ে মা নিপা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ফুলের মত শিশু ছিলো। ওকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে আমি কখনই মানতে পারিনি। আমার ছেলেকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে অপরাধীদের যেন সেভাবে দ্রুত ফাঁসি দেয়া হয়। আর যাকে আটকাদেশ দেয়া হয়েছে তার ব্যাপারে আমরা সন্তুষ্ট নই, তাকেও ফাঁসি দেয়া হোক।
বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান রোকন বলেন, আজকে আদালতে যেই ফাঁসির রায় দিয়েছে এতে আমার মক্কেল তার সঠিক রায় পেয়েছে। তবে যাকে আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে তার ব্যাপারে বাদী পক্ষের সাথে কথা বলে আপিল করার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
তবে রায়ে সঠিক বিচার পায়নি আসামিপক্ষ এমন দাবি করে উচ্চ আদালতে আপিলের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইসতিয়াক আহম্মেদ বলেন, এই মামলার প্রতিটি পদে পদে ডিস্ট্রয় করা হয়েছে, প্রতিটি এফিডেন্স টেম্পারিং করা হয়েছে। এখানে যেই মাডারের উইপনগুলো ছিলো তা উদ্ধার করা হয়নি। তাছাড়া যেই বালিশ কাপড়চোপড় উদ্ধার করা হয়েছে তা ডিএনএ টেস্ট করা হয়নি। এমনকি আমার প্রধান আসামির মোবাইল নাম্বার বায়োমেট্রিক করা হয়নি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি রায়ের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে আপিলে যাবো।
এদিকে আদালতের রায়কে সাধুবাদ জানিয়ে দ্রুত রায় কার্যকর করার দাবী জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। এ ব্যাপারে শরীয়তপুর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল) কামরুল হাসান বলেন, বাদীর এজাহার, সাক্ষীদের সাক্ষী ও আসামিদের স্বীকারোক্তি হুবহু মিল থাকায় মহামান্য আদালত দুইজনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও একজনের ২১ বছরের আটকাদেশ দেয়া হয়েছে। আদালত এই রায়ের মাধ্যমে বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে। অতি দ্রুত এই রায় কার্যকর করা হলে কোনো আসামি আর এ ধরনের অপরাধ করতে পারবে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

