আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

পুলিশ ও দলীয় ছত্রছায়ায় কেরানীগঞ্জে মাটি চুরি

রাকিব হোসেন, ঢাকা জেলা

পুলিশ ও দলীয় ছত্রছায়ায় কেরানীগঞ্জে মাটি চুরি

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে স্থানীয় থানা পুলিশ ও বিএনপি নেতাদের ছত্রছায়ায় ফসলি ও সরকারি জমির মাটি ইটভাটায় বিক্রি করছে একাধিক সংঘবদ্ধচক্র। এর পরিমাণ প্রতি রাতে তিন শতাধিক মাহেন্দ্রা ট্রাক। ট্রাকপ্রতি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা রাজনৈতিক দলের নেতা, ১০০ টাকা পুলিশ, ৫০ টাকা করে সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যরা নেন। এ নিয়ে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি, ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে। মাটি বহনকারী ট্রলি, ট্রাক ও ডাম্পারের দাপটে ভাঙছে রাস্তাঘাট।

বিজ্ঞাপন

এলাকাবাসী জানায়, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মাজহারুল ইসলাম, বিএনপির ঢাকা জেলা শাখা সাধারণ সম্পাদক, তেঘরিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক খোরশেদ জমিদার, সদস্য সচিব শামিউল্লাহ ও ছাত্রদল নেতা পাভেল মোল্লার নেতৃত্বে একটি সঙ্ঘবদ্ধচক্র এই মাটি চুরির সঙ্গে জড়িত। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া ইউনিয়নের মুজাহিদ নগর পূর্বদি, পশ্চিমদি, আড়াকুলের ২০ ফুট রাস্তার শেষে এবং কোন্ডা ইউনিয়নের মঠবাড়ি এলাকায় চলছে এই চুরি।

প্রতিদিন প্রায় অর্ধ শতাধিক সন্ত্রাসীর পাহারায় শ্রমিক দিয়ে ভেকুর সাহায্যে মাটি কেটে ট্রাকে ভরে ইটভাটায় নিয়ে যায়। প্রতি ট্রাকের মাটি সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকায় বিক্রি করা হয় । বিক্রীত টাকার ট্রাক প্রতি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা উক্ত রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক, ১০০ টাকা কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, ৫০ টাকা করে পান ইউনিয়ন বিএনপি নেতা খোরশেদ জমিদার,সামিউল্লাহ ও পাভেল মোল্লাসহ মাটি বিক্রির ৫০ সদস্যের সিন্ডিকেট। বিক্রীত মাটির পরিমাণ প্রতি রাতে তিন শতাধিক মাহেন্দ্রা ট্রাক।

তেঘরিয়া মোতালেব জানায়, কদিন আগে পূর্বদি এলাকায় মাটি কাটতে গিয়ে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে । পরে জুয়েল মোল্লা ও মোল্লা গ্রুপের আরেকটি অংশ মিলেমিশে একসঙ্গে মাটি কাটা শুরু করে। ঢাকা জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক জুয়েল মোল্লার নেতৃত্বে তেঘরিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি আবির মোল্লা, ওয়ার্ড যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম অনিকের নেতৃত্বে রয়েছে আরো একটি চোরের গ্রুপ।

অন্যদিকে পশ্চিম আড়াকুলের ২০ ফুট রাস্তার শেষে মাটি চুরি করছে ঢাকা জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক জুয়েল মোল্লা, তেঘরিয়া ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বুলু মেম্বার, ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য ইস্রাফিল মিয়া, তেঘরিয়া ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সভাপতি সেন্টু মিয়ার সিন্ডিকেট।

কোন্ডা ইউনিয়নে রাতের আঁধারে অবৈধ মাটি কাটা ও মাটি চুরির মূল হোতা ঢাকা জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক জুয়েল মেম্বার। তার নেতৃত্বে রয়েছে, মাসুদ রানা, হাতিম ডাকাত, দিলু ডাকাত, ঝুনু ডাকাত, আমান ও সেলিমসহ ১২ থেকে ১৫ সদস্যের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ। এই সন্ত্রাসী গ্রুপ অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ফসলি জমি ও সরকারি জমির মাটি কেটে নিচ্ছে। এছাড়া একই ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও এলাকার শহিদ, পারভেজ সাইদ, রনি ও শামীম ওরফে ইয়াবা শামিম মাটি চুরির সঙ্গে জড়িত রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের একশ্রেণির কর্মকর্তাকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে এসব অবৈধ মাটি বাণিজ্য করা হচ্ছে। ওসি নিয়মিত মাটি চোরদের কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছে গাড়িপ্রতি ১০০ টাকা করে । এজন্য থানায় মাটি চোরদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করতে এলে থানা থেকে বলে দেওয়া হয় মাটি চুরির বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেখবেন।

কেরানীগঞ্জ রাজস্ব সার্কেল (দক্ষিণ) সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, তিন ফসলি বা যে কোনো আবাদী জমির উপরি ভাগের (টপ সয়েল) বা মাটি বিক্রি কিংবা মাটি কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

তিনি বলেন, অবৈধ মাটি কাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময় ফসলি জমির মাটি কাটার অপরাধে দুই জনকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং অভিযানে ৪টি ট্রাক আটক করা হয়েছে। কৃষি জমি রক্ষায় উপজেলা প্রশাসনের এমন অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এ ব্যাপারে তেঘরিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক খোরশেদ জমিদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজে এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয়, বলে দাবি করেন। তার নাম ব্যবহার করে কেউ রাতের আঁধারে মাটি কাটতে পারে বলে জানান।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে বলেন, মাটি চোরদের ধরার জন্য মাঝে-মধ্যেই অভিযান পরিচালনা করা হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন