নিম্ন আয়ের মানুষের বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় সাভারের ৫০ শয্যার বাংলাদেশ-কোরিয়া মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল। তবে এখন নানা সংকটে ধুঁকছে এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। জনবল ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে এখানে দালালদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের টেবিল-চেয়ারে বসে নিজেদের পছন্দের ক্লিনিকে রোগী পাঠান তারা।
সাভারের আশুলিয়ার জিরানী বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন হাসপাতালটিতে বর্তমানে ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ। একসময় ১২ জন চিকিৎসক থাকলেও এখন কর্মরত আছেন পাঁচজন। প্যাথলজি, এক্স-রে, ইসিজিসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। জনবলের সংকটে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে চিকিৎসা সরঞ্জাম। অভিযোগ রয়েছে, দুই বছর ধরে সরকারি ওষুধের সরবরাহও বন্ধ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের মূল ফটক ও আশপাশের প্রায় ১০০ গজের মধ্যে গড়ে উঠেছে একাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। প্রতিদিন সকাল থেকেই এসব প্রতিষ্ঠানের ২০-২৫ জনের একটি দালালচক্র হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও মূল ফটকের আশপাশে অবস্থান নেয়। রোগীরা টিকিট কেটে বের হওয়ার পর তাদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে বাইরের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, দালালেরা চিকিৎসকদের পেছনে অবস্থান করে এক্স-রে ফিল্ম ও পরীক্ষার রিপোর্ট দেখেন এবং রোগীদের চিকিৎসা ও ওষুধের বিষয়ে পরামর্শ দেন। এমনকি কমিশনের ভিত্তিতে রোগীদের নির্দিষ্ট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়ভাবে নিউ সেবা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আয়েশা হাসপাতাল, নাসির উদ্দিন ক্লিনিক, জাহানারা ক্লিনিক ও গাজী ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দালালদের সক্রিয় থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী জানান, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও লোকবলের অভাবে পরীক্ষা ও ছোটখাটো অস্ত্রোপচারের সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে বাইরের ক্লিনিকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।
এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ-কোরিয়া মৈত্রী হাসপাতালের ট্রেজারার নার্গিস আক্তারের রয়েছে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ‘আয়েশা ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নামে সেন্টারটি পরিচালনা করেন তার স্বামী ও শিমুলিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ইয়ার হোসেন। এছাড়া হাসপাতালে প্রজেক্ট চলাকালীন নিয়োগপ্রাপ্ত ফ্রিল্যান্সার কর্মীদের বিরুদ্ধেও রোগীদের নির্দিষ্ট ক্লিনিকে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমে ক্যামেরার সামনে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি ট্রেজারার নার্গিস আক্তার। তবে পরে তিনি দাবি করেন, হাসপাতালটি তার স্বামীর নামে করেছেন, তার নামে নয়।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ডা. শিবলী রহমান জানান, হাসপাতালের বাজেট, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ এবং প্রকল্পের চিকিৎসা সরঞ্জাম রাজস্ব খাতে স্থানান্তর নিয়ে মন্ত্রণালয়ে আলোচনা হয়েছে। বাজেট দ্রুত ছাড় হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দালালদের দৌরাত্ম্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় হাসপাতাল চত্বরে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। নতুন বাজেটে ১০-১৫ জন আনসার সদস্য নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হবে। কর্মচারী ও নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা করেন।
বর্তমানে হাসপাতালে পাঁচজন চিকিৎসক কর্মরত থাকলেও সরেজমিনে একজন চিকিৎসককে পাওয়া গেছে। স্থায়ী স্টাফ রয়েছেন মাত্র একজন; সংযুক্তিতে আছেন পাঁচজন। তবে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

