ঘোড়াশাল সার কারখানা

প্রথম বছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও পরেরবারই ঘাটতি

শরীফ ইকবাল রাসেল, নরসিংদী

প্রথম বছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও পরেরবারই ঘাটতি

উদ্বোধনের পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে নরসিংদীর ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা। গ্যাস সংকটে ৪০ দিন উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৮৫ হাজার টন ইউরিয়া কম উৎপাদিত হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম এ কারখানাটিতে।

কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিদিন দুই হাজার আটশত টন এবং বছরে ৯ লাখ ২৪ হাজার টন ইউরিয়া সার উৎপাদনের সক্ষমতা সম্পন্ন এই কারখানাটিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন ঘাটতিতে পড়েছে কারখানাটি। গ্যাস সংকটের কারণে টানা ৪০ দিন গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় উৎপাদন নেমে দাঁড়ায় সাত লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৫ টনে। ঘাটতি দেখা দেয় প্রায় ৮৫ হাজার টন উৎপাদন ।

বিজ্ঞাপন

প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিসিআইসির আওতায় নির্মিত এই কারখানাটি ১১০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ২০২৩ সালের নভেম্বরে কারখানাটির উদ্বোধন হলেও ২০২৪ সালের ১১ মার্চ কারখানাটির বাণিজ্যিকভাবে সার উৎপাদন শুরু হয়। প্রতিদিন দুই হাজার আটশ টন এবং বছরে ৯ লাখ ২৪ হাজার টন ইউরিয়া সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে এই কারখানাটির।

কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক হাজার চারশ’ টন ইউরিয়া উৎপাদনকারী ঘোড়াশাল কারখানা এবং তিনশত টন উৎপাদনকারী পলাশ সারকারখানা বছরের পর বছর লোকসানে ছিল। সরকার দুটি কারখানাকে ভেঙে একটি কারখানা নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এতে কারখানাটির উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে প্রতিদিন দুই হাজার আটশ টনে দাঁড়ায় । এরপর থেকে সম্পূর্ণ গ্যাসনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব এই সার কারখানাটি নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন শুরু হয়।

এরই অংশ হিসেবে ঘোড়াশাল-পলাশ সারকারখানা পিএলসি নামের এই প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন শুরুর প্রথম বছরেই ২৩২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে বলে জানা যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি মালিকানাধীন দেশের পাঁচটি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে এটিই একমাত্র মুনাফা অর্জন করে।

কোম্পানির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট রাজস্ব আয় হয়েছে দুই হাজার ৬৩২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সার বিক্রি থেকে এসেছে এক হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা এবং সরকারি ভর্তুকি থেকে ৮৯৯ কোটি টাকা।

এতে আরো বলা হয়, কোম্পানির মোট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৯০১ কোটি টাকা। পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়ে পরিচালন মুনাফা হয়েছে প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা। এছাড়া এফডিআর ও অন্যান্য বিনিয়োগের সুদ থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা আয় হয়েছে। সব ব্যয় ও ঋণের সুদ পরিশোধ শেষে নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৩২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। উৎপাদন শুরুর আগের অর্থবছরে ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও ঋণের সুদ পরিশোধের কারণে প্রতিষ্ঠানটির ৩৩৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা লোকসান হয়েছিল।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান জানান, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ থাকায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। ফলে প্রথম বছরেই প্রতিষ্ঠানটি মুনাফা অর্জন করতে পেরেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ এখনো ১২ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি ঋণ ১০ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা এবং সরকারের এডিপি ঋণ এক হাজার ৭৯১ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে ঋণের সুদ ও কিস্তি বাবদ প্রায় ৪৩৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে কোম্পানিটি।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরো জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটি লাভের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কথা ছিল। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ৪০ দিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া বিদেশি ঋণের অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির ঋণ কোম্পানির নিজস্ব আয় থেকেই পরিশোধ করা হচ্ছে।

কারখানার মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং উচ্চ উৎপাদন ক্ষমতার প্রত্যাশা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সার কারখানাটিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আট লাখ ৫০ হাজার টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর বিপরীতে ৪০ দিন উৎপাদন বন্ধ থাকার পর মোট উৎপাদন হয়েছে সাত লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৫ টন ইউরিয়া।

তিনি আরো জানিয়েছেন, কারখানাটি নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালনার জন্য প্রতিদিন ৭২ এমএমসি গ্যাসের প্রয়োজন হয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে চলতি বছরের ৪ মার্চ থেকে যুদ্ধের কারণে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ১ এপ্রিল গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়। ৬ এপ্রিল থেকে আংশিক উৎপাদন ও ৯ এপ্রিল থেকে পুরোদমে কারখানায় ইউরিয়া উৎপাদন শুরু হয়। আর এ কারণেই মূলত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি।

তবে অতীতের ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে নতুন অর্থবছরে বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সারকারখানা কর্তৃপক্ষ। আগামী চলতি অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করেছেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে এবং কারখানার যন্ত্রপাতির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে নতুন লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করা সম্ভব হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন