চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুল আলিম ও উপসহকারী প্রকৌশলী আলমকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সুসংগঠিত দুর্নীতির চক্র, যা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘শালা–দুলাভাই সিন্ডিকেট’ নামে।
দূরসম্পর্কের আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকা এই দু’প্রকৌশলী আগে শিবচর উপজেলায় একসঙ্গে কর্মরত ছিলেন। গত বছরের এপ্রিলে আলিম সন্দ্বীপে বদলি হয়ে আসার পর থেকেই তিনি অনিয়ম-দুর্নীতি ঢাকতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বলয় তৈরি করেন। এ সময় অনিয়মের প্রতিবাদ করায় পূর্বের উপসহকারী প্রকৌশলী আলিকে কৌশলে সরিয়ে দেয়া হয় এবং তার স্থলে শিবচর থেকে পুরোনো সহযোগী বিশ্বস্ত আলমকে নিয়ে আসেন প্রকৌশলী আলিম।
এরপর থেকেই সন্দ্বীপে বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যাপক অর্থ আত্মসাৎ, কাজ না করেও বিল উত্তোলন, পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ বণ্টনসহ নানা অনিয়ম প্রকাশ পেতে থাকে।
প্রথমত, উপজেলা কমপ্লেক্সের ফটকে টাইলসের নামফলক ও ছয়টি এলইডি বাতি স্থাপনের ব্যয় দেখানো হয়েছে ১০ লাখ ৫৪ হাজার টাকা, যা চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের বরাদ্দ থেকে নেওয়া—যার সঙ্গে বাস্তব কাজের কোনো মিল নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। দ্বিতীয়ত, মগধরা ইউনিয়নের আকরাম খান দুলাল সড়কের নির্মাণ প্রকল্পে দেখা যায়, কাজের প্রায় ৫০ শতাংশ অসমাপ্ত থাকলেও ঠিকাদার এ আলি প্রকৌশলী আলিমের যোগসাজশে প্রকল্পের পুরো অর্থ উত্তোলন করে কাজ বন্ধ করে দেন। পরে চলতি বছরের জুনে আলিম দাবি করেন যে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রয়েছে এবং এই দেখিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মোশাররফকে দিয়ে প্রায় এক কোটি টাকার অসমাপ্ত কাজ করিয়ে নেন—যদিও মোশাররফ পরে জানান, তিনি জানতেনই না যে প্রকল্পের আগের বরাদ্দ আগেই পুরোপুরি তুলে নেয়া হয়েছে।
উপজেলা কমপ্লেক্সের পেছনে একটিমাত্র ড্রেন নির্মাণকে দু’টি পৃথক স্কিম দেখিয়ে পৌরসভা ও উপজেলা দপ্তর থেকে ৬ লাখ করে মোট ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ তুলে নেয়া হয়, যা সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করা হয়েছে। গত বছর স্থানীয় বাজেট থেকে ক্রীড়া সামগ্রী কেনার নামে বরাদ্দ ছয় লাখ টাকার পুরো অর্থই আত্মসাৎ করা হয়—আজ পর্যন্ত কোনো সামগ্রী উপজেলা ক্রীড়া সংস্থায় হস্তান্তর করা হয়নি। রহমতপুর এলাকায় সিসি ব্লক বেঞ্চ নির্মাণ দেখিয়ে আরো দু’লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। পাশাপাশি একাধিক টেন্ডারের কাজ সম্পন্ন না করেই পছন্দের ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে বিল উত্তোলনের অভিযোগও উঠে এসেছে। স্থানীয়দের মতে, ‘পছন্দের ঠিকাদার ছাড়া আলিমের কোনো কাজই হয় না—আগে ভাগ ঠিক, পরে কাজ।’
এতসব অনিয়মের পর শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী সন্দ্বীপের বাসিন্দা মোশাররফ ও গাজী হানিফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার সচিবের নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মংচিংনু মারমা আমার দেশকে বলেন, আমরা অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখছি। অভিযোগের প্রেক্ষিতে এলজিইডির চট্টগ্রাম জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি ‘আমার দেশ’-কে জানান, ‘আমরা একাধিক অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের সত্যতা পেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুল আলিম বলেন, ‘কাজ করতে গেলে অভিযোগ থাকবেই। এটা নিয়ে আমি চিন্তিত না।’
তার এই উদাসীন প্রতিক্রিয়া স্থানীয়দের ক্ষোভ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, শালা–দুলাভাই সিন্ডিকেটের লুটপাট বন্ধে অবিলম্বে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে আলিমকে সন্দ্বীপ থেকে বদলি করারও দাবি তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। এখনো পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসন কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেনি বলে জানা গেছে।

