চট্টগ্রামে বাসযাত্রায় ছিনতাই আতঙ্ক, ঝুঁকিপূর্ণ ২০ রুট

চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রামে বাসযাত্রায় ছিনতাই আতঙ্ক, ঝুঁকিপূর্ণ ২০ রুট
প্রতীকী ছবি

চট্টগ্রাম নগরীর জেলগেট থেকে লালদীঘি হয়ে কোতোয়ালি মোড়। দূরত্ব খুব বেশি নয়। কিন্তু এই অল্প পথেই রয়েছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, আদালতপাড়া, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সদর দপ্তর, কোতোয়ালি থানা, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি থাকার কথা যে করিডোরে, সেখানেই দিনদুপুরে যাত্রীবাহী বাসে সংঘবদ্ধ ছিনতাইচেষ্টার অভিযোগ। শুধু এই রুট নয়, নগরীর ২০ জায়গায় যাত্রীরা অনিরাপদবোধ করছেন।

গত শনিবার বিকালে জেলগেট এলাকায় ৬ নম্বর বাসে সাত-আটজনের একটি দল উঠে যাত্রীদের ঘিরে ধরে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ভুক্তভোগীদের দাবি, পুরো ঘটনা কয়েক মিনিট ধরে চললেও কোথাও দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি বা তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ দেখা যায়নি।

বিজ্ঞাপন

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে একই করিডোর ও আশপাশের এলাকায় বাসে ছিনতাই, গলার চেইন ধরে টান, পকেটমার ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার একাধিক অভিযোগ এসেছে। কিন্তু প্রতিবারই ঘটনা আলাদা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ফলে একই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলেও এর পেছনের সংঘবদ্ধ চক্রকে শনাক্ত করার উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি।

বিভিন্ন রুটের নিয়মিত যাত্রী, বাসচালক, হেলপার, পরিবহন মালিক ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগরীর অন্তত ২০টি বাস করিডোরে যাত্রীরা নিয়মিতভাবে ছিনতাই, পকেটমার বা হয়রানির আশঙ্কায় চলাচল করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও নগরীর নিউ মার্কেট এলাকায় চলন্ত বাস থেকে এক নারী আইনজীবীর গলার স্বর্ণের চেইন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় এক যুবক ওই আইনজীবীকে দাঁড়ানোর জন্য সাইড দিতে বলার পর সুযোগ বুঝে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীদল তার গলার চেইন ছিনিয়ে নেয়। পরে পুলিশ বাসসহ চালক ও হেলপারকে আটক করে।

জেলগেট থেকে লালদীঘি হয়ে কোতোয়ালি পর্যন্ত পুরো এলাকা মূলত কোতোয়ালি থানার মধ্যে পড়ে। তবে এ করিডোরে ট্রাফিক বিভাগ, থানা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), বিভিন্ন মোবাইল টহলদল ও পুলিশ বক্স—সব মিলিয়ে একাধিক ইউনিট দায়িত্ব পালন করে। সিএমপিতে বর্তমানে ১৬টি থানা, ৩০টির বেশি পুলিশ ফাঁড়ি ও আউট পোস্ট এবং একাধিক বিশেষায়িত ইউনিট রয়েছে।

ভুক্তভোগী যাত্রী ও ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছেন। তিনি কোতোয়ালি থানা এলাকায় টেরিবাজারে ব্যবসা করেন। জানতে চাইলে তিনি জানান, শনিবার বিকালে জেলগেটের একটু আগে ৬ নম্বর বাসে ওঠেন। তখন বাসে মাত্র চার-পাঁচজন যাত্রী ছিলেন। বাসটি আবদুল জব্বার চত্বরে পৌঁছানোর পর হঠাৎ সাত-আট যুবক একসঙ্গে বাসে ওঠে। তাদের আচরণ ছিল অস্বাভাবিক ও ভয়ভীতি সৃষ্টিকারী। এতে বাসে থাকা যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এমনকি দুই যাত্রী ভয়ে বাস থেকে নেমেও যান।

ভুক্তভোগী আরেকজন হলেন কহিনুর আক্তার। তিনি একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তিনি বলেন, ওদের আচরণ দেখে মনে হয়েছে—বাসে যার কাছেই সুযোগ পাবে, তার মোবাইল নিয়ে নেমে যাবে। পুরো সময়ে বাসের সবাই ভয়ে ছিলেন। আমি ভিডিও করার চেষ্টা করেছিলাম।

ঘটনার পর তিনি বাসচালকের কাছে জানতে চান, পরিচিত সন্ত্রাসীদের বাসে তুললেন কেন। জবাবে চালক বলেন, গাড়ি খালি থাকলে যাত্রী উঠতে চাইলে তো আমি না করতে পারি না। বাধা দিলে ওরা আমাকে ছুরি মারবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দায়িত্ব একাধিক ইউনিটের মধ্যে ভাগ হয়ে গেলে অনেক সময় ‘সবাই দায়িত্বে কিন্তু কার্যত কেউ দায় নিচ্ছে না’ এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।

ঝুঁকিপূর্ণ ২০ বাস করিডোর

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জেলগেট-লালদীঘি-কোতোয়ালি, স্টেশন রোড-নিউ মার্কেট, বহদ্দারহাট-চান্দগাঁও, বহদ্দারহাট-কালুরঘাট, মুরাদপুর-জিইসি, অক্সিজেন-দুই নম্বর গেট, টাইগারপাস-দেওয়ানহাট, আগ্রাবাদ-বাদামতলী, কর্নেলহাট-একে খান, শেরশাহ-বায়েজিদ, লালখান বাজার-ওয়াসা, অলংকার-ইপিজেড, পতেঙ্গা-নিউ মার্কেট, বহদ্দারহাট-কেরানীহাট, জিইসি-মুরাদপুর, ষোলশহর-নাসিরাবাদ, রিয়াজউদ্দিন বাজার-আন্দরকিল্লা, শাহ আমানত সেতুসংলগ্ন রুট, সিডিএ-বহদ্দারহাট এবং কদমতলী-চকবাজার করিডোরে যাত্রীদের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি রুটে অপরাধের ধরন এক নয়। কোথাও সংঘবদ্ধভাবে বাসে উঠে মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, কোথাও ভিড়ের সুযোগে পকেটমারি, কোথাও নারী যাত্রীদের হয়রানি আবার কোথাও সন্ধ্যার পর ছিনতাইয়ের ঝুঁকির অভিযোগ বেশি।

নিয়মিত যাত্রীরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের অপরাধ একই রুটে বারবার ঘটলেও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না। ছিনতাইকারীরা সাধারণ যাত্রীবেশে বাসে উঠে কয়েক মিনিটের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে অপরাধ সংঘটনের পর নেমে যায়। ভুক্তভোগীদের অনেকেই থানায় অভিযোগ করেন না। ফলে প্রকৃত অপরাধের চিত্র সরকারি নথিতে প্রতিফলিত হয় না।

কোতোয়ালি থানার ওসি আবু জায়েদ মো. নাজমুন নুর বলেন, এখন পর্যন্ত জেলগেট এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ হয়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় টহল জোরদার এবং জড়িতদের শনাক্তে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে দায়িত্ব নেওয়ার পর সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী মাদক, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক ও ছিনতাইয়ের হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেখানে শিগগির বিশেষ অভিযান চালানো হবে। চট্টগ্রামকে নিরাপদ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...