আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

যশোর শহরে নির্বিচারে ভরাট হচ্ছে জলাশয়

আহসান কবীর, যশোর

যশোর শহরে নির্বিচারে ভরাট হচ্ছে জলাশয়

যশোর শহরে বছরের পর বছর চোখের সামনেই ভরাট করা হচ্ছে পুকুরগুলো। একসময়ের প্রমত্তা ভৈরব নদ এখন কার্যত পানিশূন্য। এছাড়া নানা কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নেমে যাচ্ছে অস্বাভাবিকভাবে। ফলে কোথাও আগুন লাগলে তা নেভানো দুরূহ হয়ে যাচ্ছে।

এমন অবস্থায় অগ্নিকাণ্ডজনিত সম্ভাব্য বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় ফায়ার ব্রিগেড কর্তৃপক্ষ শহরে দুটি ভূগর্ভস্থ কৃত্রিম জলাধার নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। শহর কর্তৃপক্ষও বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ঐতিহাসিকদের মতে, ‘যশোর’-এর নামকরণ হয়েছে ‘যশোহর’ অথবা ‘জসর’ থেকে। ফার্সি ‘জসর’ শব্দের অর্থ সাঁকো। এ থেকে ঐতিহাসিকদের মত, এই জনপদে একসময় জলাশয়ের আধিক্য ছিল এবং মানুষকে সাঁকো পার হয়ে চলাচল করতে হতো।

সেই জলাকীর্ণ জনপদে ব্রিটিশ শাসকরা এখন থেকে ১৬১ বছর আগে ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে আধুনিক শহর গড়ে তোলার কাজে হাত দেন। ওই বছরের ১৩ জুলাই বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নরের ঘোষণা অনুসারে ১ আগস্ট গঠিত হয় ‘যশোর পৌর সমিতি’, পরে তা পৌরসভায় রূপান্তরিত হয়। পূর্ববাংলা বা আজকের বাংলাদেশে ব্রিটিশ শাসকদের মাধ্যমে গঠিত আধুনিক শহর ব্যবস্থাপনার সূত্রপাত হয় যশোরে।

জলাকীর্ণ জনপদ হলেও নগর গড়ে তোলার সূচনালগ্ন থেকেই যশোরে সুপেয় পানির অভাব ছিল। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া আর সুপেয় পানির অভাবে কলেরাসহ নানা রোগের প্রাদুর্ভাবে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের টিকে থাকা দায় হতো।

ইতিহাস ঘেঁটে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শরীফ হোসেনের লিখে গেছেন, ১৮৭২ থেকে ১৯১৩ সালের মধ্যে এই শহরের পাড়া-মহল্লায় পরিকল্পিত পুকুর খনন ও সংস্কার কাজ করা হয়। সেসব পুকুর বা জলাশয় দীর্ঘকাল এখানকার মানুষের প্রয়োজন মিটিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তী সময় কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে এসব জলাশয় ভরাট করা হয়েছে বিনা বাধায়। এখন শহরটিতে পুকুর বা জলাশয় খুঁজে বের করা দুষ্কর। অথচ আইনানুযায়ী, শহরাঞ্চলে ব্যক্তি মালিকানাধীন জলাশয়ও কেউ ইচ্ছামতো ভরাট করতে পারেন না।

যশোর পৌরসভায় দায়িত্ব পালন করে যাওয়া মেয়র মরহুম খালেদুর রহমান টিটো, এসএম কামরুজ্জামান চুন্নু, মারুফুল ইসলাম বিভিন্ন সময় এ বিষয়ে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন। পৌরসভার এখনকার প্রশাসকও স্বীকার করছেন, জলাশয়-সংক্রান্ত আইনটি বইপত্রেই আছে, বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই।

পৌর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য বলছে, এই শহরে এখন সাড়ে ৪৪ একর আয়তনের ২৩২টি ডোবা, ২২৮ একর আয়তনের ৫৭২টি পুকুর, সাড়ে পাঁচ একরের দুটি খাল এবং ১০৮ একরের একটি নদী (ভৈরব নদের শহরাংশ) রয়েছে। তবে সেটি স্যাটেলাইট জরিপে দেখা গেলেও বাস্তবে জলাশয়ের সংখ্যা আরো কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ সুলতানা সাজিয়া আমার দেশকে বলেন, জলাশয় সংক্রান্ত এই পরিসংখ্যান ২০১৭ সালের নগর পরিচালনা ও অবকাঠামো উন্নতিকরণ প্রকল্প (তৃতীয়) বাস্তবায়নের সময় স্যাটেলাইট চিত্র থেকে পাওয়া। যদিও সামান্য পানি থাকলেও তা স্যাটেলাইট ইমেজে ধরা পড়ে।

আজকের ১৪ দশমিক ৭২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের যশোর পৌর এলাকার বাসিন্দা হোল্ডিং অ্যাসেসমেন্ট অনুযায়ী প্রায় পাঁচ লাখ। শহরের বিস্তৃতি ঘটলেও পৌরসভার আয়তন না বাড়ায় ধারণা করা হয়, যশোরে নাগরিক সুবিধাভোগকারীর সংখ্যা ১০ লাখের কম নয়। প্রাচীন শহর হওয়ায় এখানকার রাস্তাগুলো অনেক সরু। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র শহরের বড়বাজার রীতিমতো ঘিঞ্জি এলাকা। এখানকার অলিগলিতে রিকশা পর্যন্ত ঢুকতে পারে না। কোনো কারণে এই বাণিজ্যিক এলাকায় যদি আগুন লাগে তাহলে তা ভয়াবহ সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে বলে ফায়ার ব্রিগেডের আশঙ্কা রয়েছে।

ফায়ার ব্রিগেড ও সিভিল ডিফেন্স যশোরের সহকারী পরিচালক মো. মামুনুর রশিদ বলেন, এই জেলায় অগ্নিনির্বাপণের জন্য তাদের হাতে ২০টি গাড়ি, হতাহতদের উদ্ধারে পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স ও একটি পিকআপভ্যান রয়েছে। কিন্তু পানির সংস্থান না থাকায় তারা জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুততার সঙ্গে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খান।

আমার দেশকে এই কর্মকর্তা জানান, পৌর কর্তৃপক্ষকে যশোর শহরের প্রধান দুটি বাণিজ্যিক এলাকা- বড়বাজার ও মণিহারের কাছে দুটি ভূগর্ভস্থ কৃত্রিম জলাধার নির্মাণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হামিদপুরে শহরের আবর্জনার ভাগাড়ের কাছেও একই ধরনের একটি ওয়াটার রিজার্ভার গড়ে তোলা দরকার বলে তিনি মনে করেন।

পৌরসভার প্রশাসক মো. রফিকুল হাসান ফায়ার ব্রিগেডের প্রস্তাব পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, পৌরসভার আগামী সভায় বিষয়টি উত্থাপন করে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে। অন্য এক প্রশ্নে রফিকুল হাসান বলেন, জলাশয় ভরাট করে কেউ বহুতল ভবন নির্মাণ করতে চাইলে তাকে অনুমতি দেওয়া হয় না। এছাড়া কেউ অভিযোগ করলে সংশ্লিষ্ট ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু পৌর কর্তৃপক্ষ স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয় না বলে তিনি স্বীকার করেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন