ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা ও এর পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধাবস্থাকে কেন্দ্র করে ভেঙে পড়েছে বিশ্বের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা। সমুদ্র ও আকাশপথের প্রচলিত বেশ কয়েকটি রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে সব জায়গায়।
জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ রুটগুলো এড়িয়ে ঘুরপথে সার্ভিস অব্যাহত রাখতে ইতোমধ্যে কনটেইনার পরিবহন ভাড়া বাড়াতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক শিপিং প্রতিষ্ঠানগুলো। চীন থেকে আমদানিকৃত কাঁচামাল পরিবহন ৪০ ফুটের প্রতিটি কনটেইনার চার্জ ২০০ থেকে ৩০০ মার্কিন ডলার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে সী-লেড শিপিং। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার বিকালে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তাদের গ্রাহকদের এই তথ্য জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সী-লেডের ধারাবাহিকতায় অন্য শিপিং প্রতিষ্ঠানগুলোও ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রেখেছে। ২/১ দিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে বলে জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে যুদ্ধ মাশুলও কার্যকরের ঘোষণা দিতে যাচ্ছে শিপিং প্রতিষ্ঠানগুলো। ইতোমধ্যে মৌখিকভাবে তাদের বাংলাদেশি এজেন্টদের বিষয়টি জানিয়েও দিয়েছে। আগামী রোববার বা সোমবারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে। এতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতসহ পুরো আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য।
সূত্র জানিয়েছে, ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা এবং পরবর্তী সময়ে ইরানের পাল্টা প্রতিরোধে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়েই চলছে যুদ্ধাবস্থা। এরই জের ধরে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ইরান নিয়ন্ত্রিত জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান নৌ-রুট হরমুজ প্রণালি।
এতে উপসাগরীয় অঞ্চলে গত সকাল পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখ কনটেইনার নিয়ে কমপক্ষে ১৪০টি মাদার ভ্যাসেল ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় অলসভাবে ভাসছে। যুদ্ধ ঝুঁকির কারণে আশপাশের কোনো বন্দরে বার্থিংও নিতে পারছে না জাহাজগুলো। এককথায় স্থবিরতা নেমেছে সমুদ্র পরিবহনে।
এমএসসি শিপিং ইন্টান্যাশনালের হেড অব অপারেশন আজমীর হোসাইন চৌধুরী জানান, সমুদ্র পরিবহন সুনির্দিষ্ট একটি সাইকেল মেনে চলে। এখানে একটি রুট বন্ধ হলে পুরো পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এখন জ্বালানি পরিবহনের প্রধান রুটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো ব্যবস্থাপনাটিই ধসে গেছে।
শিপিং কোম্পানিগুলো নতুন করে তাদের পরিকল্পনা সাজাতে শুরু করেছে। এজন্য ব্যয় ও সময় দুটোই বেড়ে গেছে। বাধ্য হয়েই শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের পরিচালন ব্যয় তুলতে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। ২/১ টি কোম্পানি ইতিমধ্যে তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। বাকিরা পর্যালোচনা করছে। তারাও আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে। সবমিলিয়ে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বাড়তি ব্যয়ের প্রস্তুতি নিতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, সবার আগে সী লেড শিপিং প্রতি কনটেইনারে চীন-বাংলাদেশ রুটে পরিবহনে ২০০ থেকে ৩০০ মার্কিন ডলার করে ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। বাকি শিপিংগুলোও কনটেইনারপ্রতি ৫০০ ডলার করে বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এছাড়া ২০ ফুট সাইজের কনটেইনারে দুই হাজার, ৪০ ফুট সাইজে তিন হাজার এবং বিশেষ পণ্যবাহী কনটেইনারে চার হাজার ডলার যুদ্ধ চার্জ ঘোষণা দিতে যাচ্ছে শিপিং প্রতিষ্ঠানগুলো।
এর বাইরে প্রতি কেজি পণ্যে তিন থেকে সাড়ে তিন ডলার পর্যন্ত ভাড়া বেড়েছে এয়ার ফ্রেইটে। বিভিন্ন এয়ার সার্ভিস কোম্পানিও প্রাথমিকভাবে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান-ইরাক-বাহরাইন-জর্ডান-কুয়েত এবং আরব আমিরাতে কার্গো পরিবহনেও রাজি হচ্ছে না বিমান সংস্থাগুলো। এতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়েছে এ দেশের তৈরি পোষাক শিল্প।
বিজিএমইএ’র সাবেক সহসভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী জানান, ফ্রেইটের ভাড়া বৃদ্ধি শুরু হয়েছে। এটা আরো বাড়তে পারে। এয়ারে ভাড়া বাড়ছে। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে খরচ বাড়তে শুরু করেছে হু হু করে। এই বাস্তবতায় এক রেটে অর্ডার নিয়ে ১৫ দিন কাজ করে রপ্তানির সময় খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে।
ফলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে তৈরি পোশাক শিল্প। এমনিতেই ট্রাম্প প্রশাসনের ট্যারিফ জটিলতার নিরসন এখনো পুরোপুরি হয়নি। এর মাঝে নতুন করে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনে জাহাজ ও কনটেইনার ভাড়া বাড়তে থাকায় নানামুখী সংকট ঘণীভূত হচ্ছে।
জিবিএক্স লজিস্টিক লিমিটেডের হেড অব অপারেশন মুনতাসির রুবায়েত জানান, হুতি বিদ্রোহীদের অবস্থানের কারণে আগে থেকে লোহিত সাগরে পণ্য পরিবহন রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে আর এখন বন্ধ হয়ে গেছে হরমুজ প্রণালি।
এই মুহূর্তে ইউরোপ-আমেরিকায় পণ্য পাঠাতে আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপ প্রণালি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এই পথ ব্যবহার করতে হলে ১২ থেকে ১৫ দিন সময় বেশি লাগার পাশাপাশি পরিবহণ ব্যয় বাড়বে অন্তত ৩৫ শতাংশ। তার ওপর জ্বালানি ও কনটেইনারের অনিশ্চয়তা তো রয়েছেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

