কুয়াশা প্রকৃতির বুকে সাদা চাদরের মতো বিছিয়ে আছে। ঘাসের ডগায় ডগায় ঝিলমিল করছে শিশিরের বিন্দু। জোড়া দীঘির জলে হাঁসের দল পা ডুবিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। সারি সারি খেজুরগাছে ঝুলছে মাটির তৈরি কলস, গাছির লাগানো বাঁশের নল বেয়ে টপটপ করে ঝরে পড়ছে মিষ্টি রস। সেই রসের টানে মৌমাছিরা গুঞ্জন তুলে উড়ে বেড়াচ্ছে। চারদিক থেকে ভেসে আসছে ফুলের মিষ্টি সুবাস, যেন প্রকৃতি নিজেই নিঃশব্দে উৎসব করছে। মনোমুগ্ধকর এই দৃশ্য দেখা যায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ফৌজদারহাটের ডিসি পার্কের চলমান ফুল উৎসবে।
গত শুক্রবার সাগরপাড়ের কেওড়া বনের পাশে মাসব্যাপী চট্টগ্রাম ফুল উৎসব শুরু হয়। এই আয়োজনে দেশি-বিদেশি ১৪০টিরও বেশি প্রজাতির লাখো ফুলের সমাহার ঘটেছে। এটির উদ্বোধন করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এহছানুল হক। এ সময় বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এবং পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে ২০২৩ সালে মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত ফৌজদারহাটের ১৯৪ একর সরকারি খাস জমি উদ্ধার করে সেখানে ডিসি পার্ক গড়ে তোলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। সেই ধারাবাহিকতায় টানা চতুর্থবারের মতো এ পার্কে আয়োজন করা হয়েছে চট্টগ্রাম ফুল উৎসব।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মেলার শুরু থেকেই পার্কের দুই প্রবেশপথে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। ৫০ টাকা মূল্যের টিকিট কেটে মানুষ প্রবেশ করছেন। ভেতরে ঢুকতেই জোড়া দীঘির উত্তরে ছনের ছাউনিতে সাজানো দোকানে পিঠাপুলিসহ নানা দেশীয় খাবারে গ্রামীণ মেলার আবহ। রয়েছে শিশুদের রাইড, দক্ষিণ পাড়ে কিডস জোন, নান্দনিক রেস্তোরাঁ, বাঁশের তৈরি ভাসমান সেতু এবং পশ্চিম পাড়জুড়ে সুশৃঙ্খল ফুলের বাগান। সেখানে জায়ান্ট ফ্লাওয়ার, ট্রি হাউস, ট্রিপল হার্ট শেলফ, ট্রেন, বক ও ময়ূরের আদলে নান্দনিক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।
এবার দেশি-বিদেশি লাখো ফুলের সমাহার ঘটেছে। লিলিয়াম, ম্যাগনোলিয়া, ক্যামেলিয়ার পাশাপাশি গাঁদা, জবা, কৃষ্ণচূড়া ও চন্দ্রমল্লিকা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করছে। দীঘির ওপর জিপ লাইনিং, কায়াকিং ও প্যাডেল নৌকায় ভ্রমণে মেতে উঠছেন তরুণরা। রঙিন টায়ার ও রংধনুর রঙে সাজানো গাছপালা পার্কের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। মেলায় প্রতিদিন আঞ্চলিক গানের আয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান কর্নার ও আসন্ন গণভোটের প্রচার স্টল।
ঘুরতে আসা সুলাইমান মেহেদী বলেন, এই আয়োজনে নতুন প্রজন্ম দেশীয় ফুলগুলোর পাশাপাশি বিদেশি ফুলের সঙ্গেও পরিচিত হতে পারবে। এখানে এসে জনপ্রিয় জিপ লাইনিং উপভোগ করতে পেরেছি, যা তেমন কোথাও পাওয়া যায় না। তাছাড়া স্বল্প খরচে পরিবার নিয়ে এখানে আনন্দমুখর সময় পার করলাম। শিশু সাহেদ আলম আবিদ বলেন, এখানে এসে আমি সব ধরনের রাইড উপভোগ করেছি। এর আগে এত রাইড একসঙ্গে পাইনি।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, ১৫টি দেশ থেকে সাংস্কৃতিক কর্মীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। প্রতিদিন ৪০-৫০ হাজার দর্শনার্থীর উপস্থিতি আশা করা হচ্ছে এবং পুরো মাসে প্রায় ২০ লাখ মানুষ পার্ক ভ্রমণ করবেন। তিনি আরো জানান, মেলা চলাকালীন কয়েকটি বুথে আমরা গণভোটের প্রচার চালাব। পার্কে আগতরা আনন্দ করার পাশাপাশি জাতীয় ইস্যুতে সচেতন হয়ে ওঠবেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

