শাহরাস্তিতে অসাধু চক্রের দাপটে বিলীন হচ্ছে আবাদি জমি

শাহরাস্তিতে অসাধু চক্রের দাপটে বিলীন হচ্ছে আবাদি জমি
ছবি: আমার দেশ

প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান কিংবা কৃষিজমি সুরক্ষার রাষ্ট্রীয় আইন-কোনো কিছুই থামাতে পারছে না অসাধু মাটিখেকোদের দৌরাত্ম্য। শীতের মৌসুমে এক্সেভেটর (ভেকু) আর বর্ষায় ড্রেজার দিয়ে অভিনব কায়দায় রাতের আঁধারে কেটে নেওয়া হচ্ছে কৃষিজমির ওপরের উর্বর অংশ, যা 'টপসয়েল' নামে পরিচিত। চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলার পাশাপাশি শাহরাস্তিতে এই অবৈধ মাটি কাটার তাণ্ডব এখন চরম আকার ধারণ করেছে।

শাহরাস্তি উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটিতেই ড্রেজার ও ভেকু দিয়ে মাটি কাটার দৃশ্য চোখ পড়ে। বর্ষা মৌসুমে বিশেষ পদ্ধতিতে নদীর তলদেশ কিংবা প্লাবিত জমি থেকে ডুব দিয়ে নৌকায় মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ডাকাতিয়া নদীর দুই পাড়ের আবাদি জমিতে এ ধরনের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে কৃষিজমির টপসয়েল কাটার অপরাধে দুই বালি ব্যবসায়ীকে চার লাখ টাকা জরিমানা, কয়েকশো মিটার পাইপলাইন ধ্বংস এবং একাধিক ড্রেজার মেশিন জব্দ করেছে। তবুও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে আড়ালে-আবডালে থামছে না মাটি কাটার উৎসব।

শাহরাস্তি মূলত একটি কৃষি প্রধান এলাকা। খিলা খাল ও রাগৈ বিল খাল ভাসমান সেচ প্রকল্পসহ বিএডিসির বেশ কটি সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে এ অঞ্চলের কৃষকরা জেলা ও দেশের খাদ্যের বড় একটি অংশের জোগান দিয়ে থাকেন। তবে সেচ প্রকল্পের পরিচালকদের দাবি, অবাধে মাটি কাটার ফলে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে আবাদি জমির পরিমাণ। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পথে এই অবৈধ মাটি কাটা এখন প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় কৃষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জমির টপসয়েল কেটে নেওয়ার ফলে ফসলের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে এবং মাটি তার প্রাকৃতিক উর্বরতা হারিয়ে ফেলছে। এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে ইরি-বোরো ধানের সেচ কার্যক্রমেও বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাঁদপুর জেলার মধ্যে শাহরাস্তি উপজেলায় চাহিদার তুলনায় ইটভাটার সংখ্যা অনেক বেশি। এসব ইটভাটায় মাটি সরবরাহের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে পাশের কৃষিজমি। অধিক মুনাফার লোভে পড়ে অনেক জমির মালিক তাদের জমির ৩ থেকে ৪ ফুট গভীরের উর্বর টপসয়েল বিক্রি করে দিচ্ছেন। ইটভাটা হাড়াও বাসাবাড়ি তৈরি ও পুকুর ভরাটের কাজেও সমানতালে ব্যবহার করা হচ্ছে আবাদি জমির এই মাটি।

চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোলাম সরওয়ার বলেন, ‘জমির টপসয়েল কেটে নেওয়ার কারণে তিন ফসলি জমি রূপান্তরিত হচ্ছে দুই ফসলি জমিতে, আর দুই ফসলি জমি নেমে আসছে এক ফসলি জমিতে। বহু এক ফসলি জমি একেবারেই অনাবাদী হয়ে পড়ছে।’

একই উদ্বেগের কথা জানান উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার দাস। তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি দুটি জমির একটির টপ সয়েল কাটা হলে পার্শ্ববর্তী অন্য জমির উৎপাদন ও সেচ ব্যবস্থাতেও তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। এতে উপজেলাজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে’।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাজ্জাদুর রহমান জানান, শাহরাস্তিতে বর্তমানে আবাদি জমির পরিমাণ ১১ হাজার ৮৫ হেক্টর। দেশকে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখতে এবং আমদানি নির্ভরতা কমাতে কৃষিজমি রক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কৃষকদের সচেতন করতে কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কৃষিজমি রক্ষায় প্রশাসনিক কঠোরতার কথা জানিয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামছুজ্জামান বলেন, ‘কৃষিজমির টপসয়েল রক্ষার্থে গত এক মাসে ১৫টি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায়ের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ড্রেজার মেশিন ও পাইপলাইন ধ্বাংস করা হয়েছে। অবৈধ মাটি কাটাবাজদের বিরুদ্ধে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা খাতুন বলেন, ‘কৃষিজমির ক্ষতি করে মাটি কাটার খবর পাওয়ামাত্রই আমরা আইনগত ব্যবস্থা ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সভা-সেমিনারের মাধ্যমে মাটি কাটার কুফল সম্পর্কে জনগণকে সচেতন ও নিরুৎসাহিত করার কাজ চলছে।’

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন