পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য

পঞ্চগড়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজেরাই মন্দির ও মূর্তি ভেঙে ফেলার অভিযোগ

পঞ্চগড় প্রতিনিধি

পঞ্চগড়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজেরাই মন্দির ও মূর্তি ভেঙে ফেলার অভিযোগ
ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ছবি: আমার দেশ

পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে কালীমূর্তি ভাঙচুরের ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উসকানির অভিযোগ উঠলেও পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের দাবি, এটি কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা নয় বরং দীর্ঘদিনের জমি বিরোধের জেরে সংঘটিত একটি ঘটনা। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, বিরোধপূর্ণ জমিতে কয়েক মাস আগে একটি অস্থায়ী মন্দির ও কালীমূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল এবং সংঘর্ষের পর সেই মূর্তি ভেঙে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

বুধবার (৮ জুলাই) বিকেলে উপজেলার ধামোর ইউনিয়নের জুগিকাটা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এলাকার অনিল চন্দ্র রায়ের পরিবার এবং লক্ষ্মীচরণ রায়ের পরিবারের মধ্যে ৬ একর ৬৬ শতক জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। গত বছর লক্ষ্মীচরণ রায় ওই জমি স্থানীয় বাসিন্দা জাকির হোসেনের কাছে বিক্রি করেন। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। এ অবস্থায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দেওয়া হলে উভয়পক্ষকে আগামী ১২ জুলাই আলোচনায় বসার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয় এবং এর আগে বিরোধপূর্ণ জমিতে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, সেই নির্দেশ অমান্য করে বুধবার দুপুরে অনিল চন্দ্র ও তার লোকজন জমিতে চাষ করতে যান। এতে জাকির হোসেন ও তার ভাই জুলকার রানা বাধা দিলে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। জাকিরকে আটক করে মারধরের অভিযোগ ওঠে। পরে বিরোধপূর্ণ জমির বাঁশঝাড় সংলগ্ন স্থানে কয়েক মাস আগে স্থাপন করা কালীমূর্তি ভেঙে জাকিরের হাতে ও গলায় ধরিয়ে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা জাকিরকে উদ্ধার করে প্রথমে আটোয়ারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, পরে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

এদিকে ঘটনার পর একপক্ষ মুসলিমদের বিরুদ্ধে কালীমূর্তি ভাঙার অভিযোগ তুললেও অপরপক্ষের দাবি, অভিযোগকারীরাই নিজেরা মূর্তি ভেঙে মুসলিম যুবককে দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। রাতেই এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেন।

লক্ষ্মীচরণ রায়ের স্ত্রী শেফালী রানী বলেন, "অনিলরা আগে জাকিরকে মারধর করে। পরে তারাই কালীমূর্তি ভেঙে নাটক সাজিয়েছে। কয়েক মাস আগে সেখানে ছোট একটি ঠাকুরঘর নির্মাণ করে মূর্তি রাখা হয়েছিল। তারা নিজেদের অপরাধ আড়াল করে মুসলিমদের দোষারোপের চেষ্টা করছে।"

জাকির হোসেনের ভাই জুলকার রানা বলেন, "ইউএনওর নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও তারা জমিতে চাষ করতে গেলে আমরা বাধা দিই। তখন তারা আমাদের ওপর হামলা করে। আমার ভাইকে বেধড়ক মারধর করে তার পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পরে তারাই মূর্তি ভেঙে ভিডিও ধারণ করে গুজব ছড়িয়েছে। ভিডিওটি ভালোভাবে দেখলেই বিষয়টি বোঝা যাবে। জমি দখলের উদ্দেশ্যেই কয়েক মাস আগে সেখানে মূর্তি ও খড়ের একটি ছোট ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল।"

অন্যদিকে অনিল চন্দ্র রায়ের ভাই কান্তপাল রায় বলেন, "আমরা জমিতে চাষ দিতে গেলে জাকির বাধা দেয় এবং কালীমূর্তি ভেঙে ফেলে। পরে তাকে ধরে দু-একটি লাঠির আঘাত করা হয়েছে। রাতে কয়েকশ মানুষ আমাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে।"

আটোয়ারী থানার ওসি মতিয়ার রহমান বলেন, "এটি কোনো সাম্প্রদায়িক ইস্যু নয়। জমি-সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। মুসলিম যুবকের হাতে কালীমূর্তি ভাঙার যে দাবি করা হচ্ছে, তার সত্যতা আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি। পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে। এলাকায় পুলিশ মোতায়েন আছে। যারা গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপামনি দেবী বলেন, "উভয়পক্ষকে ১২ জুলাই আলোচনায় বসানোর সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু তার আগেই তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। প্রশাসন ও পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।"

এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অনিল চন্দ্র, লক্ষ্মীচরণ রায় ও জাকির হোসেনের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরে আটোয়ারী প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উভয়পক্ষ নিজেদের মধ্যে বিরোধ মীমাংসা হয়েছে বলে জানান।

এএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন