কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি আদায়ে রশিদ না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করাতে টাকা নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তাদের হাতে দেওয়া হচ্ছে না কোনো রশিদ। ফলে আদায় করা অর্থ সরকারি হিসাবে জমা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
একই সঙ্গে ৩১ জনের জনবল কাঠামো দিয়ে ৫০ শয্যার কার্যক্রম পরিচালনা করায় হাসপাতালটির চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে সেবা নিতে এলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে অনেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রোগীদের।
সরেজমিনে হাসপাতালটিতে গিয়ে জানা যায়, বুড়িচং উপজেলার আশপাশের বিভিন্ন এলাকার রোগীরাও প্রতিদিন এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। সকাল থেকেই বহির্বিভাগ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেন্দ্রে রোগীদের ভিড় দেখা যায়। প্রায় চার লাখ মানুষের এ উপজেলায় রোগীর তুলনায় হাসপাতালের জনবল প্রয়োজনের তুলনায় কম।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৩৩ জন চিকিৎসকের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ২২ জন। সিআরপি ল্যাবে দুজনের স্থলে রয়েছেন একজন। হাসপাতালের বিশাল ভবন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র একজন ঝাড়ুদার। চারজন আয়ার স্থলে দায়িত্ব পালন করছেন দুজন। নার্সসহ অন্যান্য পদেও রয়েছে জনবল সংকট। ফলে রোগীদের চিকিৎসাসেবা, পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় কর্মরতদের বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে।
হাসপাতালে থাকা ইসিজি ও এক্স-রে মেশিনের মধ্যে এক্স-রে মেশিনটি দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে বলেও জানা গেছে। এতে রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে বাইরে যেতে হচ্ছে। ভর্তি রোগীদের কয়েকজন জানান, হাসপাতাল থেকে কিছু ওষুধ ও ইনজেকশন দেওয়া হলেও প্রয়োজনের বড় একটি অংশ বাইরে থেকে কিনতে হয়। হাসপাতালের খাবারের মান নিয়েও রয়েছে রোগীদের অসন্তোষ। নির্ধারিত পরিমাণ অনুযায়ী মাছ-মাংসসহ খাবার পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ তাদের।
তবে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি আদায়ে রশিদ না দেওয়াকে কেন্দ্র করে। রোগীদের অভিযোগ, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী ল্যাবে পরীক্ষা করাতে আসেন। তাদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি নেওয়া হলেও অনেক সময় কোনো রশিদ দেওয়া হয় না।
ভুক্তভোগী আলম মিয়া বলেন, ‘আমি টাকা দিয়েছি, কিন্তু আমাকে কোনো রশিদ দেওয়া হয়নি। রশিদ চাইলে কাউন্টার থেকে বলা হয়, আপনি যান, কোনো সমস্যা নেই।’
ছয়গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা ৫৫ বছর বয়সী আবেদা বেগম বলেন, ‘আমি ভীষণ পেটব্যথা নিয়ে এখানে এসেছি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ৩৫০ টাকা দিয়েছি। কিন্তু আমাকে টাকার কোনো রশিদ দেওয়া হয়নি। রশিদ চাইলে বলা হয়, রশিদ লাগবে না, আপনি ভেতরে যান।’
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের ল্যাব টেকনিশিয়ান সুজন আলী রোগীদের কাছ থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার টাকা নিয়ে রশিদ না দেওয়ার সঙ্গে জড়িত। রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ যথাযথভাবে সরকারি হিসাবে জমা দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
অভিযোগের বিষয়ে ল্যাব টেকনিশিয়ান সুজন আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি কাজের চাপের কথা উল্লেখ করে রশিদ দেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যান।
বুড়িচং বাজারের ব্যবসায়ী বাবুল মিয়া বলেন, ‘এখানে রোগীর তুলনায় ডাক্তার ও নার্স অনেক কম। এ কারণে রোগীরা যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম আরও ভালোভাবে পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ দিতে কুমিল্লার সিভিল সার্জনের কাছে বিনীত অনুরোধ করছি।’
এ বিষয়ে বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মালেকুল আফতাব ভূঁইয়ার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি রশিদবিহীন টাকা আদায়ের অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত বলতে এড়িয়ে যান।
তবে হাসপাতালের জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় লোকবল কম থাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে প্রতিদিনই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি আদায়ের ক্ষেত্রে রশিদ প্রদান নিশ্চিত করা, আদায়কৃত অর্থ সরকারি হিসাবে যথাযথভাবে জমা হচ্ছে কি না তা যাচাই এবং জনবল সংকট দ্রুত নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

