হিমাগার স্থাপনের দাবি

নেছারাবাদে শতবর্ষী ভাসমান হাটে কোটি টাকার বেচাকেনা

নেছারাবাদে শতবর্ষী ভাসমান হাটে কোটি টাকার বেচাকেনা
ছবি: আমার দেশ

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর নদীবিধৌত জনপদের ঐতিহ্য ধারণ করে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় গড়ে উঠেছে আমড়াচাষ ও বাণিজ্যের এক সমৃদ্ধ জনপদ। এখানকার সুস্বাদু ও মিষ্টি আমড়ার চাহিদা রয়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই ভাসমান আমড়ার হাটকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন জেলার প্রায় ৬০ হাজার কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই কৃষিপণ্য ঘিরে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির যে স্বপ্ন দেখেন চাষিরা, তা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ন্যায্যমূল্যের অভাব, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সংরক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায়।

বিজ্ঞাপন

চাষিদের প্রধান দাবি, নেছারাবাদে আমড়া সংরক্ষণের উপযোগী একটি আধুনিক হিমাগার স্থাপন করা, যাতে দ্রুত পেকে যাওয়া ও পচনশীল এই ফল দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায়। কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় বাধ্য হয়ে কম দামে ফল বিক্রি করতে হয়। ফলে গাছে ফলন ভালো হলেও কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখছেন না তারা। সরকারি উদ্যোগে আধুনিক সংরক্ষণাগার, কৃষি প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং পরিকল্পিত বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে আমড়াচাষে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন চাষিরা।

উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নেছারাবাদ উপজেলায় প্রায় ৩০০ হেক্টর জমিতে আমড়ার আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১৬ থেকে ১৭ মেট্রিক টন উৎপাদনে এ মৌসুমে আমড়ার মোট উৎপাদন প্রায় ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার ১০০ মেট্রিক টন। নেছারাবাদ ও ঝালকাঠি দুই উপজেলার নদীর মোহনায় কুড়িয়ানা, আটঘর, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠি ও ভিমরুল এলাকায় আমড়ার উৎপাদন ও বেচাকেনাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী ভাসমান হাট। এসব বাজারে প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার ও সোমবার আমড়ার জমজমাট বেচাকেনা হয়। নির্ধারিত হাটের দিন ছাড়াও প্রতিদিন কমবেশি আমড়া বিক্রি হয়।

স্থানীয় চাষিরা জানান, সপ্তাহের এসব হাটে প্রতি সপ্তাহে কোটি কোটি টাকার আমড়া বেচাকেনা হয়। ফলন ভালো হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। আমড়াচাষি অমল বলেন, ‘উৎপাদন খরচ যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে বাড়ছে না ফলের দাম।’

নদীপথে নৌকাভর্তি আমড়া নিয়ে হাটে আসেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। সেখান থেকে পাইকারদের মাধ্যমে আমড়া পৌঁছে যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এই বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের উল্লেখযোগ্য সুযোগ। অথচ যে আমড়া এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকা ও ঐতিহ্যের অংশ, সেই আমড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে না পারায় চাষিদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা।

আমড়াচাষিদের অভিযোগ, জমির পরিচর্যা, শ্রমিকের মজুরি, ফল সংগ্রহ, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বেশি হওয়া এবং এ বছর গরমে পচনশীল আমড়া দ্রুত পচে যাওয়ায় কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় তাদের লাভের টাকা থাকছে না। হিমাগার না থাকায় আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন কৃষকেরা।

আমড়াচাষি অমর বলেন, ‘আমড়ার ফলন ভালো হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় আমরা সমস্যায় পড়েছি। দ্রুত পেকে যাওয়ায় সময়মতো ফল বিক্রি করতে হয়। কিন্তু বাজারে প্রত্যাশিত দাম না পেলে শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘একসময় আমড়াচাষ করে কৃষকেরা ভালো লাভ করতে পারতেন। এখন উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এই ঐতিহ্যবাহী চাষ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে শুধু কৃষকের ক্ষতিই হবে না, ক্ষতিগ্রস্ত হবে স্থানীয় অর্থনীতি এবং ঐতিহ্যবাহী আমড়াবাণিজ্যের ধারাবাহিকতাও।’

আরতদার সুভাষ বলেন, ‘কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে বাজারদরের সামঞ্জস্য না থাকলে কৃষক দীর্ঘমেয়াদে চাষে আগ্রহ হারাবেন। আধুনিক হিমাগার বা উপযোগী নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে আমড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। এতে বাজারের চাহিদা ও সংরক্ষণব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে ফল বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে কৃষকেরা তাড়াহুড়ো করে কম দামে আমড়া বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না এবং আমড়াচাষিরাও লাভবান হবেন।’

সুশীল সমাজের দাবি, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও সংরক্ষণপ্রযুক্তি সবচেয়ে কার্যকর কি না, তা কৃষি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। সংরক্ষণাগার স্থাপনের আগে সম্ভাব্য উৎপাদন, ব্যবহার, পরিচালন ব্যয় এবং কৃষকের সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্টদের সংরক্ষণাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এতে কৃষকের লোকসান কমার পাশাপাশি আমড়ার বিপণনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। নেছারাবাদের আমড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফেনী, রাজশাহী ও খুলনাসহ বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে সরবরাহ করা হয়। স্বাদ ও মিষ্টতার কারণে এখানকার আমড়ার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকের ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করা গেলে আমড়াচাষ আরও লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। চাষিরা অনেক সময় প্রত্যাশিত মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। কিছু চাষির দাবি, বাজারে ব্যবসায়ীদের পারস্পরিক সমঝোতা বা সিন্ডিকেটের কারণে তারা ন্যায্যমূল্য পান না। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন চাষিরা।

নোয়াখালীর একজন আমড়া ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমড়া পচনশীল ফল হওয়ায় দ্রুত বিক্রি করতে হয়। চলতি মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হওয়া এবং গরমের কারণে ফল দ্রুত পেকে যাওয়ায় আমাদেরও ঝুঁকি বেড়েছে। সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা, পরিবহন ব্যয় ও ফল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়েই আমরা আমড়া কিনি।’

নেছারাবাদের আমড়াচাষিদের দাবি, নিয়মিত কৃষি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হোক। আধুনিক পদ্ধতিতে গাছের পরিচর্যা, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, ফলের গুণগত মানোন্নয়ন, সঠিক সময়ে ফল সংগ্রহ এবং উৎপাদন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে উৎপাদন ব্যয় কমানো ও ফলের মানোন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি স্বল্প সুদে কৃষিঋণ, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং প্রযোজ্য সরকারি সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।

আমড়া থেকে আচার, চাটনি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে মৌসুমে অতিরিক্ত ফলের বিকল্প ব্যবহারও তৈরি হবে। এতে পচনশীল ফলের অপচয় কমবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

নেছারাবাদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘কৃষকেরা কৃষি কার্যালয়ে এসে আবেদন করলে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে সুপারিশ করা হবে।’

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ‘নেছারাবাদের আমড়াচাষ ও ভাসমান হাট কেবল কৃষিপণ্যের বাণিজ্যকেন্দ্র নয়; এটি এ অঞ্চলের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই খাতের উন্নয়নে কৃষক, ব্যবসায়ী, কৃষি বিভাগ, কৃষি বিপনন অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন