আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

চট্টগ্রাম বন্দর

ব্যবসায়ীদের আপত্তি উপেক্ষা করে বর্ধিত ট্যারিফ কার্যকর

সোহাগ কুমার বিশ্বাস, চট্টগ্রাম

ব্যবসায়ীদের আপত্তি উপেক্ষা করে বর্ধিত ট্যারিফ কার্যকর

বন্দর ব্যবহারকারী এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তীব্র আপত্তি উপেক্ষা করে মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে কার্যকর করা হয়েছে নতুন ট্যারিফ। আজ থেকে সব ধরনের সেবার বিপরীতে ৩০ থেকে ৪১ শতাংশ অতিরিক্ত চার্জ গুনতে হবে আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এমনকি বন্দর পরিদর্শনে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটক ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদেরও পরিশোধ করতে হবে বর্ধিত এন্ট্রি ফি।

বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, জেটি শেড এবং টার্মিনাল নির্মাণের খরচ তুলে আনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতেই ৩৯ বছর পর ট্যারিফ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অন্যদিকে বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, বন্দরের মাশুল সব সময় ডলারে পরিশোধ করতে হয়। ৩৬ বছরে ডলারের দাম কমপক্ষে ৪০০ শতাংশ বেড়েছে অর্থাৎ বন্দরের মাশুলও ৪০০ শতাংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে গেছে। তাই সেবার মান বাড়ানোর অজুহাতে ট্যারিফ বাড়ানো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। বর্ধিত এই ট্যারিফ না দিতে একাধিক ব্যবসায়ী সংগঠন ইতোমধ্যে আন্দোলনের ঘোষণাও দিয়েছে। সবকিছু উপেক্ষা করে গতকাল মধ্যরাত থেকে কার্যকর করা হয় নতুন এই ট্যারিফ।

বিজ্ঞাপন

বন্দর সূত্র জানিয়েছে, গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন নির্ধারিত ট্যারিফ কার্যকর করার কথা ছিল। কিন্তু ব্যবসায়ী সংগঠন এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের আপত্তির মুখে বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করে সরকার। এক মাস ধরে বিভিন্নভাবে যাচাই-বাছাই শেষে মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে এই ট্যারিফ কার্যকর করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ হ্যান্ডলিংসহ আনুষঙ্গিক মোট ৫২ খাতে ট্যারিফ আদায় হয়। এর মধ্যে ২৩ খাতে সরাসরি নতুন হারে ট্যারিফ কার্যকর করা হচ্ছে। বাকিগুলো ভাড়া, টোল, ফি ও মাশুল ডলারের বিনিময়মূল্যের ভিত্তিতে আদায় করা হবে।

বর্ধিত ট্যারিফে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং খাতে সবচেয়ে বেশি মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি ২০ ফুট কন্টেইনারের ট্যারিফ ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ২৪৩ টাকা, যা আগে ছিল ১১ হাজার ৮৪৯ টাকা। এতে গড়ে প্রায় ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। আমদানি কন্টেইনারে পাঁচ হাজার ৭২০ টাকা এবং রপ্তানি কন্টেইনারে তিন হাজার ৪৫ টাকা বেশি দিতে হবে। এছাড়া প্রতিটি কন্টেইনার ওঠানামার ক্ষেত্রেও প্রায় তিন হাজার টাকা বাড়তি খরচ যুক্ত হবে। ফলে সামগ্রিকভাবে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং খাতে ২৫ থেকে ৪১ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চার্জ বাড়ানো হয়েছে শিপিং খাতেও। শিপিং এজেন্টরা বলছেন, এখন থেকে ১২ ঘণ্টা অতিরিক্ত অবস্থানের জন্য ১০০ শতাংশ, ২৪ ঘণ্টার জন্য ৩০০ শতাংশ, ৩৬ ঘণ্টার জন্য ৪০০ শতাংশ এবং ৩৬ ঘণ্টার বেশি হলে চার্জ ৯০০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বর্তমানে ২৪ ঘণ্টার আগেই পণ্য খালাস করে বন্দর ত্যাগের সুযোগ পাচ্ছে পণ্যবাহী জাহাজগুলো।

চট্টগ্রাম বন্দরের অর্থ ও হিসাবরক্ষণ বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুস শাকুরের সই করা এক নোটিসে ১৪ অক্টোবর রাত ১২টার পর চট্টগ্রাম বন্দরে আসা সব জাহাজ, কন্টেইনার ও কার্গো বিল নতুন রেট অনুযায়ী নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। একই ভাবে সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধিসহ সব বন্দর ব্যবহারকারী বর্ধিত হারে মাশুল পরিশোধ করবেন। তালিকাভুক্ত সব শিপিং এজেন্টকে তফসিলি ব্যাংকে তাদের হিসাব নম্বরে বর্ধিত হারে যথাযথ অর্থের সংস্থান রেখে আসা জাহাজের ছাড়পত্র (এনওসি) নিতে বলা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুখ জানান, অবকাঠামোগত উন্নয়ন খরচ মেটাতে বাড়ানো হচ্ছে ট্যারিফ। আগে প্রতি কেজি আমদানি পণ্য থেকে বন্দর ৩২ পয়সা আদায় করলেও এখন তা বাড়িয়ে ৪৪ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে মাত্র ১২ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। এতে বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

তবে বন্দর সচিবের এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, হুট করে এত বিপুল পরিমাণে ট্যারিফ বৃদ্ধি দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, আমরা ট্যারিফ বৃদ্ধির বিরোধিতা করছি না। তবে একসঙ্গে এত বিপুল ট্যারিফ না বাড়িয়ে ক্রমান্বয়ে বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিলাম, যাতে একটি সহনীয় অবস্থা থাকে। এখনকার ট্যারিফের হার অসহনীয় হয়ে পড়েছে। এতে দেশের বাজার, এমনকি রপ্তানি বাণিজ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য।

এদিকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে জড়িত বিদেশি শিপিং কোম্পানিগুলো সারচার্জ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। ইতোমধ্যে ফ্রান্সভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় শিপিং কোম্পানি সিএমএ সিজিএম এবং সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক শিপিং কোম্পানি এমএসসি বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের ওপর সারচার্জ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...