মালিঝি, কংস, খড়িয়া ও রাংসা নদী বিধৌত ২০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা। এ দুটি উপজেলা নিয়ে ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) সংসদীয় আসন। স্বাধীনতা-উত্তর এ আসন থেকে সর্বাধিকবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ফুলপুরের আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতাদের প্রায় সবাই এখন আত্মগোপনে। তাদের কেউ কেউ ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানা যায়। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের অনেকেই ইতোমধ্যে মামলার আসামি হয়ে পলাতক আছেন।
একসময় আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ফুলপুর-তারাকান্দা আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তৎপরতা আগাম নির্বাচনি বার্তা দিচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর একক প্রার্থীসহ বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের মতো করে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তৎকালীন স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে এ আসন থেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট জুলমত আলী খানকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মো. শামছুল হক এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবুল বাসার আকন্দ এমপি নির্বাচিত হন। একই বছরের জুনে নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আশরাফ উদ্দিন সরকারকে পরাজিত করে পুনরায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী মো. সামছুল হক এমপি নির্বাচিত হন। ২০০১ সনে আওয়ামী লীগের পাঁচবারের নির্বাচিত এমপি মো. সামছুল হককে পরাজিত করে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহ শহীদ সারওয়ার এমপি নির্বাচিত হন। মইন-ফখরউদ্দিনের আমলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহ শহীদ সারওয়ারকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হায়াতোর রহমান খান এমপি নির্বাচিত হন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবুল বাসার আকন্দ। তিনি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন। এবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের লক্ষ্যে তিনি বিএনপির বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এলাকায় গণসংযোগ এবং কেন্দ্রে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। দলীয় মনোনয়নের আশায় সাবেক ছাত্রনেতা ময়মনসিংহ জেলা (উত্তর) বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও তারাকান্দা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার ফুলপুর ও তারাকান্দায় সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন দলীয় কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে সব আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন মামলায় কারাবরণসহ নানা হয়রানির শিকার হন। আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি মনোনয়ন প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি লবিংয়ে মোতাহার হোসেন তালুকদার এগিয়ে রয়েছেন বলে দলের অনেক নেতাকর্মী মনে করেন।
এছাড়া ফুলপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ এনায়েত-উর-রহমান দলীয় মনোনয়নের জন্য প্রার্থী হবেন বলে জানান।
উল্লেখ্য, ফুলপুর-তারাকান্দা আসন থেকে ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী পাঁচবারের সংসদ সদস্য সামছুল হককে পরাজিত করে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হন তৎকালীন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শাহ শহীদ সারোয়ার। তিনি ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হায়াতোর রহমানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন ও ২০১৮ সালের নিশিভোটের নির্বাচনেও বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পরাজিত হন।
বিএনপির সাবেক এই এমপি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থেকে রাজনৈতিক মামলায় বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হন। তারপরও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে শাহ শহীদ সারোয়ার ২০২৪ সনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় বিএনপি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল।
আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক এমপি শাহ শহীদ সারোয়ার জানান, জনগণ আমাকে চাচ্ছে। বিএনপিতে ফেরার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি নির্ভর করছে আমার জনপ্রিয়তা বিবেচনায় বিএনপির শীর্ষস্থানীয়দের সিদ্ধান্তের ওপর।
আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনে ফুলপুর-তারাকান্দায় জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে ফুলপুর উপজেলার সাবেক আমির কারা নির্যাতিত নেতা মাহবুব আলম মন্ডলকে ইতোমধ্যে মৌখিকভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার লক্ষ্য নিয়ে তিনি জনসংযোগসহ বিভিন্ন দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজনীতির মাঠে জামায়াতে ইসলামী নতুন উদ্যমে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে জনসংযোগ, সহযোগী সম্মেলন, কমিটি গঠনসহ ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচনকে সামনে রেখে ফুলপুরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ইসলামী আন্দোলন, ময়মনসিংহ জেলা (উত্তর) সিনিয়র সহসভাপতি মাওলানা গোলাম মওলা ভূঁইয়াকে ইতোমধ্যে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।
এছাড়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ফুলপুর উপজেলা শাখার সভাপতি মাওলানা আবুরায়হান মক্কী এ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন পেতে সাংগঠনিক কার্যক্রমসহ গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, তারাকান্দা উপজেলা শাখার সভাপতি মাওলানা খাইরুল ইসলাম মনোনয়ন পেতে সাংগঠনিক কাজের পাশাপাশি হাটবাজারে গণসংযোগ করছেন।
তবে এ আসনে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টির দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ফুলপুর-তারাকান্দা নির্বাচনী এলাকায় নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) তেমন কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

